default-image

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) তৎকালীন প্রধান জেমস কোমি একটি বোমা ফাটিয়েছিলেন। মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি জানান, ওই নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ৩৩ হাজার ই–মেইল বেআইনিভাবে মুছে ফেলেছেন। ওই সময় হিলারি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে জনমত জরিপে নিরাপদ ব্যবধানে এগিয়ে। কিন্তু এক চিঠিতেই যেন সব হিসাব পাল্টে গেল।

জেমস কোমি মার্কিন কংগ্রেসকে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর। সে সময় মার্কিন সংবাদমাধ্যমসহ প্রায় সব নির্বাচনী বিশ্লেষকের হিসাবে, হিলারির জয়ের সম্ভাবনা ছিল ৮৭ শতাংশ। কিন্তু ৮ নভেম্বরের নির্বাচনের পর দেখা গেল, হিলারি নয়, বিজয়ী হয়েছেন ট্রাম্প। অধিকাংশ ভাষ্যকার মনে করেন, নির্বাচনের এত কাছে এসে কোমির এমন একটি বোমা ফাটানোর কারণেই জয়ের মুখ দেখতে পারেননি হিলারি।

বিজ্ঞাপন

এবার ঠিক সেই রকমই একটি অঘটনের অপেক্ষায় রয়েছেন ট্রাম্প। আর সে আশাতেই তিনি বারবার সামনে হাজির করছেন বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন বাবার নাম ব্যবহার করে অবৈধভাবে চীন, রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করেছেন। আর এসবই সম্ভব হয়েছে জো বাইডেনের সমর্থনে অথবা তাঁর জ্ঞাতসারে।

জো বাইডেনের নিজের অঙ্গরাজ্য ডেলাওয়ারে এক কম্পিউটার মেরামতের দোকান থেকে রুডি জুলিয়ানি উদ্ধার করেছেন হান্টারের একটি পুরোনো কম্পিউটার। তাঁর দাবি, ওই কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে বিদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হান্টারের ই–মেইল চালাচালির প্রমাণ রয়েছে। সাক্ষী হিসেবে তিনি এক রুশ বংশোদ্ভূত আমেরিকানকে হাজির করেছেন। দ্বিতীয় বিতর্কের দিন তাঁকে নিয়ে ট্রাম্পের প্রচারণাশিবির সংবাদ সম্মেলনেরও ব্যবস্থা করে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, হান্টার বাইডেনের এই কম্পিউটার জো বাইডেনের অপরাধের অকাট্য প্রমাণ। তাঁকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে এফবিআই ইতিমধ্যে তদন্ত করেছে। বাইডেন অপরাধী—এমন প্রমাণ তারা পায়নি। বরং ইঙ্গিত করেছে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী জুলিয়ানির মাধ্যমে রাশিয়া জো বাইডেনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। বিচার বিভাগও জো বাইডেনকে গ্রেপ্তারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। বলা বাহুল্য, হান্টার বাইডেনের কম্পিউটার কীভাবে ওই দোকানে পৌঁছাল, আর জুলিয়ানিই–বা তা কী করে সংগ্রহ করলেন, তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেরিল্যান্ডের ওয়াল্টার রিড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সে সময় হাসপাতালের বিছানা থেকে করা এক টুইটে তিনি শুধু বাইডেনকেই নয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং হিলারি ক্লিনটনকেও গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। তিনি টুইটে লেখেন, ‘এ ব্যাপারে একটা কিছু করুন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্ক্যান্ডাল এটা, যার সঙ্গে জড়িত বাইডেন, ওবামা ও কুচক্রী হিলারি। তাঁরা দেশবিরোধী চক্রান্তে জড়িত। বাইডেনকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া উচিত নয়। অপরাধ করতে গিয়ে সে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে।’ অবশ্য ট্রাম্পের এ দাবির কোনো জবাব দেননি অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার।

ট্রাম্পের অতি অনুগত সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ ও একই পরিবারভুক্ত নিউইয়র্ক ডেইলি পোস্ট ছাড়া হান্টার বাইডেন সম্পর্কে এ ‘আষাঢ়ে গল্প’ আর কেউ সত্য বলে মনে করেনি। ফলে এ বিষয়ে সামনের সারির কোনো সংবাদমাধ্যম কার্যত বিস্তারিত প্রতিবেদন করেনি। জুলিয়ানি ও তাঁর এক রুশ-আমেরিকান সহকর্মীর কাছ থেকে প্রমাণ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল কিছু ই–মেইলের কপি পেয়েছিল। এক প্রতিবেদনে পত্রিকাটি জানায়, সেসব ই–মেইলে তারা জো বাইডেনের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি।

ট্রাম্পের প্রচারণাশিবির সম্ভবত আশা করেছিল হান্টার ও জো বাইডেনের দুর্নীতির এমন প্রমাণ পাওয়ার পর ২০১৬ সালের কোমি-হিলারির ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ট্রাম্প বিষয়টিকে মূলধারায় নিয়ে আসতে কম চেষ্টা করেননি। জো বাইডেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিতর্কে তিনি প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। জবাবে বাইডেন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি কোনো বিদেশি সরকারের কাছ থেকে এক পয়সাও কখনো নিইনি।’

বিজ্ঞাপন

বাইডেনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এখানেই শেষ নয়। ফেসবুকে ও কট্টর ডানপন্থী একাধিক ওয়েবসাইটে প্রতিদিন ভয়াবহ সব তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নোংরা তত্ত্ব হাজির করেছে ‘কিউঅ্যানন’ নামের একটি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠী। তাদের দাবি, হান্টার বাইডেন শিশু পাচার ও শিশুদের সঙ্গে যৌনকর্মে জড়িত। হিলারি ক্লিনটন ও ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ট্রাম্পকে কিউঅ্যাননের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর নিরীহ উত্তর ছিল, ‘আমি এদের বিষয়ে কিছু জানি না। শুধু এটুকু জানি, এরা পেডোফিলিয়া বা শিশুদের সঙ্গে যৌনকর্মের বিরোধী। এটি একটি ভালো কাজ।’

ট্রাম্পের অতি অনুগত সমর্থকদের বাইরে এ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে কোনো পক্ষই উৎসাহ দেখায়নি। এর আগে একই ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকেরা অভিযোগ করেছিলেন, হিলারি ও বিল ক্লিনটন শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত। ওয়াশিংটন ডিসির এক পিৎজার দোকানের বেসমেন্ট থেকে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে জানা যায়, যে পিৎজা দোকানের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে কোনো বেসমেন্টই নেই।

নির্বাচনী প্রচারণার এ শেষ পর্যায়ে ট্রাম্পশিবির এখন শুধু অবাস্তব ও অসত্য প্রচারণায় নেমেছে তা–ই নয়, বাইডেনের পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণও শুরু হয়েছে। শুধু বাইডেনের ছেলেই নয়, তাঁর ভাইকেও রাজনৈতিক কাদা–ছোড়াছুড়ির মধ্যে টেনে আনা হচ্ছে। ট্রাম্পের অন্যতম উপদেষ্টা জেসন মিলার বলেছেন, বাইডেন ও তাঁর পরিবার ওয়াশিংটনের নোংরা কর্মকাণ্ডের অংশ। তাঁরা বাইডেনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলার কামিয়ে নিয়েছেন।

সমস্যা হলো এসব অভিযোগ তোলা হলেও ট্রাম্প বা তাঁর প্রচারশিবির জো বাইডেনের বিরুদ্ধে কোনো অবৈধ কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। এর আগে সিনেটের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটিতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র রিপাবলিকান সিনেটর জন জনসন এ নিয়ে তদন্ত করেছেন। কিন্তু তিনিও বাইডেনের বিরুদ্ধে কোনো অবৈধ কার্যকলাপের প্রমাণ পাননি।

বাইডেনের বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে খুব লাভবান হবেন বলেও মনে হয় না। ডেমোক্রেটিক নির্বাচনী বিশ্লেষক বেসিল স্মিকলে মনে করিয়ে দিয়েছেন, এসব অভিযোগ তুলছেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি হোয়াইট হাউসে তাঁর অবস্থানকে ব্যবহার করে নিজে ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিপুলভাবে লাভবান হয়েছেন। একই কথা বলেছেন রিপাবলিকান সিনেটর বেন স্যাস। তাঁর কথায়, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়াকে তাঁর জন্য একটি ব্যবসায়িক সুযোগ বলে ধরে নিয়েছেন।

হান্টার বাইডেনের প্রসঙ্গ বারবার তুলে এবং তাঁর সঙ্গে জো বাইডেনকে জড়িয়ে ট্রাম্প আসলে নিজেরই ক্ষতি করছেন। এ কথা বলেছেন রিপাবলিকান জনমত জরিপকারী ফ্রাঙ্ক লুনৎস। দ্য হিল–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্প কেন হান্টার বাইডেনের কথা তুলে এত সময় ব্যয় করছেন, আমি বুঝি না। ভোটাররা তো এ প্রসঙ্গে আদৌ আগ্রহী নয়। হান্টার বাইডেন তো কারও টেবিলে খাবার তুলে দেবেন না। তিনি তো কাউকে চাকরি জুটিয়ে দেবেন না। তিনি কোভিড সমস্যার সমাধানও করবেন না। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘুরেফিরে সেই একই কথা বলছেন।’

মন্তব্য পড়ুন 0