যুক্তরাষ্ট্র

ওপেকের ৬০ বছর

মার্কিন স্বার্থে কাজ করছে সৌদি আরব

বিজ্ঞাপন
default-image

জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক জন্ম নিয়েছিল ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এই ৬০ বছরে সংগঠনটির কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সত্তরের দশকে যে সংগঠন মার্কিন প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছিল, সে আজ যুক্তরাষ্ট্রের বড় মিত্রে পরিণত হয়েছে।

১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিলে ওপেক ওয়াশিংটনকে শিক্ষা দিতে আরোপ করেছিল বিখ্যাত জ্বালানি তেল নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সে সময়ের ওপেকভুক্ত ১২টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এতে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম চারগুণ বেড়ে যায়। ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ে মার্কিন অর্থনীতি। ওপেকের সেই নিষেধাজ্ঞায় যুক্ত ছিল সৌদি আরবও। অথচ ৬০ বছরের ব্যবধানে সৌদি আরবসহ ওপেকের নেতৃস্থানীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষিত মিত্র হিসেবে স্বীকৃত।

এই ৬০ বছরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এত বাঁকবদল হয়েছে যে, এখন এটিকেই অনেক বেশি স্বাভাবিক মনে হয়। সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জ্বালানি তেল উৎপাদনের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। ফলে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর ওপর তাকে আর আগের মতো নির্ভর করতে হয় না।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সৌদি আরবের অতিমাত্রায় মার্কিন নির্ভরশীলতা ওপেকের আন্তর্জাতিক শক্তি কমার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। আর ওয়াশিংটনের দিকে রিয়াদের অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ার অন্যতম কারণ ইরান। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে মোকাবিলা করতে গিয়েই রিয়াদ মার্কিন বৃত্তে ধরা দিয়েছে। ওপেকের অন্যতম দুই নেতৃস্থানীয় দেশ ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ওয়াশিংটন তার চেনা অস্ত্রটিই প্রয়োগ করেছে। আর তা হলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।

২০০০ সালের পর থেকেই ওপেক ধীরে ধীরে মার্কিন চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে শুরু করে। ওপেকের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, জ্বালানি তেলের দাম কম রাখার বিষয়ে মার্কিন চাপ কয়েক দশক ধরে বেশ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছে সংস্থাটি। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হলে এই শক্তিমত্তায় বড় ধরনের চিড় দৃশ্যমান হয়। যদিও তার অন্তত তিন বছর আগে থেকেই ওপেক মূলত আত্মসমর্পণের নীতিতে চলেছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ব্রিটিশ ও মার্কিন সাতটি জ্বালানি তেল কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে ১৯৬০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাগদাদে জন্ম হয়েছিল ওপেকের। কিন্তু সেই প্রতিরোধ নীতি এখন দূর অতীত। মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় বছরের পর বছর ধরে থাকা ইরান ও ভেনেজুয়েলার প্রভাব কমার মধ্য দিয়েই এ অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ওপেক। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ইরানের ওপর থেকে ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার যে চুক্তিটি হয়েছিল, তা কিছুটা আশা দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার পর থেকেই সে আশা দূরে হটতে শুরু করে। ২০১৮ সালে ছয় জাতি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এর সমাধিও হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন ভোক্তাদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে বরাবরই জ্বালানি তেলের দাম কম রাখার জন্য ওপেককে চাপ দিয়ে আসছেন। তাঁর সে চাপ স্বীকার করে ওপেকও সরবরাহ বাড়িয়েছে। কিন্তু চলতি বছর যখন দাম অনেক কমে যায়, তখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর পক্ষেও ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ওয়াশিংটন সামরিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিলে রিয়াদ আবার উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াতে জোর ভূমিকা নেয়।

ওপেকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০১ ও ২০০৮ সালে দায়িত্ব পালন করেছেন চাকিব খেলিল। আলজেরিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী হিসেবে এক দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক এ প্রসঙ্গে রয়টার্সকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম কেমন হলে সুবিধা হয়, সে বিষয়ে ট্রাম্প সৌদি আরবকে নির্দেশ দেন। আর সৌদি আরবও সেই নির্দেশ পালন করে। আদতে ওপেক বদলে গেছে।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image
২০১০ সালেও ওপেকের মোট উৎপাদনের ১৫ শতাংশই আসত ইরান থেকে। এটি এখন সাড়ে ৭ শতাংশে এসে নেমেছে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ থেকে নেমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের উৎপাদন ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ইরানকে প্রতিহত করতে সৌদি আরব বরাবরই ওয়াশিংটনের মুখাপেক্ষী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এই সুযোগটিই নিয়েছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ইরাকসহ জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক কয়েকটি দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওপেকে সৌদি আরব নিজের কর্তৃত্ব একচেটিয়া করে নিয়েছে।

ওপেকের তথ্য বলছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মোট মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশ এখনো ওপেকভুক্ত দেশগুলোর। ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভেনেজুয়েলা (২৫ দশমিক ৫ শতাংশ)। এরপরই সৌদি আরবের (২২ দশমিক ৪ শতাংশ) স্থান। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে যথাক্রমে ইরান (১৩ দশমিক ১ শতাংশ) ও ইরাক (১২ দশমিক ২ শতাংশ)। অথচ এই শীর্ষ চার দেশের তিনটিই হয় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত যুদ্ধে পর্যুদস্ত। এই সুযোগে কর্তা বনে গেছে সৌদি আরব।

২০১০ সালেও ওপেকের মোট উৎপাদনের ১৫ শতাংশই আসত ইরান থেকে। এটি এখন সাড়ে ৭ শতাংশে এসে নেমেছে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ থেকে নেমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের উৎপাদন ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৬০ সালে যে পাঁচ দেশ ওপেক প্রতিষ্ঠা করেছিল তার মধ্যে সৌদি আরব ও কুয়েত—এ দুটি দেশ নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলার অবস্থা আগেই বলা হয়েছে। বাকি থাকল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক। ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে যে ওপেকের জন্ম হয়েছিল, সেই নীতি এখন আর খাটছে না। এই একই সময়ে আবার যুক্তরাষ্ট্রও নিজের উৎপাদন বাড়িয়ে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে গত দশ বছরে যুক্তরাষ্ট্র নিজের অংশ দ্বিগুণ করে নিয়েছে। আর ওপেক হারিয়েছে নিজের অবস্থান।

অন্য দেশগুলোর চাপে ২০১৬ সালে ওপেক রাশিয়াসহ আরও নয়টি দেশকে সঙ্গে নিয়ে ওপেক প্লাস গঠন করে। উদ্দেশ্য ছিল, জোট হিসেবে জ্বালানি তেলের বাজারে নিজেদের প্রভাব বিস্তার। কিন্তু এই একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ায়। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের উৎপাদন ছিল দৈনিক গড়ে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল। এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের সঙ্গে ঠিক আঁটিয়ে উঠতে পারেনি ওপেক প্লাস।

এই পেরে না ওঠার পেছনেও রয়েছে সৌদি আরব। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওপেকের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সৌদি আরবের অঘোষিত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রিয়াদের সামরিক নির্ভরতা ও ইরান-জুজুকে কাজে লাগান। কাতারের সঙ্গে বাকি উপসাগরীয় দেশগুলোর দ্বন্দ্বের জেরে সেখানে অত্যাধুনিক অস্ত্রের চাহিদা ব্যাপক হওয়ায় ট্রাম্পের পক্ষে কাজটি করা অনেক সহজ হয়েছে। পেছন দরজা দিয়ে সহায়তা সীমিতকরণের ভয় দেখানো, আর প্রকাশ্যে চাহিদাপত্রটি তুলে ধরার কাজটি তিনি নিপুনভাবে করে গেছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুবছর আগে ২০১৮ সালে ওপেক সম্মেলন হয়েছিল ২২ জুন। তার আগে আগে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারে উঠেছিল। বিষয়টি মার্কিন ভোক্তাদের জন্য চাপের হয়ে যাচ্ছিল। ওই বছরের ১৩ জুন ট্রাম্প টুইট করেন—‘জ্বালানি তেলের দাম অতিরিক্ত বেশি। ওপেক এর পেছনে আছে। ঠিক না।’ এখানেই চুপ থাকেননি তিনি। ওপেক সম্মেলনের দিন টুইটে লিখলেন, ‘আশা করি ওপেক উৎপাদন বাড়াবে। দাম কমানো জরুরি।’

এই টুইটের ফলও মিলল দ্রুত। সম্মেলনের পরদিনই জানা গেল, দিনে ১০ লাখ ব্যারেল বেশি উৎপাদনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে ওপেকভুক্ত দেশগুলো। অথচ ২০১৮ সালে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারের এই ওলটপালটটি কিন্তু হয়েছিল ওয়াশিংটনের কারণেই। ওপেকের দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দিনে ৩০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন কমে যায়। এরই ধাক্কা লাগে দামে। অথচ ওয়াশিংটনের কারণে সৃষ্ট সেই সংকট এমনভাবে ওপেক মোকাবিলা করল, যাতে ওয়াশিংটনেরই সুবিধা হয়। ভুলে গেল নিজের প্রতিষ্ঠাকালীন মূলনীতি ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে রয়েছে—সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, ভেনেজুয়েলা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, অ্যাঙ্গোলা, আলজেরিয়া, গিনি ও গ্যাবন। এসব দেশের একেকটি অর্থনীতি একেক রকম। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা বিবেচনায় মিল থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যাসহ নানা অমিল রয়েছে। এই মিল–অমিল বিবেচনায় নিয়ে সার্বিকভাবে একটি জ্বালানি নীতি অনুসরণ করাই ছিল ওপেকের প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য, যা এখনো সংস্থাটির ওয়েবসাইটে গেলে পাওয়া যাবে।

ওপেকের ওয়েবসাইটে মূলনীতি হিসেবে জ্বালানি তেলের বাজারে ভারসাম্য আনার পাশাপাশি সবার স্বার্থ রক্ষা এবং বিশেষ করে ভোক্তা স্বার্থকে বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ না থাকলেও আগেই বলা হয়েছে, ব্রিটিশ ও মার্কিন সাত জ্বালানি তেল কোম্পানির একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে একটি অস্ত্র হিসেবে জন্ম হয়েছিল এ জোটের। কিন্তু নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং সৌদি আরব ও এর অনুসারী দেশগুলোর অপরিণামদর্শিতার জেরে সেই ভারসাম্যের নীতি থেকেই সরে গেছে জোটটি। মিত্রের মুখোশে তারা এখন ওয়াশিংটনের হাতের পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ ওপেকের মূলনীতিতে স্থির থাকাটা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বহু সমীকরণের জন্যই জরুরি। তার কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় সবকিছুই মার্কিন একচেটিয়া বলয়ের মধ্যে ঢুকে বসে আছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন