default-image

প্রেসিডেন্ট সংবাদ সম্মেলন করছেন এবং এর সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকেরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মিথ্যাচার ধরিয়ে দিচ্ছেন—এমন দৃশ্য বিরল। ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মাননীয় সম্বোধনে অভ্যস্ত অনেকের কাছে এটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিষয়টি কিন্তু একেবারে নতুন নয়। তবে প্রচণ্ড উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা নিয়ে যখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তুঙ্গে, তখন এ রকম কিছু যে ঘটবে, তা ভাবা কঠিন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বৃহস্পতিবার এমনটি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আবারও প্রমাণিত হলো।

নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক চ্যানেল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোভিড-১৯-বিষয়ক সংবাদ সম্মেলন সরাসরি সম্প্রচার হঠাৎ হঠাৎ বন্ধ করে দিত। তখন তাদের যুক্তি ছিল, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রচারের সুযোগ নিচ্ছেন। এবার অবশ্য আরও একটি পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব গণমাধ্যমকে তাঁর মিত্র এবং অনুগত ভাবতেন, তারাও এবার তাঁর সব কথা হুবহু প্রচার করছে না। এক দশক ধরে ফক্স নিউজ চ্যানেলের নিয়মিত অতিথি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায় প্রতি সপ্তাহেই চ্যানেলটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজে থেকেই ফোন করে কথা বলতেন। কিন্তু বুধবার রাতে ফক্স নিউজও তাঁর ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচন চুরি করার দাবিতে সংশয় প্রকাশ করেছে। অবশ্য বাইডেনের বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হওয়ার মুখে ট্রাম্পের সমর্থক রুপার্ট মারডকের মালিকানাধীন ফক্সের নির্বাহী কর্তারা সাংবাদিকদের বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট না বলার নির্দেশ দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

যে সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোর জোরে ট্রাম্প মূলধারার গণমাধ্যম—সিএনএন, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্টকে ফেক মিডিয়া অভিহিত করে তাঁর অনুসারী এবং অন্য সবাইকে তাঁর টুইটের অপেক্ষায় রাখতেন, সেই টুইটারও তাঁর বক্তব্য আর অবিকৃত প্রচার করছে না। বরং তথ্য সত্য না হলে তাঁর টুইটের নিচে বলে দিচ্ছে, কথাটি ভিত্তিহীন অথবা বিভ্রান্তিকর। বুধবার রাতেই টুইটার তাঁর ১৬টি টুইটের মধ্যে ৭টিতে এ ধরনের ব্যাখ্যা বা সাবধানবাণী জুড়ে দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যরাও একই নীতি অনুসরণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো এ ধরনের সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারছে? বিশেষ করে মূলধারার প্রধান মাধ্যমগুলো? নাকি এসব মাধ্যমের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে ষড়যন্ত্র করার যে অভিযোগ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করে থাকেন এবং তাঁর অনুসারীদের অনেকে বিশ্বাস করেন, সে রকম কিছু ঘটছে? ভোটের ফল প্রকাশের বিরক্তিকর ধীরগতি এবং বিভিন্ন মাধ্যমের হিসাবের গরমিল এ ধরনের প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে আসছে, যা সন্দেহ-সংশয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রগুলো যে এভাবে নিঃসংকোচে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে চিহ্নিত করে তা তুলে ধরতে পারছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে বলতে পারছে যে আমরা আপনার মিথ্যাচার প্রচার করতে পারি না, সেটা সম্ভব হচ্ছে তার প্রধান কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কোনো কর্তৃপক্ষ কেড়ে নিতে পারে না। প্রেসিডেন্ট যত ক্ষমতাধরই হোন না কেন, তাঁর কথা প্রচারে কাউকে বাধ্য করতে পারেন না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে দায়িত্বশীল পেশাদারত্ব। এবারের নির্বাচনের লড়াইটি যে হাড্ডাহাড্ডি হবে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জয়ী না হলে যে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবেন, তা এদের মোটামুটি জানাই ছিল। সুতরাং, তারা আগে থেকেই এ জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তা ছাড়া ২০০০ সালের অভিজ্ঞতা এরা কেউ ভোলেনি। নেটওয়ার্কগুলো আল গোরকে বিজয়ী ঘোষণা করার ঘণ্টাখানেক পর তাদেরকে তা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। সুতরাং, এবার তারা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে।

১২ অক্টোবর রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি টিভি নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহীরা তাদের জানিয়েছেন, তাঁরা এবার সংযমী হবেন, দ্রুততার সঙ্গে বিজয়ী ঘোষণা করবেন না। তাঁদের কথা হচ্ছে ধীরে চলা, কিন্তু নিশ্চিত হয়ে তথ্য দেওয়া। যা জানা যায়নি, সে সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকবে দর্শকদের আশ্বস্ত করায় যে ফল ঘোষণায় ধীর গতির মানেই সংকট নয়। এনবিসি নিউজের প্রেসিডেন্ট নোয়া অপেনহেইমের ভাষায়, সম্ভাব্য জয়ী ঘোষণা বা কোনো ভাষ্য নয়, বরং শুধু তথ্যই হবে মনোযোগের বিষয়। এবিসি নিউজের প্রেসিডেন্ট জেমস গোল্ডস্টোনের কথায়, সম্ভাব্য বিজয়ী ঘোষণা বা প্রজেকশন হবে এমন স্বচ্ছতার সঙ্গে, যেন দর্শকদের কাছে তা স্পষ্ট হয়।

এত প্রস্তুতির পরও কেন তাহলে ফল প্রকাশে ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে? এর মূল কারণ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয় না। কোনো জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। প্রতিটি রাজ্য নিজেদের মতো তার নির্বাচন পরিচালনা করে। ভোট দেওয়ার পদ্ধতি, গণনা, পুনর্গণনা, ফল প্রকাশ ও বিরোধ নিষ্পত্তির আইন আলাদা। ফলে সব জায়গায় একই সঙ্গে সব ভোটের গণনা শুরু এবং শেষ হয় না। সিবিসি জানিয়েছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে সব গণনার ফল চূড়ান্ত হতে ডিসেম্বর হয়ে গিয়েছিল। তবে হিলারি দ্রুতই পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন। ফলে কোনো অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়নি। এবারে মহামারির কারণে ডাকযোগে অথবা বিভিন্ন জায়গায় রাখা বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংবাদমাধ্যমগুলো ২০১৮ সালের আগে পর্যন্ত ন্যাশনাল ইলেকশন পুল কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বিভিন্ন কেন্দ্র এবং রাজ্য পর্যায়ের ভোটের ফল সংকলন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কে বিজয়ী হচ্ছেন, তা বলত। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রধান সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং ফক্স নিউজ নতুন এক সমঝোতায় পৌঁছে আলাদাভাবে এই কাজ করতে শুরু করে। তারা বুথফেরত ভোটারের সাক্ষাৎকার ও টেলিফোন জরিপের প্রথাগত পথ বাদ দিয়ে আসল ভোট গণনার তাৎক্ষণিক অঙ্ক কষে হিসাব করার পন্থা অনুসরণ করে। সিএনএনসহ অন্য তিনটি জাতীয় নেটওয়ার্ক আগের কনসোর্টিয়ামেই পুরোনো পদ্ধতি এখনো অনুসরণ করে চলেছে। এবারে ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে সিএনএনসহ অধিকাংশই যে হিসাব দেখাচ্ছে, তা এপি ও ফক্সের চেয়ে কম। এর কারণ হচ্ছে অ্যারিজোনা রাজ্যের ফল।

অ্যারিজোনা রাজ্যের সম্ভাব্য বিজয়ী ঘোষণার নাটকীয়তা এবারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তাঁর পরিবার ও ভক্তদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। ট্রাম্পের আইনজীবী রুডি জুলিয়ানি এবং তাঁর ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র যখন সংবাদ সম্মেলন করে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ভোট চুরি ও জালিয়াতির অভিযোগ করছিলেন, তখন ফক্স নিউজ সেই সম্প্রচার বন্ধ করে অ্যারিজোনার সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে জো বাইডেনের কথা ঘোষণা করে। এরপর থেকে ট্রাম্প এবং তাঁর অনুসারীরা ফক্স নিউজের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ ও সমালোচনা শুরু করেন।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে টুইটার, ফেসবুক ও ইউটিউবের ভূমিকাতেও এবার নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। গত নির্বাচনে বিদেশিদের, বিশেষ করে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ঘটেছিল এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই। তাই এবারের নির্বাচনে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি বন্ধে তারা বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। এ জন্য অবশ্য একটি নতুন আইনও হয়েছে। ফলে যে টুইটার ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান বার্তাবাহী, তা এখন তাঁর ক্রোধের লক্ষ্য হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোররাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি লিখেছেন, টুইটার এখন নিয়ন্ত্রণহীন।

মন্তব্য পড়ুন 0