default-image

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বর্তমানে স্পষ্টত দুটি ধারা বিরাজ করছে। এর মধ্যে রিপাবলিকান দল সেই ধারাটিকেই বেছে নিয়েছে, যে পথে হেঁটেছেন সদ্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুরো রিপাবলিকান দলের কথা বললে ভুল হবে। রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি নিজেদের আনুগত্য এখনো ধরে রেখেছে। সর্বশেষ সিনেটে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা অভিশংসন প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে হওয়া ভোটাভুটিতেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে।

একটি রাজনৈতিক দলের প্রবণতা আসলে তার নেতাদের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়। সেই হিসেবে রিপাবলিকান দলের সিনেটররা যে পথ বেছে নিয়েছেন, তাতে ট্রাম্প অনুসৃত পথটিই প্রধান হয়ে উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস ছাড়ার এক সপ্তাহ পরও রিপাবলিকান দল তাঁকে ছাড়তে পারেনি, সে লক্ষণও তার মধ্যে নেই। দলটির মধ্যে ট্রাম্পের অনুসারী ও কট্টরপন্থীরা ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। অন্যদিকে ক্যাপিটল হিল হামলাসহ নানা বিতর্কিত ঘটনায় যেসব আইনপ্রণেতা তাঁর নিন্দা করেছিলেন, তাঁদের নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে রীতিমতো লড়তে হচ্ছে। দলে ট্রাম্পবিরোধী ঘরানার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত নেব্রাস্কার সিনেটর বেন সাসে, ইউটাহর সিনেটর মিট রমনি, ইলিনয়ের প্রতিনিধি অ্যাডাম কিনজিঙ্গারের মতো নেতারা অনেকটাই একা হয়ে পড়েছেন।

বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসন বিচার শুরু নিয়ে হওয়া ভোটাভুটিতে। মার্কিন সিনেটে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন-পরবর্তী বিচার শুরুর কথা আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু তার আগে ২৬ জানুয়ারি সে বিচারকাজে বাদ সেধে বসেন কেনটাকি থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল। শাসনতান্ত্রিক সূত্রে আপত্তি তুলে তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্টের বিচার করার কথা শাসনতন্ত্রে নেই, ফলে সংখ্যাগুরু ডেমোক্র্যাটরা যে বিচারের আয়োজন করছেন, তা অশাসনতান্ত্রিক। এই বিচার বাতিল প্রশ্নে এখনই ভোটাভুটি চাই।

বিজ্ঞাপন

ভোটাভুটিতে আপত্তি ছিল ডেমোক্র্যাটদের। তা সত্ত্বেও ভোট গৃহীত হলে দেখা গেল, মোট ৪৫ জন রিপাবলিকান বিচারের বিপক্ষে। সিনেটের ৫০ জন ডেমোক্র্যাটের সঙ্গে মাত্র ৫ জন রিপাবলিকান বিচারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ফলে বিচার যথারীতি চলবে, তবে বিচার শেষে ভোটের ফল কী হতে পারে, এ থেকেই তা স্পষ্ট। নিয়ম অনুযায়ী, সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ বা মোট ৬৭ জন সিনেটরের সমর্থন না পেলে ট্রাম্প খালাস পেয়ে যাবেন। স্পষ্টতই ১৭ জন রিপাবলিকান এই বিচারে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গী হবেন, তেমনটা ভাবার সংগত কারণ নেই।

রিপাবলিকানদের প্রধান যুক্তি, ট্রাম্প তো ক্ষমতায় নেই, তাহলে তাঁকে নিয়ে এত ঘাঁটাঘাঁটি কেন? একজন রিপাবলিকান নেতা বলেছেন, এই বিচার যদি চলতে দেওয়া হয়, তাহলে হেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নেই, যাকে এরপর বিচারে টেনে আনা যাবে না। এমনকি দাস রাখার অপরাধে প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনেরও বিচার হতে পারে।

শাসনতান্ত্রিক বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য এই যুক্তি মানেন না। তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন ইতিহাসে ক্ষমতা ত্যাগের পর অভিশংসন ও বিচারের বিস্তর উদাহরণ রয়েছে। ‘সাবেক’ এই কারণে বিচার থেকে রক্ষা পাওয়া গেলে তো অপরাধীমাত্রই বিচারের আগে পদত্যাগ করে বলতে পারেন, আমি আর ক্ষমতায় নেই, অতএব বিচার অশাসনতান্ত্রিক। ১৮৭৬ সালে একজন যুদ্ধমন্ত্রী সেই মতলবে অভিশংসন বিচারের কয়েক দিন আগে পদত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু বিচার থেকে রক্ষা পাননি।

আইনবিশারদেরা বলছেন, শাসনতন্ত্রে স্পষ্ট বলা আছে—ঘুষ, রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মতো বড় অপরাধের জন্য অভিশংসিত করা যাবে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এমন ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে ক্ষমতা থেকে স্থায়ী বহিষ্কার ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে। ডেমোক্র্যাটরা অভিশংসনের এই শাস্তির বিধানের ওপর জোর দিয়েছেন। ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও ট্রাম্প এখনো অনেক ক্ষতি করতে সক্ষম। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ তাঁর অনুগত সমর্থক। তিনি এখনো এদের উসকে দিতে পারেন।

যে ৫ জন রিপাবলিকান সিনেটর বিচারের পক্ষে ভোট দেন, তাঁদের কেউ কেউ ডেমোক্র্যাটদের যুক্তির সঙ্গে একমত। কিন্তু বিপক্ষে ভোট দেওয়া সব রিপাবলিকান নেতাই যে নিজের মতে অটল থাকবেন, তেমনটি বলা যাচ্ছে না। যেমন, সিনেটে রিপাবলিকানদের নেতা মিচ ম্যাককনেল বিচারের বিপক্ষে ভোট দেন। এর আগে তিনি কংগ্রেসে হামলার পেছনে ট্রাম্পের উসকানি কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বিচারে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছিল। তাই পদ্ধতিগত ভোটে তিনি বিচারের বিপক্ষে ভোট দিলেও শুনানির পর সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তিনি যদি মত বদলান, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। এমন আরও কয়েকজন আছেন।

তবে অধিকাংশ নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মনে করেন, ২৬ জানুয়ারির ভোট থেকেই ঠাওর করা যায়, ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করতে ১৭ জন রিপাবলিকান সিনেটরের ভোট কিছুতেই মিলবে না। এই দলে এবং তৃণমূল পর্যায়ে ট্রাম্পের প্রভাব এখনো বিপুল। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে নিজেদের রাজনৈতিক বিপদ ঘাড়ে নিতে ৫-৭ জনের বেশি রিপাবলিকান সিনেটর পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প ও ট্রাম্পবিরোধী রাজনীতিই এখন প্রধান। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত চার বছরে ট্রাম্পের হাত ধরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বিভাজনের রাজনীতির ইতি ঘটিয়ে মার্কিন রাজনীতির পুরোনো ধারাকে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে তিনি এগোতে চান। অভিষেক ভাষণ থেকে শুরু করে সব পদক্ষেপেই তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এটি কতটা করতে পারবেন, তার অনেকটাই নির্ভর করছে আদতে রিপাবলিকান দলের ওপর। দলটির ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল ধারা টিকে থাকবে, নাকি রক্ষণশীলতার নামে হালে ট্রাম্পের দেওয়া উগ্রবাদী ধারার ব্যবস্থাপত্রটি টিকে থাকবে তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এই প্রশ্নের মীমাংসার ওপর এমনকি নির্ভর করছে ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’র অস্তিত্বের বিষয়টি। রিপাবলিকান নেতারা স্পষ্টত সংশয়াচ্ছন্ন দশায় রয়েছেন। ট্রাম্পবাদ বলে যা প্রচার হচ্ছে, তাকে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে অনেকের দ্বিধা স্পষ্ট হলেও ট্রাম্প সমর্থকদের আনুগত্য ও নিবেদন তাদের সে অবস্থানে আবার থাকতে দিচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

শুধু অভিশংসন প্রশ্নে রিপাবলিকান সিনেটরদের অবস্থান দিয়েই নয়, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও তাঁর সাবেক প্রেসসচিব সারা স্যান্ডার্সের গভর্নর পদে প্রার্থিতার ঘোষণা এবং সে ঘোষণার পর তাঁর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ রিপাবলিকান নেতৃত্বের সমবেত হওয়াটাও এ ক্ষেত্রে একটি বড় ইঙ্গিত। সঙ্গে যদি অ্যারিজোনা রিপাবলিকান দলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়, তবে এই ইঙ্গিতটি একটি স্থির সিদ্ধান্তের দিকেই এগিয়ে যায়। অ্যারিজোনা রিপাবলিকান দল অঙ্গরাজ্যটির তিন শীর্ষ নেতাকে ট্রাম্প বিরোধিতার কারণে তিরস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই অবস্থা ওরেগন ও পেনসিলভানিয়ার রিপাবলিকান দলের ক্ষেত্রেও সত্য। এসব ঘটনা সবাইকে দলে ট্রাম্পের প্রভাব সম্পর্কে জোর বার্তা দিয়েছে।

আগামী বছরই অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচন। সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব এখনো সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে না চটানোর নীতি নিয়েই চলছে। এ ক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের দেওয়া সেই হুমকিকে বেশি ধর্তব্যে নিচ্ছেন, যেখানে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর বিরোধী শিবিরকে দেখে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে নিজ দলের বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে সিনেটে অভিশংসিত করলে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তাদের মধ্যে রয়েছে। ফলে তাঁরা অভিশংসনের পক্ষে যেমন, তেমনি দলে ট্রাম্পপন্থী ধারার বিপক্ষেও জোর অবস্থান নিতে পারছেন না। মুশকিল হচ্ছে রিপাবলিকান দল যদি দ্রুত এই সংশয়ী অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তবে গোটা দলই ভয়াবহ বিপাকে পড় যেতে পারে। দ্বিদলীয় ধারার মার্কিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি নিশ্চিতভাবেই বড় অশনিসংকেত হয়ে দেখা দেবে। আবার এই একই ব্যবস্থার কারণে এই দলে যদি অতি ডানপন্থী ধারাটি প্রবল হয়ে ওঠে, তবে তা ডেমোক্রেটিক দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে বিদায়ের পরও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃশ্যপটে থেকে যাওয়াটা গোটা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং সেই সূত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বদলের একটি স্থির বিন্দু হয়ে উঠতে পারে। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন ও মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যৎটি আদতে রিপাবলিকান দলের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন