default-image

মার্কিন নির্বাচনে আবার রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি সামনে এসেছে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার পেছনে রাশিয়ার হাত ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের নির্বাচনেও রাশিয়া ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করেছিল প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এবার তারা সফল হতে পারেনি। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। শুরু হয়েছে কথার লড়াই। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘হত্যাকারী’ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, গত নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রমাণ মিললে পুতিনকে মূল্য দিতে হবে।

বাইডেনের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্রেমলিন। মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য নজিরবিহীন। তাঁর কথা থেকে এটি পরিস্কার, তিনি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি চান না। এ কারণে দুই দেশের সম্পর্ক খুবই খারাপ। ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে দেশে ডেকে পাঠিয়েছে মস্কো।

নতুন মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে রাশিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের জন্য সাহায্য করতে চেয়েছে। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জো বাইডেনের জয় ঠেকাতে কলকাঠি নেড়েছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য রাশিয়ার মতো একটি শত্রু দেশের তৎপরতা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তবে রাশিয়া এক বিবৃতিতে ২০২০ সালে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র ডিমিত্রি পেস্কোভ বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন অবরোধ আরোপের অজুহাত খুঁজতে এমন অমূলক অভিযোগ আনা হচ্ছে।

মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক আভরিল হাইনেসের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, জো বাইডেনের বিরুদ্ধে মস্কো তাদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের তারা ব্যবহার করেছে।

বার্তা সংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার বিষয়টি রাশিয়া দক্ষতার সঙ্গে করেছে এমন নয়। মার্কিন গোয়েন্দারা দ্বিতীয়বারের মতো নিশ্চিত হয়েছে, রাশিয়া এ কাজে তৎপর রয়েছে। জেনে হোক বা না জেনে হোক ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। রাশিয়া তাঁর মাধ্যমে মার্কিন নির্বাচনে নিজেদের জয় পাওয়ার চেষ্টা করেছে।

২০১৬ সালের নির্বাচনেও এমন অভিযোগ উঠেছে। সে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাতে রাশিয়া সহযোগিতা করেছে। তাদের গোয়েন্দাদের দিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে তদন্তও হয়েছে। তদন্তে ট্রাম্পের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচন নিয়ে রাশিয়া যে কলকাঠি নেড়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

২০২০ সালের নির্বাচনে রাশিয়া একই কাজ করতে চেয়েছে। গত নির্বাচনে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা ভোট জালিয়াতি, ভুয়া ভোট এবং কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ করেছেন। বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সন্দেহ তীব্র করা হয়েছে। এর সবই গভীর চক্রান্ত ও কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য অপপ্রচার বলে মনে করা হচ্ছে। এসবের পেছনে এখন দেশ–বিদেশের সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু রাজ্যে নির্বাচনকে স্বচ্ছ রাখতে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।

সিএনএনে প্রতিবেদনে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প সব সময় রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে আসছেন। যদিও নির্বাচনের আগে থেকেই তিনি নির্বাচনে কারচুপির কথা বলেছেন। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ভোটের ফলাফল পাল্টাতে চেয়েছেন। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর এখনো সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে তাঁর পরাজয় স্বীকার করেননি। তাঁর ব্যাপক সমর্থকগোষ্ঠীও এই প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এসব কাজের মাধ্যমে মার্কিন গণতন্ত্রকেই সংকটগ্রস্ত করে তোলা হয়েছে।

১৬ মার্চ প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু রাশিয়া নয়, ইরানও মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছিল। ভোট গ্রহণের ইলেকট্রনিক মেশিন বিকল করে দেওয়া, সাইবার হামলার মধ্য দিয়ে ভোটের হিসাব পাল্টে দেওয়ার জন্য বৈদেশিক শক্তির সক্রিয়তা মার্কিন গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে বাইরের এসব খেলোয়াড় সফল হয়ে ২০২০ সালে এ দেশের গণতন্ত্রকেই তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের উসকানিতে ক্যাপিটল হিলে হামলা হয়েছে। আইন প্রণেতাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু দেশগুলো যাতে এমন অবস্থানে যেতে না পারে, তাঁর জন্য আগাম ব্যবস্থা নিতে এই গোয়েন্দা প্রতিবেদন সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনের আইনপ্রণেতা অ্যান্দ্রি ডারকেচকে দিয়ে রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন কলকাঠি নেড়েছেন। ডারকেচ রুশ এজেন্ট হিসেবে নিশ্চিত কাজ করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দফা অভিশংসনের সময় ডারকেচ ট্রাম্পের আইনজীবী রুডি জুলিয়ানির মাধ্যমে ভুয়া তথ্য প্রচার করেছেন।

রাশিয়ার হস্তক্ষেপের মূল বিষয় ছিল, বাইডেনের ঘনিষ্ঠ মানুষসহ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট লোকজনের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য করে অপপ্রচার ছড়িয়ে দেওয়া। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান, ভার্জিনিয়া থেকে নির্বাচিত মার্ক ওয়ার্নার বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কোনো গভীর বিশ্লেষণ ছাড়াই বলা হয়েছে, কারা রাশিয়ার ক্রীড়নক হয়ে কাজ করেছে। অনেকেই নিজে না জেনে রাশিয়ার এমন ফাঁদে পা দিয়েছে।

প্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে রাশিয়া জো বাইডেনের পরিবার ও তাঁর ছেলে দুর্নীতিতে জড়িত এমন প্রচারণা চালায়। বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের সঙ্গে ইউক্রেনের যোগসূত্র তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। ট্রাম্পও এ নিয়ে জোর প্রচারণা চালান। এমনকি নির্বাচনের ঠিক আগে আগে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন অ্যাটর্নি জেনারেলকে। সবই করেছেন রাশিয়ার প্ররোচনায়।

প্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ডারকেচ ছাড়া আরেকজন রুশ এজেন্ট কনস্টান্টিন কিলিম্বিক মার্কিন রক্ষণশীল গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করে জো বাইডেন ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে প্রচার চালানোর প্রয়াস নিয়েছে।

রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ২০২০ সালের আগাম ভোট গ্রহণের সময়সীমা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা। জর্জিয়া থেকে অ্যারিজোনা, টেক্সাস থেকে আইওয়াসহ সর্বত্র আগাম ভোটের ব্যবস্থা থকার কারণেই গত নির্বাচনে বেশি ভোট পড়েছে এবং জো বাইডেন বিজয়ী হয়েছেন।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশের পর রুশ–মার্কিন সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবিসি নিউজের ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একহাত নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রমাণ পাওয়া গেলে পুতিনকে মূল্য দিতে হবে। রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথা হয়েছে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, তিনি ভ্লাদিমির পুতিনকে বলেছেন, ‘আমি তোমাকে ভালোভাবেই জানি, তুমিও আমাকে জানো।’

যদি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রমাণ দাঁড় করানো যায়, তাহলে পুতিনকে প্রস্তুত থাকতেও বলেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।

গুড মর্নিং আমেরিকা অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, বৈদেশিক নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। তিনি প্রতিপক্ষকে ভালোভাবেই চেনেন বলে উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একজন হত্যাকারী কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তিনি তাই মনে করেন।

২০১৭ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একই প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেছিলেন, অনেক হত্যাকারীই সর্বত্র বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রও নির্দোষ নয় বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেছিলেন।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উষ্ণ সম্পর্কের কথা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নানা কথা চালু আছে।

সাক্ষাৎকারে বাইডেন বলেন, ‘আমি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে বলেছি, আপনার চোখের দিকে চেয়ে আমি বলতে পারি, আমার মনে হয় না, আপনার কোনো আত্মা আছে। উত্তরে পুতিন বলেছেন, আমরা একজন আরেকজনকে ভালোভাবেই জানি!’

রুশ রাষ্ট্রদূতকে দেশে ডেকে পাঠানোর পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বেলায় মার্কিন স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এদিকে রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের স্পিকার ভ্যাচেস্লাভ ভলোডিন প্রেসিডেন্ট পুতিনকে হত্যাকারী হিসেবে উল্লেখের নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাইডেন রুশ নাগরিকদের অসম্মান করেছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর আক্রমণ দেশের নাগরিকদের ওপর আক্রমণের সমান।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন