৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা

১৯ বছর পরও সারেনি যে ক্ষত

বিজ্ঞাপন
default-image

সেদিন আকাশ ছিল ঝকঝকে। কর্মব্যস্ত নিউইয়র্কে প্রতিদিনের মতো আরেকটি সকাল। ঠিক ৮টা ৪৬ মিনিটে যাত্রীবাহী একটি উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে। ১৫ মিনিট পর দ্বিতীয় একটি উড়োজাহাজ আঘাত হানল সাউথ টাওয়ারে। যে টুইন টাওয়ার নিউইয়র্ক শহরের বিজয়কেতন হিসেবে তিন দশকের বেশি সময় দাঁড়িয়ে ছিল, সবার চোখের সামনে তা ধসে পড়ল। প্রাণ গেল প্রায় তিন হাজার মানুষের, যাঁদের মধ্যে ১২ জন বাংলাদেশিও ছিলেন। একই দিন ছিনতাই করা আরও দুটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলো পেনসিলভানিয়ার শাঙ্কসভিলে এবং ওয়াশিংটন ডিসির অদূরে পেন্টাগনে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ওই বিপর্যয়ের ক্ষত ১৯ বছর পর আজও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট।

২০০১ সালের ওই সন্ত্রাসী হামলা ইতিহাসে ‘নয়–এগারো হামলা’ নামে ঠাঁই করে নিয়েছে। ওই হামলার আশু প্রতিক্রিয়া ছিল আফগানিস্তানে পাল্টা মার্কিন হামলা। আল-কায়েদার সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ নিতে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা এখনো শেষ হয়নি। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নিহত সেনাসদস্যের সংখ্যা ইতিমধ্যে সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ যুদ্ধে কত সংখ্যক আফগান নাগরিক নিহত হয়েছে, সে হিসাব কেউ রাখেনি। তবে নিহত আফগান সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এ বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আল-কায়েদাকে আজও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা যায়নি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তানে বর্তমানে ১২ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যেই দেশটিতে তালেবানের উৎপাত বেড়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন যেভাবেই হোক আফগানিস্তান থেকে সরে আসতে চায়। কিন্তু বেরিয়ে আসার সম্মানজনক পথ খুঁজে পাচ্ছে না তারা। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাই এখন তালেবান নেতৃত্বের সঙ্গেই সরাসরি আলোচনা চালাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তিও হয়, যেখানে পরবর্তী ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সব সেনা দেশে ফিরিয়ে আনতে চান তিনি। এটি তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। কিন্তু অনেকেই বলছেন, এটি একটি অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা।

আফগানিস্তান যুদ্ধ বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম সমর অভিযান। এর সঙ্গে যুক্ত করা যায় ২০০৩ সালের ইরাক অভিযান এবং পরবর্তী সময়ে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই শেষ দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করলেও লড়াই এখনো শেষ হয়নি। বস্তুত ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ছাপিয়ে এখন আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশের বাইরে এ অব্যাহত রক্তক্ষয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম আটলান্টিক–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ভিন্ন দুটি আয়োজনে ট্রাম্প যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের ‘হতভাগা’ ও ‘নির্বোধ’ বলে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটনের কাছে আর্লিংটন সমাধিস্থলে নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প তাঁর সাবেক চিফ অব স্টাফ জেনারেল জন কেলিকে প্রশ্ন করেন, যারা মারা গেল, যুদ্ধ করে তারা কী পেল? একই সমাধিস্থলে কেলির সৈনিক ছেলেরও সমাধি রয়েছে। সেই সমাধির সামনে দাঁড়িয়েই ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, ‘কী লাভ হলো এভাবে জীবন দিয়ে? এরা যদি খুব চটপটে ও বুদ্ধিমানই হবে, তাহলে ব্যবসায় নেমে অর্থ উপার্জন না করে যুদ্ধে গেল কেন?’

পরে অবশ্য ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ওই ধরনের মন্তব্য করেননি। তবে যুদ্ধের ব্যাপারে তাঁর মনোভাব কারও অজানা নয়। মার্কিনিদের চোখে ‘নায়ক’ হিসেবে বিবেচিত প্রয়াত সিনেটর জন ম্যাককেইনকে তিনি প্রকাশ্যেই ‘লুজার (পরাজিত)’ বলে কটাক্ষ করেছেন। মার্কিন বাহিনীর একাধিক সাবেক জেনারেল ট্রাম্পের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর কাছে সবই ব্যবসা বা লাভ-ক্ষতির ব্যাপার। দেশের জন্য আত্মত্যাগের বিষয়টি তিনি বুঝবেন না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কঠোর সমালোচনার মুখে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ট্রাম্প যা বলেছেন, তাতে বিপদ আরও বেড়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, সাধারণ সেনাদের কাছে তিনি জনপ্রিয়। কিন্তু জেনারেলরা তাঁকে পছন্দ করেন না। এই জেনারেলরা সবাই বিদেশে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে চান। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য ‘সামরিক কন্ট্রাক্টরদের’ পকেট ভারী করা।

মার্কিন বাহিনীর একাধিক সাবেক জেনারেল প্রতিবাদ করে বলেছেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত জেনারেলরা নেন না। এ সিদ্ধান্ত নেন দেশের প্রেসিডেন্ট। সেনাসদস্যদের প্রতি এমন অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাবের জন্য এই জেনারেলদের কেউ কেউ ট্রাম্পকে দেশের কমান্ডার ইন চিফ বা সর্বাধিনায়ক হওয়ার অযোগ্য বলে ভর্ৎসনা করেছেন। অন্যরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, ‘মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ বা সামরিক শিল্প ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বললেও ট্রাম্প নিজে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আরব দেশে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রি করেছেন। শুধু তাই নয়, নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন, যিনি এর আগে একটি বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক ছিলেন। ভ্যানিটি ফেয়ার পত্রিকা মন্তব্য করেছে, নিজেকে যতই শান্তিবাদী হিসেবে উপস্থাপন করুন না কেন, ট্রাম্প আসলে প্রতিরক্ষা ব্যবসার সবচেয়ে বড় বন্ধু।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নয়–এগারো হামলার ১৯তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে বিদেশে মার্কিন সেনা অভিযান প্রশ্নে যে বিতর্কের সূচনা ট্রাম্প করেছেন, নভেম্বরের নির্বাচনে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন বলেছেন, তাঁর ছেলে বো বাইডেন একজন সাবেক সেনাসদস্য। বো মোটেই হতভাগা বা নির্বোধ নন।

এ কথা ঠিক, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশই ট্রাম্পকে সমর্থন করেন। আগামী নির্বাচনে জিততে হলে তাঁর এ সমর্থন অটুট রাখতে হবে। কিন্তু সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য দেশের সর্বাধিনায়ক যদি তাঁদের ‘হতভাগা’ ও ‘নির্বোধ’ বলে মনে করেন, তাহলে এই সেনাসদস্যদের কেউ কেউ যে ভোটের সময় মত বদলাবেন, সে কথা ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন