default-image

আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদীর হামলায় জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে ছয় এশীয় মার্কিনসহ আটজন নিহত হয়েছে। প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো না কোনো বিদ্বেষমূলক হামলার ঘটনা ঘটছে।

এসব হামলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া সব মন্তব্য ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। জর্জিয়ার তাণ্ডবের পর ১৭ মার্চ ওয়াশিংটনে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের বাসভবনের বাইরে থেকে অস্ত্রসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সহিংসতা মার্কিন সমাজকে নতুন করে অস্থির করে তুলবে বলে আশঙ্কা আরও জোরদার হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে এশীয় মার্কিনদের ওপর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্বেষপূর্ণ হামলার ঘটনা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা অভিবাসী এবং চীনাদের মতো দেখতে চেহারার মানুষকে এশীয় মার্কিন হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কোভিড-১৯ ভাইরাসকে চায়না ভাইরাস বলে আসছিলেন। সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা, এই ভাইরাস চীন থেকে চীনা লোকজনের মাধ্যমে এ দেশে সংক্রমিত হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পে এই ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য চীনকে দায়ী করে বক্তৃতা দিয়েছেন। ফলে স্বল্পশিক্ষিত উগ্রবাদী মানুষের বিদ্বেষের মুখে পড়তে হচ্ছে এশীয় মার্কিন পরিচয়ের মানুষকে। বিভিন্ন নগরে ‘চায়না টাউন’ নামে বাণিজ্যিক এলাকার অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। নিউইয়র্কসহ সর্বত্র লোকজন ব্যাপক হামলার শিকার হচ্ছেন। নিউইয়র্কে এমন শতাধিক হামলার পর এখন ভীতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে এশীয় মার্কিনদের। এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ মাসে এ দেশে এশীয়দের ওপর ৩ হাজার ৮০০টির বেশি বিদ্বেষপূর্ণ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় ১৬ মার্চ তিনটি স্পা সেন্টারে এক দুর্বৃত্তের গুলিতে আটজন নিহত হয়েছেন যাঁদের মধ্যে অন্তত ছয়জন এশীয় নারী। পুলিশ সন্দেহভাজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, জর্জিয়ায় হামলার পর ওই বন্দুকধারী ফ্লোরিডায় হামলা চালাতে চেয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জেন সাকী ১৭ মার্চি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া সব বক্তব্যের প্রভাব রয়েছে এসব হামলার পেছনে। ‘চায়না ভাইরাস’, ‘উহান ভাইরাস’ বলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এশীয় কমিউনিটিকে বিপদাপন্ন করে তোলা হয়েছে।

জেন সাকী বলেন, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ভাষণে এশীয় কমিউনিটির ওপর এমন বিদ্বেষপূর্ণ হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগ, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ১৭ মার্চ চার পৃষ্ঠার একটি স্মারক প্রকাশ করেছে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই স্মারকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদীরা হামলার জন্য ওত পেতে রয়েছে। এসব হামলায় বিভিন্ন সংখ্যালঘু কমিউনিটি, অভিবাসী গোষ্ঠীর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি, রক্ষণশীল নৈরাজ্যবাদীদের উত্থানের ফলে বছরব্যাপী এমন হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য সব মহলকে সতর্ক থাকতে হবে। উদারনৈতিক রাজনৈতিক নেতা, আইনপ্রণেতাসহ অনেকেই হামলার হামলার শিকার হতে পারেন। সরাকারী স্থাপনাগুলোও আক্রান্ত হতে পারে।

হোয়াইট হাউসের অদূরে ব্লেয়ার হাউসে বাস করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। ১৭ মার্চ দুপুরে তাঁর বাড়ির সামনে একজন সন্দেহজনক তরুণের অবস্থান চিহ্নিত করে গোয়েন্দা বিভাগ। ৩১ বছর বয়সী পল মারী টেক্সাসের সান এন্টেনিওর বাসিন্দা। প্রথমে তাকে সন্দেহবশত গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার গাড়িতে বড় ধরনের হামলার অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পাওয়া গেছে।

গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভক্ত সমাজের নতুন নগ্ন রূপ বেরিয়ে এসেছে। শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের আহ্বানে ক্যাপিটল হিলের হামলায় এসব উগ্রবাদী যোগ দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ জনকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দারা ভয়াবহ তথ্য পাচ্ছেন।

নিউইয়র্ক, নিউজার্সির মতো উদারনৈতিক রাজ্য থেকে কমপক্ষে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা সরকারি কোনো না কোনো বাহিনীর সাবেক বা বর্তমান সদস্য। এসব লোকজন ডোনাল্ড ট্রাম্পের উসকানিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ট্রাম্পের মতো এসব মানুষও বিশ্বাস করে, গত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জালিয়াতি করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে এসব উগ্রবাদীর অবস্থান বেশ শক্তিশালী। তারা সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেরা যুক্ত থাকছে। এফবিআইসহ সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগ এদের ওপর নজরদারি রাখলেও জনসমাজের সঙ্গে মিশে থাকা উগ্রবাদীদের চিহ্নিত করা জটিল হয়ে উঠেছে। অনেকটা বাইরের জঙ্গিদের মতো এসব উগ্রবাদী নীরবেই আত্মঘাতী হয়ে উঠছে।

গত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী ভিন্ন বর্ণের অভিবাসীদের নিজেদের চেয়ে এগিয়ে যেতে দেখছে। শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসা, বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়া মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত না করে হতাশ লোকজন রাজনীতির সহজ উসকানিরতে পা দিচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব হতাশ মানুষের আশার আলো হয়ে উঠেছেন। এসব উগ্রবাদী মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পই তাদের রক্ষা করতে পারেন। ট্রাম্প নিজেও সচেতনভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ এসব মানুষকে উসকে দিয়ে রাজনীতির সাফল্য দেখছেন। এর পরিণামে মার্কিন সমাজকে মূল্য দেওয়া শুরু হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন