default-image

করোনা মহামারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী বাংলাদেশিরা নানা সংকটে আছেন। বিশেষ করে কাজকর্ম হারিয়ে শোচনীয় অবস্থা অনেক অভিবাসী পরিবারের। বেশির ভাগ বাংলাদেশি মার্কিন অদক্ষ বা আধা দক্ষ কাজ করে থাকেন। গত মার্চ মাসে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে বেশির ভাগই বেকার হয়ে পড়েন।

বাংলাদেশি মার্কিনদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে আয় করে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি দেশে থাকা স্বজনদের জন্য অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। দেশের লাখ লাখ পরিবার এমন প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন সরকার বেকার ভাতা,

খাদ্য সহায়তা (ফুড স্ট্যাম্প) দিয়ে সহযোগিতা করলেও এর পরিমাণ খুবই অপ্রতুল। প্রবাসের ব্যয়বহুল জীবনযাপন সামলানো অনেক বাংলাদেশি মার্কিনের পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়ে অভিবাসীদের কাঙ্ক্ষিত ডেমোক্র্যাট সরকার ক্ষমতায় এলেও সবকিছুতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে সময় লাগবে। এরই মধ্যে আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়াসহ জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। ফলে বাড়ি ভাড়ার চাপ সামলাতে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী নিউইয়র্কের বাইরে যেতে শুরু করেছেন।

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্কের বাইরে নানা কারণে বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রথম পছন্দ মিশিগান। বিশ্বের মোটর গাড়ির রাজধানী খ্যাত মিশিগানে যেমন রয়েছে সব শ্রেণিপেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা, তেমনি রয়েছে নিউইয়র্ক নগরের চেয়ে কম ব্যয়ে আবাসন ব্যবস্থা। এ রাজ্যে সামাজিক সব অনুশাসন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভেতরে দিয়ে নিজের সন্তান–সন্ততিকে লালন–পালনেরও রয়েছে নানা সুযোগ।

কোনো সঠিক হিসাব না থাকলেও কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখন গড়ে প্রতিদিন নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ৪ /৫টি পরিবার মিশিগানে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। তাদের এই স্থানান্তের মূলে কাজ করছে আবাসনের খড়্গ। ২ বেডরুমের সংকীর্ণ বাসাও স্থান ভেদে নিউইয়র্কে যেখানে দুই থেকে আড়াই হাজার ডলার মাসে ভাড়া গুনতে হয়, সেখানে মিশিগানে অনেক কম। তবে কয়েক বছর ধরে স্রোতের মতো মানুষ মিশিগানে স্থানান্তরিত হওয়ায় সেখানেও অবস্থা বেশ বদলে গেছে।

এখন মিশিগানের বাংলাদেশি অধ্যুষিত ডেট্রয়েট ও ছোট শহর হ্যামট্রামিকে বাসা ভাড়া পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দুই শহরে আগে সাশ্রয়ী মূল্যে বাসা ভাড়া পাওয়া যেত। এখন ওই এলাকায় বাসা পাওয়া না গেলেও ওয়ারেন, স্টার্লিং হাইটস এলাকা এলাকায় কম দামে বাসা পাওয়া যায়। এসব বাসার ভাড়া একটু বেশি হলেও নিউইয়র্ক নগরের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া এসব বাসা সুপরিসর। যাদের আর্থিক অবস্থা একটু ভালো, তাঁরা নিজেরা বাড়ি কিনেই স্থানান্তর হচ্ছেন।

মিশিগানে প্রচুর কলকারখানা থাকায় কাজের সুযোগ নিউইয়র্কের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তা ছাড়া অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য সহজেই রয়েছে কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা। ভালো ইংরেজি না জানলেও কলকারখানায় কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না। ধীরে ধীরে কাজ ও ভাষা শিক্ষা—দুটিরও সুবিধা রয়েছে। এখানে বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন ক্রমশ বাড়ছে।

প্রচুর বাংলাদেশি গ্রোসারির পাশাপাশি রয়েছে অনেক মসজিদ মাদ্রাসা ও কমিউনিটি কেন্দ্রিক নানা সুবিধা। নিউইয়র্কে যেখানে পরিবারের কয়েক সদস্য কাজ করেও সংসারে টানাপোড়েন লেগে থাকে, সেখানে মিশিগানে পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ করলে অল্প দিনেই বাড়ির মালিক হওয়া যায়।

নিউইয়র্কে প্রতিদিনই এখন মুবিং ট্রাকের আনাগোনা দেখা যায়। দেখা যায় বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট ভবন থেকে মানুষজনের স্থানান্তরের দৃশ্য। অনেকেই না জানিয়ে জীবনের নোঙর এখন খুঁজছেন মিশিগানে। যারা মিশিগানের মতো দূরের রাজ্যে যাচ্ছেন না, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ পাড়ি দিচ্ছেন নিউইয়র্কের প্রান্তিক নগরী বাফেলোতে। গাড়িতে নিউইয়র্ক থেকে ঘণ্টা তিনেকের দূরত্বে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া নগরও এখন বাংলাদেশি প্রবাসীদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে। একসময় প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে ওঠা বাফেলো বা ফিলাডেলফিয়া নগর আবার জেগে উঠছে। অন্যান্য অভিবাসীর মতো বাংলাদেশি পরিবারগুলোরও ব্যাপক স্থানান্তর ঘটছে এসব নগরীতে।

অনেকেই বলছেন, কোভিড–১৯–এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শুধু চার লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুই নয়, নগরগুলোর জনারণ্যও পাল্টে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এ পাল্টে যাওয়ার প্রভাব ভবিষ্যতে পড়বে বলে ধারণা করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন