default-image

সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাটল গ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিতি অঙ্গরাজ্যগুলোর ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে মুসলিম ভোট। অন্য যেকোনো সময়ের মতোই এবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখবে সুইং স্টেট হিসেবে পরিচিতি ব্যাটল গ্রাউন্ড অঙ্গরাজ্যগুলো। ফলে এই মুসলিম ভোটাররা এবার কোন দিকে ঝুঁকছে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের বাসিন্দা ফাতিমা সালমান একজন সমাজকর্মী। আসন্ন নির্বাচনে নিজের পছন্দ এরই মধ্যে স্থির করে ফেলেছেন এই ৪৩ বছর বয়সী নারী। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, তিনি অবশ্যই জো বাইডেনকে ভোট দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার তিনটি সন্তান রয়েছে। ডোনাল্ড পুনর্নির্বাচিত হলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। বিষয়টি আমাদের অস্তিত্ব ও এই দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।’

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অবস্থান বিশেষত মুসলিম বিদ্বেষের কারণে ফাতিমা সালমানের মতো করে ভাবছেন অধিকাংশ মুসলিম ভোটার। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৪ লাখের বেশি মুসলমানের বাস। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ তাঁরা। কিন্তু মিশিগান, ফ্লোরিডা, উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ার মতো সুইং স্টেটে তাঁদের জনঘনত্ব একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অঙ্গরাজ্যে মুসলিমদের ভোট একটি বড় প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষত মিশিগান অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের ফল নির্ধারণে মুসলিম ভোটাররা অনেক বড় প্রভাবক হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। মুসলমান আমেরিকান সংগঠন এমগেজের সাংগঠনিক পরিচালক মোহাম্মদ গুলা বলেন, অঙ্গরাজ্যটিতে নিবন্ধিত মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজার। আর গত নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের কাছে ১ শতাংশ পয়েন্ট ভোটের ব্যবধানে হেরেছিলেন। সংখ্যার হিসাবে তা ১০ হাজার ভোটের কিছু বেশি।

বিজ্ঞাপন
default-image

এ বিষয়ে মোহাম্মদ গুলা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মুসলিম ভোটের কথা বিবেচনা করলে বলা যায়, আমরা খুব সহজেই (মিশিগানে) নির্বাচনের ফল বদলে দিতে পারি। এই মুহূর্তে মুসলিম মার্কিনদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আমরা পররাষ্ট্রনীতির কিছু বিষয়ের দিকেও নজর রাখছি। আর অন্য মার্কিন নাগরিকদের কাছে যেসব ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আমাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।’

২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি অভিষেকের পরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কয়েকটি নির্বাহী আদেশ দেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নেওয়া তাঁর এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে-বাইরে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ করে। এই পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আদালতে একাধিক মামলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প আরোপিত এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার একটি পরিমার্জিত সংস্করণকে অনুমোদন দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর। অনেকের পক্ষেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া সম্ভব হয় না। গোটা বিশ্বেই এর বড় প্রভাব পড়ে। সেই পরিস্থিতি মুসলিম মার্কিনদের মন থেকে মুছে যায়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু এমন পদক্ষেপ নিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি বিভিন্ন সময়ে করা টুইটে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি তিনি মিশিগানে তাঁর কট্টর সমর্থক ও উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী গ্রুপ প্রাউড বয়েজের সদস্যদের ‘পেছনে থাকতে ও সঙ্গে থাকতে’ বলেছেন। এই আহ্বান এই উগ্র দলের কার্যক্রমের প্রতি প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য স্বীকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়।

default-image
মুসলিম ভোট আমাদের নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাইডেনের প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে, প্রথম দিন থেকেই মুসলিম দেশগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ব্যবস্থা নেওয়া।
ফারুক মিতহা, জো বাইডেনের প্রচার দলের মুসলিম সম্পৃক্ততাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা

বিভিন্ন জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০-এর দশকে সাধারণত মুসলিম ভোটের প্রায় সমান অংশ যেত রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট বাক্সে। কিন্তু ঘটনাটি বদলে যায় ২০০১ সালের পর। ৯/১১ হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের আফগানিস্তান হামলা, ইরাক যুদ্ধ ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে মুসলিম ভোট হারাতে থাকে রিপাবলিকান দল। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তাজা। এ অবস্থার বেশ ভালো সুযোগ নিতে পারেন জো বাইডেন। সে চেষ্টাও তিনি করছেন।

এ বিষয়ে জো বাইডেনের প্রচার দলের মুসলিম সম্পৃক্ততাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফারুক মিতহা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মুসলিম ভোট আমাদের নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাইডেনের প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে, প্রথম দিন থেকেই মুসলিম দেশগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ দমনে ব্যবস্থা নেওয়াও তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত। গত সাত মাসে আমরা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে দেড় শতাধিক অনুষ্ঠান করেছি। বিশেষত ব্যাটল গ্রাউন্ড অঙ্গরাজ্যগুলোয় এই জনগোষ্ঠীর ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবেন। এর মধ্যে রয়েছে মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডা ও উইসকনসিন। এমনকি জর্জিয়া, টেক্সাস ও ওহাইওতেও তাঁরা বড় ভূমিকা রাখবেন বলে মনে হচ্ছে।’

মুসলিমদের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাবের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রচার দলের ডেপুটি ন্যাশনাল সেক্রেটারি কোর্টনি প্যারেলা বলেন, প্রেসিডেন্ট ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চান। একই সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির বিষয়েও তিনি আন্তরিক। ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যে হওয়া শান্তি স্থাপনে তিনিই মুখ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। প্যারেলা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে শান্তি স্থাপনে অন্যরা ব্যর্থ হলেও তিনি তা পেরেছেন।

প্রেসিডেন্ট ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চান। একই সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির বিষয়েও তিনি আন্তরিক।
কোর্টনি প্যারেলা, ট্রাম্পের প্রচার দলের ডেপুটি ন্যাশনাল সেক্রেটারি
বিজ্ঞাপন
default-image

জাতীয় পর্যায়ের মতোই মিশিগানে হওয়া জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন জো বাইডেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই অঙ্গরাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশেরই সমর্থন তিনি আদায় করেছেন। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) করা সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মুসলিম নিবন্ধিত ভোটারদের ৭১ শতাংশেরই সমর্থন রয়েছে বাইডেনের দিকে। ১৮ শতাংশ সমর্থন দিচ্ছেন ট্রাম্পকে। আর ১১ শতাংশ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

তবে মিশিগানের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একমুখী ধরে নিলে ভুল হবে। এ বিষয়ে মিশিগান মুসলিম কমিউনিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাহমুদ আল-হাদিদি আল-জাজিরাকে বলেন, ১৯৩০-এর দশকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিমরা এসে বাস করছে যুক্তরাষ্ট্রে। এখানে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ নানা অঞ্চলের মুসলমানদের বাস। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানদের এক-পঞ্চমাংশই আবার জন্মসূত্রে মার্কিন, যারা বর্ণে কৃষ্ণাঙ্গ। ফলে গত চার বছরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের কারণে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেমন ক্ষোভের জন্ম হয়েছে, তেমনি তাদের একটি অংশের মধ্যে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতি বিরাগও কম নয়।

আবার বয়স হিসেবেও মনোভঙ্গিতে রয়েছে পার্থক্য। জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর অধিকাংশ মুসলিম তরুণ যখন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন, তখন তাঁদের পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। এই বয়স্ক ব্যক্তিরাই তাঁদের তারুণ্যে যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে শান্তি ও নিরাপত্তা পাওয়ার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ফলে একই পরিস্থিতি তাঁদের পৃথকভাবে চিন্তা করাচ্ছে।

আল-হাদিদি বলেন, শান্তি ও নিরাপত্তা অনেক বড় একটি বিষয়। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট সহিংসতা এ বিষয়ে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনেক মুসলিম ব্যবসায়ীই মনে করছেন, বাইডেন তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়ে তেমন মনোযোগী নয়। আর ট্রাম্প সহিংস বিক্ষোভকারীদের বলপ্রয়োগে নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বারবার বলেছেন। এমন নানা কারণেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ট্রাম্পের নীরব সমর্থক রয়েছে, যার সংখ্যা কম নয়।

এদিকে বাইডেনের প্রচার দলকে আরও কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাইডেনের হয়ে প্রচার চালানো মুসলিম সংগঠন এমগেজের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলপন্থী’ ও ‘জায়নবাদের সমর্থক’ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংগঠনটি এ ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও অনেক মুসলিম ভোটারই এ ধরনের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। মূলত প্রাথমিক নির্বাচন থেকে বার্নি স্যান্ডার্সের সরে দাঁড়ানোর পরই বহু মুসলমান ভোটার আশাহত হন। এই ভোটারদের নিজের দিকে টানা এবং ভোটের দিন পর্যন্ত অন্তত ধরে রাখাই এখন বাইডেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য পড়ুন 0