মানুষ নিজেই নিজের বড় আশ্রয়

বিজ্ঞাপন

আমরা কষ্ট পেলে আশ্রয় খুঁজি। এমন একজনকে খুঁজি, যার সঙ্গে কষ্টগুলো অনায়াসে ভগ করা যায়। এই আশ্রয়ের জায়গাটা সবাই পায় না। সবার থাকে না। কেউ আশ্রয় না পেয়ে তার কষ্টগুলো মনে চেপে রাখে, কেউ নষ্ট হয়; অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
আসলে প্রতিটা মানুষের একটা আশ্রয় দরকার। কেউ ঘরের মানুষের কাছে আশ্রয় চায়। কেউ বাইরের কারও কাছে আশ্রয় খোঁজে একটু ভালো থাকার জন্য। আবার এমনও হয় যে, আশ্রয় পায় ঠিকই, কিন্তু একসময় যে আশ্রয় দেয় সেই আশ্রয়দাতাই একদিন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। মানুষের জীবন বিচিত্র। এই জীবনে সবচেয়ে ভালো আশ্রয়দাতা হলো নিজে। মানুষ নিজেই আসলে তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
কষ্ট পেলে মানুষের মধ্যেই মানুষ শুধু আশ্রয় খোঁজে তাও নয়। কাজের মধ্যেও অনেকে আশ্রয় খোঁজে। যখন একা লাগে খুব একা, মনে হয় চারপাশে কেউ নেই, তখন অনেকে ডুবে যেতে চায় কাজে। নিজেকে ব্যস্ত রাখে। তখন তার কাছে সেই কাজটাই আশ্রয় হয়ে ওঠে।
যারা প্রবাসে থাকে। প্রতি মুহূর্তে তারা এ বিষয়টা উপলব্ধি করে। বিশেষ করে যারা পরিবার ছাড়া একাকী জীবনযাপন করে, সুখে, দুঃখে নিজেই নিজেকে দেখে বলা চলে। অসুস্থ হলেও সে নিজের সাধ্যমতো নিজেকে দেখে রাখে। যাদের কেউ নেই, শুধু তারাই একা—এও ঠিক নয়। অনেকে পরিবারের সঙ্গে থাকে ঠিক; কিন্তু সেই থাকাটা হয় সমাজে নিজেকে দেখানোর জন্য। আসলে সে ভেতরে-ভেতরে খুব নিঃসঙ্গ থাকে। এই নিঃসঙ্গতাকে আশ্রয় করে সে পথ চলে। বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় থাকে না।
মানুষের জীবন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যায়, অনেকটা জোয়ার-ভাটার মতো। ঢেউ আসে, আবার তা মিলিয়ে যায়। অনেকে এই ঘাতপ্রতিঘাতের ঢেউয়ের মধ্যে তলিয়ে যায়। আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। মনোবল ভেঙে পড়ে, তখন সে আশ্রয় খোঁজে। জীবনে কষ্ট ধারণ করার ক্ষমতা সবার এক না। কেউ কষ্টের পাথর বুকে চাপা দিয়ে জীবন পার করে দিতে পারে। এই যে কষ্ট বুকে লালন করে সবার কাছ থেকে আড়াল করা—এটাই তার কাছে তার আশ্রয়। নিজেকে নিজে আশ্রয় দেওয়া।
এমন অনেক মানুষ আছে, যে অন্যকে প্রচণ্ড রকম উদ্বুদ্ধ করতে পারে। অন্যরা তার কাছে আসে একটু সাহস নিতে। অথচ দেখা যায় সেই মানুষটিই ভেতরে-ভেতরে একা। এই যে একাকিত্বের সঙ্গে তার বসবাস, এতেই সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সে নিজেই নিজেকে এর মধ্যে বন্দী করে ফেলে। নিজের একটা ভুবন সে তৈরি করে নেয়, যা তার একান্ত আশ্রয়।
জীবনে চলার পথে আমরা অন্যের ওপর নির্ভর করি, বিশ্বাস করি নিজের থেকে বেশি অন্যকে, মনে হয় সে আমার পৃথিবী। হঠাৎ দেখা যায়, যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি সে আসলে ঠকিয়েছে। সেটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা হয় এ ক্ষেত্রে তা হলো অন্য কাউকে আর বিশ্বাস করা যায় না। ধাক্কাটা এসে লাগে বিশ্বাসের ওপর। মনে হয় আবার যদি এমন হয়। এই যে দোদুল্যমান মানসিক অবস্থা, এই অবস্থায় জীবন থমকে দাঁড়ায়। ডুবন্ত গোধূলির মতো যেন জীবন আস্তে আস্তে ডুবতে থাকে। আলোটা মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার হাতছানি দেয়। তখন নিজে নিজেকে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
আমরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষদের সফলতা দেখি, বাহবা দিই। কিন্তু অনেকে আছে তার জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে গিয়ে এত বেশি ত্যাগ করে, এত বেশি কষ্ট করে যে তখন তার এই প্রতিষ্ঠা তার নিজের কাছে তুচ্ছ মনে হয়। প্রতিষ্ঠা পাওয়া মানুষটাও একসময় অনেকের ভিড়ে একা হয়ে যায়। কিন্তু সেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। খোলসের আবরণে শামুকের মতো গুটিয়ে রাখে সে নিজেকে। একবার যে একা চলতে শিখে যায়, একাকিত্বের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এই পৃথিবীতে অনেক লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক আছে, যারা অনেকটা সময় একাই কাটিয়েছে। তারা নিজেই নিজেদের আশ্রয় দিয়েছে। আমার আমিত্বকে একটা গণ্ডির মধ্যে ফেলে এগিয়ে গেছে।
এমন অনেক লেখক আছে, যারা তাদের লেখা গল্পের চরিত্রের মধ্যেই নিজেকে দেখতে পায়। এই যে নিজের মতো করে চরিত্র তৈরি করা, এর মধ্যেই আশ্রয় খোঁজেন লেখক। চরিত্রগুলো যেন তাঁর সঙ্গে বাস করতে থাকে, গল্প করতে থাকে।
যে মানুষটা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মরে যাওয়ার কথা চিন্তা করে, অবহেলা পেতে পেতে নিজেকে শেষ করে দিতে চায়, সেও এক সময় ঘুরে দাঁড়ায়। তার মরে যাওয়া স্বপ্নগুলো অল্প অল্প করে জীবন্ত হতে থাকে। সে বেঁচে ওঠে নিজেকে নিজে আশ্রয় করেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন