শিকাগো ঘুরে...

বিজ্ঞাপন
default-image

হঠাৎ ঠিক হয়ে গেল শিকাগো যাব। সামারের ছুটি শুরুর কিছুদিন আগে আমার মেয়ে মিশাল এসে বলল, ‘আম্মু ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেস থেকে ইমেইল এসেছে। ওরা আমাকে সিলেক্ট করেছে সামারে ১০ সপ্তাহের একটা ইন্টার্নশিপ করার জন্য।’ ইমেইল ভালো করে পড়ে দেখলাম, মিশালকে ১০ হাজার ইউএস ডলার ইন্টার্নশিপ অফার করা হয়েছে। সঙ্গে আছে মেরিল্যান্ড থেকে শিকাগো আসা যাওয়ার ট্রাভেল এক্সপেন্স, ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট হাউজিংয়ের ফুল বোর্ডিংসহ ফুল মিল প্ল্যান। আর ছিল ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি ও ফিটনেস সেন্টারে ফুল অ্যাকসেস। গর্বিত অনুভব করছিলাম আসলে এত বড় একটা সুযোগ মানুষের জীবনে সব সময় আসে না।
শুরু হয়ে গেল শিকাগো যাওয়ার প্রস্তুতি। ছেলে সমীরসহ আমাদের টিকিট বুকিং দিলাম। মিশালের টিকিট ইউনিভার্সিটি থেকে ইমেইলে পাঠিয়েছে। মেয়ে চলে গেল ১৭ জুন, সোমবার।
আমাদের ফ্লাইট শুক্রবার। ফ্লাইট বিকেলে। বিকেলে ড্রাইভ করে ছেলেকে নিয়ে চলে গেলাম বাল্টিমোর ওয়াশিংটন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে।
মেরিল্যান্ড থেকে এক ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগল শিকাগো মিডওয়ে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে। আমার মামাতো ভাই রাশমি এয়ারপোর্টে আসল পিক আপ করতে। আমরা সোজা চলে গেলাম মিশালের কাছে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো। সেখান থেকে মিশালকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম। পরে গেলাম মামাতো ভাইয়ের বাসায়।
পরদিন সকালে নাশতা সেরে সবাই মিলে তৈরি হয়ে গেলাম ডাউন টাউন শিকাগোতে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। রাশমি গত এক বছরে শিকাগো শহরটা খুব ভালোই চেনে। শিকাগো ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। রাশমি ড্রাইভ করে নিয়ে গেল ডাউন টাউন শিকাগোতে। রাশমি যখন ড্রাইভ করছিল আমি তখন রাস্তার দুই পাশের আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর তার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া শিকাগো রিভারের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।
ডাউনটাউনের সাইড ওয়াক দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম উইলিস টাওয়ার (সিয়ার্স টাওয়ার) যাওয়ার উদ্দেশ্যে। গাড়ি পার্কিং থেকে ওটা মাত্র কয়েক ব্লক দূরে ছিল। টিকিট নিলাম অবজারভেশন লেভেলে যাওয়ার জন্য। টিকিট কাউন্টারে বেশ লম্বা লাইন। ১১০ তলার ১৪৫০ ফুট উঁচু এই স্কাই স্ক্র্যাপার ১৯৭৩ সালে নির্মিত। আমেরিকাতে তৃতীয় উচ্চতম ভবন এটি। প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি মানুষ এই স্কাই ডেক পরিদর্শন করতে আসে।

default-image

এত সুনিপুণ ভাস্কর্য আর কারুকার্য দিয়ে এই টাওয়ারের ইতিহাস উপস্থাপন করেছে যে উপভোগ করতে করতে কখন যে এত লম্বা লাইন শেষ হয়ে গেল টেরই পাইনি। সবচেয়ে বেশি অভিভূত হয়েছি এই জেনে যে, সিয়ার্স টাওয়ারের ডিজাইনার ছিলেন একজন বাংলাদেশি আমেরিকান, ফজলুর রহমান খান।
এলিভেটরে ১১০ তলার উইলিস টাওয়ারের ১০৩ তলায় অবস্থিত স্কাই ডেকে পৌঁছে গেলাম। স্কাই ডেকে থেকে শিকাগো শহরের পুরো ভিডিওটা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। স্কাই ডেক ঘুরে চারটি স্টেট দেখা যায়। সেগুলা হলো—ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, মিশিগান, ও ওয়েস্টকনসিন।
স্কাই ডেকের পরিবেশটা ছিল বেশ মনোরম আর ভিজিটরদের আনাগোনায় ভরপুর ছিল। সবাই গ্লাসের উইন্ডো দিয়ে নিচের শিকাগো শহর উপভোগ করছিল। সেখানে একটা গিফট শপ ছিল যেখানে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। স্কাই ডেকের গ্লাস ব্যালকনিতে প্রফেশনাল ছবি নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। ১০৩ তলার ওপর গ্লাস ব্যালকনি থেকে ছবি নিলে পুরো শিকাগো ছবিতে আসে কিন্তু ওই গ্লাস দিয়ে নিচের দিকে তাকালে ভয়ে বুক কাঁপতে থাকে। ছবি তোলার জন্য আবারও বড় লাইন দিতে হলো।
অনেকক্ষণ সময় নিয়ে অবজারভেশন লেভেল ঘুরে আবার লিফট নিয়ে নিচে চলে এলাম। দুপুরের খাবার সারলাম। এবার আমরা সিয়ার্স টাওয়ারের আশপাশে যা কিছু আছে ঘুরে দেখার মতো, সেসব দেখতে শুরু করলাম। উপভোগ করছিলাম আশপাশের রাস্তাঘাট, আকাশচুম্বী ভবন ও লাইভ মিউজিক চলছিল। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম ক্রাউন ফাউন্টেন। দেখতে পেলাম ক্লাউড গেট। সেটাও অনেক সুন্দর। শেষে চোখে পড়ল মিলেনিয়াম পার্ক, পাশেই ছিল লেক মিশিগান। লেক মিশিগানের পাড়ে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটলাম।
সবাই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত এবার বাসায় ফিরে যেতে হবে। সেদিন বাসায় ফিরে এসে সবাই বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। রাতের খাবারের পর আবারও কিছু নতুন জায়গা দেখার আগ্রহ ও স্বপ্ন নিয়ে ঘুম।
শিকাগোতে আমার শেষ দিন। আজ রাতে মেরিল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট। আজ সারা দিন হাতে সময় ছিল শিকাগো ঘুরে বেড়ানোর।
আমি তখন ইউটিউবে কাজ করি, যেখানে যাই সেখানে ছবি তোলা আর ভিডিও করা একটা নেশা ছিল। আর ভ্রমণ করতে গেলে তো কোনো কথাই নেই। আমি তার আগের দিনের সিয়ার্স টাওয়ারের ভ্রমণের ভিডিওটা এডিট করে আমার ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করেছিলাম। তখন আমরা সবাই মিলে রাশমির লিভিং রুমের বিগ স্ক্রিন টিভিতে ভিডিওটা দেখি।

default-image

আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম আজ লাঞ্চের জন্য একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে যাব। ওটা শিকাগোতে অনেক ফেমাস। রাশমি আমাদের সবাইকে নিয়ে চলে গেল। সেখানে দুই একটা বাংলাদেশি দোকান ছিল। চোখে পড়ল ভালো মানের কিছু ইন্ডিয়ান স্টোর যেখানে ছিল ফাইন জুয়েলারি আর দামি পার্টি ড্রেস, ডিজাইনার লেহেঙ্গা চোলি, আনারকলি, সারারা, ঘাগরা, শেরওয়ানি ইত্যাদি।
ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার দুই পাশের এই রং বেরঙের অভিজাত দোকানগুলো ছিল খুবই মনোমুগ্ধকর। আমরা পৌঁছে গেলাম সেই বিখ্যাত ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। রাশমি খাবারের অর্ডার দিল। খাবার দেখতে যত সুন্দর ছিল খেতেও তেমন মজাদার ছিল। আমেরিকাতে আসার পর আমি অনেক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছি, কিন্তু সেই রেস্টুরেন্টর খাবারের মতো আমি আর কখনো খাইনি। সবাই মিলে এক সঙ্গে মজা করে দুপুরের খাবার শেষ করার পর, আমরা চলে গেলাম ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো পরিদর্শনের জন্য।
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, ইলিনয় স্টেটের শিকাগোতে অবস্থিত একটা প্রাইভেট রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। এই ইউনিভার্সিটি ১৮৯০ সালে নির্মিত হয়েছে। বিশাল এই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ২১৭ একর জায়গা জুড়ে হাইড পার্ক এলাকায় লেক মিশিগানের কাছে। এই ইউনিভার্সিটিতে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এবং গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম আছে। আর্টস , সায়েন্স ছাড়াও এই ইউনিভার্সিটি অনেক সুপরিচিত অন্যান্য প্রফেশনাল স্কুলের জন্যও।
এই বিশাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস এক দিনে হেঁটে দেখে শেষ করা সম্ভব ছিল না। আমরা শুধু আশপাশ ঘুরে দেখলাম।
সেদিন শিকাগোর আবহাওয়া ছিল মেঘলা, হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার মনের অবস্থাও ছিল সে রকম। মেয়েকে একা রেখে আমাকে সেদিন ফিরে আসতে হয়েছে মেরিল্যান্ড। মনটা কিছুতেই মানছে না, হাজার হলেও মায়ের মন। নিজের সন্তানকে যতক্ষণ চোখের সামনে দেখা যায়, মনে হয় তারা ভালো আছে নিরাপদে আছে। আর চোখের আড়াল হলে, ভালো আছে কিনা নিরাপদে আছে কিনা, হাজারো প্রশ্ন সারাক্ষণ বিব্রত করতে থাকে। কিন্তু জীবনে ভালো কিছু অর্জন করতে হলে, সফল হতে হলে অনেক দূরে যেতে হয়। যেটা বাড়ির আঙিনায় বসে অর্জন করা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। সন্তানরা যখন সাফল্যের চাবিকাঠি ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে ঝলমলে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তাদের সেই সফরে সাহায্য সহযোগিতা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। ভবিষ্যতের সেই সফলতা আনন্দ আর তাকে ছেড়ে চলে আসার মেঘলা আকাশের বুক চিরে ঝরে পড়া বৃষ্টির মতো বুকের ভেতরটা আনন্দ-বেদনার সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরে। রাশমি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ছেড়ে, লেক মিশিগানের কোল ঘেঁষে হাইওয়ে দিয়ে, শিকাগো মিডওয়ে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।
মিশিগানের সেই জল রাশির স্রোতোধারা, আজও আমাকে শিহরিত করে। আজও আমাকে সেই মুহূর্তে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যেখানে ছিল আনন্দ-বেদনার মহা সমারোহ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন