default-image

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর লেখা সবচেয়ে আলোচিত বইয়ের লেখক মাইকেল উলফ তাঁর ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ বইয়ে লিখেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার খবরে মেলানিয়া ট্রাম্প কেঁদেছিলেন; তবে তা আনন্দাশ্রু ছিল না। তাঁর এই ভাষ্য হোয়াইট হাউসের ভেতরের খবর জানেন, এমন অনেকেই সমর্থন করেছেন। এ কথাকে সত্য ধরে নিলে প্রশ্ন ওঠে, এবার ট্রাম্পের পরাজয়ের খবরে মেলানিয়া তবে কী করছেন?

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত শনিবার সকালে মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের প্রাথমিক ঘোষণা আসার পর গলফ কোর্সে থাকা প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা সবার আগে থেকেই জানা ছিল। এমনকি ক্ষমতার স্বাদ দ্রুত ত্যাগের এই বার্তাকে ইভানকা ট্রাম্প, জ্যারেড কুশনার বা ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র কীভাবে নেবেন, তাও অনুমিতই ছিল। কিন্তু ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ছিল সংশয়। ফলে সবচেয়ে কৌতূহলী চোখটি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বা তাঁর ক্ষমতাধর পুত্র-কন্যা বা মেয়ে-জামাতা নয়, খোঁজার কথা মেলানিয়াকেই।

আগেই বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের প্রাথমিক খবর আসার পর মেলানিয়া কেঁদেছিলেন। সেই কান্না খুশির কান্না নয়। তবে কি তিনি হতাশ হয়েছিলেন? স্লোভেনিয়ায় জন্ম নেওয়া এ সাবেক মডেলের গত চার বছরের আচরণে অন্তত তেমনই মনে হয়েছে। ফার্স্ট লেডির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি উদাসীনভাবে। এ নিয়ে যত আলোচনা-সমালোচনাই হোক, তাঁর এই ঔদাসীন্যে কোনো ছেদ পড়েনি। ফলে ৫০ বছর বয়সী এই ফার্স্ট লেডি এবার ট্রাম্পের পরাজয়ে যদি কাঁদেনও, তা নিষ্কৃতির কান্না হবে বলেই মনে করছেন অনেকে।

বিজ্ঞাপন
default-image

হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্মকর্তা ওমারোসা ম্যানিগল্ড নিউম্যানের মতো অনেকে আবার আরেক ধাপ এগিয়ে বলছেন, প্রেসিডেন্সি হারানোর পর মেলানিয়া এমনকি ট্রাম্পকে ডিভোর্স দেওয়ার কথাও ভাবতে পারেন। এ বিষয়ে নিউম্যান দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘তাঁর (প্রেসিডেন্টের) মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন মেলানিয়া, যাতে তিনি তাঁকে ডিভোর্স দিতে পারেন। ট্রাম্প অফিসে থাকতে যদি মেলানিয়া এ কাজ করেন, তবে তিনি প্রতিশোধ নিতে মেলানিয়াকে শাস্তি দেওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করবেন।’

ইনডিপেনডেন্ট জানায়, নিউম্যান মেলানিয়ার একান্ত অনুভূতি জানার মতো এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর কাছে ট্রাম্প জমানার হোয়াইট হাউস নিয়ে অনেক বিস্ফোরক তথ্য রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় বছরেই তিনি বরখাস্ত হয়েছিলেন। সে সময়ের নিজের স্মৃতিকথা ও সিচুয়েশন রুমের আলাপচারিতার অডিও রেকর্ড তিনি খুব শিগগিরই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প সম্পর্কে খুব কম লোকই জানেন। তিনি সব সময় নিজেকে নিয়েই থাকতেন। ফলে গুটিকয় বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া তাঁর অমূল্য হাসির পেছনে কী লুকিয়ে আছে, তা কেউ জানে না। এমনকি কেউ আদৌ জানে কিনা, তাও এক বড় প্রশ্ন। তিনি এতটাই নিভৃতচারী যে, তাঁকে নিয়ে চাউর হওয়া নানা গুজব থেকে সত্যকে আলাদা করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হয়েছে বিভিন্ন ওয়েবসাইটকে। এমন কথাও প্রচলিত আছে, সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন মেলানিয়া ট্রাম্প নন, তাঁর মতো দেখতে আরেকজন।

default-image

ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের খবরের পরও এই মেলানিয়ার নিজেকে নিয়ে থাকায় কোনো বদল আসেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন গত শনিবার জানিয়েছিল, মেলানিয়া ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আগের মতোই আছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর পরিবারের সদস্য ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৌশলগত কোনো আলোচনায় তিনি অংশ নিচ্ছেন না, উপস্থিতও নেই। অবশ্য পরদিন রোববার তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে টুইট করেন। এতে লেখা ছিল, ‘মার্কিনদের ন্যায্য নির্বাচন প্রাপ্য। অবৈধ নয়, প্রতিটি বৈধ ভোট গণনা করা উচিত। পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতার সঙ্গে আমাদের গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে হবে।’

ইনডিপেনডেন্ট বলছে, মেলানিয়া ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা কেউ জানে না। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি তাঁর ১৪ বছর বয়সী সন্তান ব্যারনের ভবিষ্যৎ ও আর্থিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচার ও ক্ষমতা গ্রহণের শুরুর দিকে মেলানিয়ার অনুরাগী ছিলেন। ট্রাম্পের চেয়ে বয়সে ২৫ বছরের ছোট মেলানিয়া হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে আসা অন্যতম সুন্দরী ফার্স্ট লেডি। কিন্তু ফার্স্ট লেডি হিসেবে ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটানো শুরুর পর দ্রুতই এই ভাবমূর্তিতে চির ধরে। বিশেষত যখন তিনি স্লোভানিয়ায় নিজের জন্মশহরের খুশিতে উদ্বেল মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করেন, তখন তাঁর ফার্স্ট লেডি হিসেবে ভাবমূর্তি ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দুই জীবনসঙ্গীর মতোই মেলানিয়াও ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করেছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ইভানা ট্রাম্প ছিলে ১৯৭৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। তাঁদের মধ্যে মোট চারবার চুক্তি হয়েছিল। সন্তানদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা চুক্তি নবায়ন করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন
বর্তমান ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে আছেন। একমাত্র ইভানা ট্রাম্পই এত দীর্ঘ সময় সম্পর্ক রেখেছিলেন। অন্য দুজনের চেয়ে ট্রাম্পের ব্যবসা সম্প্রসারণে মেলানিয়ার অবদান সবচেয়ে কম

শেষ চুক্তিটি থেকে ইভানা ট্রাম্প যখন বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন তা ট্যাবলয়েড ম্যাগাজিনগুলোর খবরের রসদ জুগিয়েছিল। বিচ্ছেদের সময় তাঁকে আড়াই কোটি ডলার দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে তিন সন্তান ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, ইভানকা ট্রাম্প ও এরিক ট্রাম্পের লালন-পালন বাবদ বছরে ৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার করে দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল।

এর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প একইভাবে চুক্তিতে বিয়ে করেন মার্লা ম্যাপলসকে। সে সম্পর্ক টিকেছিল ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। তাঁদের বিচ্ছেদ নিয়ে নানা গল্প-গাথা সে সময় প্রকাশ্যে এসেছিল। এটা এতটাই আলোচনার জন্ম দিয়েছিল যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষে তথ্য গোপন রাখতে একটি চুক্তি করেন। তাঁদের বিচ্ছেদ নিয়ে হওয়া আইনি লড়াইয়ে মার্লা ম্যাপলস শেষ পর্যন্ত তাঁর পাওনার পরিমাণ ১০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ ডলার করে নেন।

বর্তমান ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে আছেন। একমাত্র ইভানা ট্রাম্পই এত দীর্ঘ সময় সম্পর্ক রেখেছিলেন। অন্য দুজনের চেয়ে ট্রাম্পের ব্যবসা সম্প্রসারণে মেলানিয়ার অবদান সবচেয়ে কম। ইনডিপেনডেন্ট জানায়, ইভানা ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ট্রাম্পের করপোরেট দুনিয়ার নানা কাজের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে যুক্ত ছিলেন। মেলানিয়া ট্রাম্প এই ব্যবসা নিয়ে কখনোই আগ্রহ দেখাননি। অবশ্য তিনি ট্রাম্পের ব্র্যান্ডকে অনেক এগিয়ে দিয়েছেন।

মেলানিয়ার পুরোনো বন্ধু স্টেফানি ওকোফ ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরের ১০ সপ্তাহ মেলানিয়া নিউইয়র্কে ছিলেন শুধু তাঁদের চুক্তিটি নবায়নের জন্য। সেই চুক্তিতে পারিবারিক সম্পদে সন্তান ব্যারনের সমানাধিকারের বিষয়টি যুক্ত করেন মেলানিয়া। বিনিময়ে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প যত দিন থাকবেন, তত দিন মেলানিয়া তাঁর সঙ্গে থাকবেন।

হোয়াইট হাউসের আবাসিক অংশে চারতলায় মেলানিয়া থাকতেন, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মা থাকতেন এক সময়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকতেন দোতলার মাস্টার বেডরুমে। চার বছর এভাবেই গেছে। ফলে হোয়াইট হাউসের পাট চুকালে যখন আর চুক্তি বলে কিছু থাকবে না, তখন মেলানিয়া কী করবেন, তা এক বড় প্রশ্ন

ফার্স্ট লেডি হিসেবে মেলানিয়ার নির্লিপ্ততার কারণ মূলত এখানেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো আচরণেই তিনি বিস্মিত হন না। ওকোফের ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আচরণে বা কথায় যখন সবাই হতবাক হয়, তখনো মেলানিয়ার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে—‘আমি জানি, আমি কাকে বিয়ে করেছি।’

হ্যাঁ, হোয়াইট হাউসে থাকার এই পুরো সময়ে ট্রাম্প স্ত্রী মেলানিয়ার একা থাকতে চাওয়া, নিজের পছন্দ অনুযায়ী চলা—এ সবকিছুকেই সম্মান করেছেন। মেলানিয়ার ঘনিষ্ঠ একজনের বরাত দিয়ে ইনডিপেনডেন্ট জানায়, তিনি সম্ভবত ট্রাম্পকে পছন্দও করেন। কিন্তু তিনি ট্রাম্পের মতোই হিসেবি ও সুযোগসন্ধানী। ইভানকা ট্রাম্প যখন যাবতীয় মনোযোগ কেড়ে নিতে শুরু করেন, তখন তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয় ‘অপারেশন ব্লক ইভানকা’।

সিএনএন জানিয়েছিল, হোয়াইট হাউসের আবাসিক অংশে চারতলায় মেলানিয়া থাকতেন, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মা থাকতেন এক সময়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকতেন দোতলার মাস্টার বেডরুমে। চার বছর এভাবেই গেছে। ফলে হোয়াইট হাউসের পাট চুকালে যখন আর চুক্তি বলে কিছু থাকবে না, তখন মেলানিয়া কী করবেন, তা এক বড় প্রশ্ন।

সম্প্রতি এমন ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মেক্সিকোর সাবেক প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিটো ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতেই তাঁর অভিনেত্রী বউ বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটে কিনা, তা দেখতে অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই।

মন্তব্য পড়ুন 0