আমেরিকায় আসলেও দেশের সংস্কৃতিকে বুকে ধারন করে আছেন প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশি অভিবাসীরা। কিন্তু সন্তানদের নিয়ে তারা পড়েছেন বিপাকে। এ দেশে বেড়ে ওঠা সন্তানেরা বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে তেমন পরিচিত নন। আমেরিকার সংস্কৃতি দেখে তাদের বেড়ে ওঠা। ফলে এখন দুই সংস্কৃতির সংঘাতে পড়েছেন অনেক অভিবাসী বাংলাদেশি। আমেরিকায় দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তানদের নিয়ে তাই হতাশ অনেক অভিভাবক। দেখা দিচ্ছে সামাজিক সমস্যা। অনেক পরিবারে দেখা দিচ্ছে কলহ, ভাঙছে সংসার। হতাশ অনেক প্রবাসী স্বপ্নের দেশে এসে জীবনকে ষোলো আনাই মিছে ভাবছেন।

বাংলাদেশের রীতিনীতি অনুযায়ী, ছেলেমেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে আর ভালো একটি চাকরি পেলে অভিভাবকেরা সন্তানদের বিয়ের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। আমেরিকায় এসেও একই নিয়মে সন্তানদের বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করেন তাঁরা। কিন্তু এ দেশে বড় হওয়া সন্তানদের অনেকেই বাবা–মায়ের দেশের নিয়মে বিয়ে করতে নারাজ। বিয়ের ব্যাপারে তারা বাবা–মায়ের সিদ্ধান্ত মানতে চান না। তারা চায় নিজেদের মতো চলতে। এতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেক অভিভাবকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। নিউইয়র্কসহ আমেরিকার বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে হাজার হাজার বাঙালি পরিবার বসবাস করে। 

সামাজিক অবস্থানের কথা বিবেচনা করে এখানে কারও প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। বগুড়া থেকে আসা রবিউল হাসান বাবা–মায়ের সঙ্গে পাঁচ বছর বয়সে আসেন আমেরিকায়। এখানে এসে বাবা–মা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করান। ধীরে ধীরে তিনি বড় হতে থাকেন। স্কুল শেষ করে কলেজে পড়েছেন। পড়াশোনা শেষে ভালো একটি চাকরি করছেন তিনি। চার ভাই–বোনের মধ্যে তিনি বড়। মা–বাবার স্বপ্ন, দেশে নিয়ে তাকে নামিদামি পরিবারে বিয়ে করাবে। কিন্তু দেশে বিয়ে করার ব্যাপারে দ্বিমত তাঁর। বিষয়টি তিনি বাবা–মাকে বলেছেনও। এখানে তিনি স্প্যানিশ পরিবারের এক মেয়েকে পছন্দ করেন। দুই বছর ধরে তার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। বিয়ে না করে এভাবেই কয়েক বছর কাটাতে চান সামিউল। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে তাঁর মা–বাবার সঙ্গে ঝগড়া লেগেই আছে।
রবিউলের বাবা আবু আহমদ বলেন, ‘কোনভাবেই ছেলেকে বিয়ে করাতে পারছি না। বিয়ে ছাড়া অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে থাকা যে অনৈতিক, সেটাও তাকে কোনভাবে বোঝানো যাচ্ছে না। পরিবারের বড় ছেলের কারণে সংসারের সব সদস্য এখন অশান্তিতে ভুগছে।’
জ্যামাইকার হিলসাইডে বসবাসকারী রাজশাহীর শওকত ওসমানের পরিবারে এক ছেলে ও তিন কন্যা সন্তান। ছেলে সবার ছোট। গত বছর সে স্কুল শেষ করে কলেজে পড়ছে। সবার বড় বোন। বড় বোনের সঙ্গে মেজো বোনের বয়সের পার্থক্য দুই বছর। তাঁরা দুজনেই মাস্টার্স শেষ করেছেন। বড় মেয়ে ফারিহা একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। বয়স প্রায় ৩৮। মেজো মেয়ে সামিয়া। তিনিও একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
তাদের বাবা ওসমান বলেন, ‘আমার দুটি মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক। ভালো চাকরিও করছে। বিয়ের জন্য বেশ কয়েকজন ছেলে তাদের দেখতে এসেছে। ছেলেরা মেয়েদের পছন্দও করেছে। কিন্তু আমার মেয়েরা ছেলেদের নানান খুঁত বের করে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। তাদের মা তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা ছেলেদের বিষয়ে যে সমস্যা ব্যক্ত করেছেন, সেগুলো তেমন কোন বড় সমস্যা নয়। ছোটখাটো বিষয়।’
ওসমান আরও বলেন, ‘দেশ থেকে আত্মীয়স্বজনেরা সব সময় জিজ্ঞাসা করে, মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন না কেন? উত্তর দেওয়ার সময় অনেকটা লজ্জায় পড়ে যাই। এদিকে মেয়েদের বয়সও বেড়ে যাচ্ছে, কোন কিনারা করতে পারছি না। আমাদের বয়সও হয়ে গেছে, তাদের ভালো একটি বিয়ে দিয়ে মরতে পারলে শান্তি পেতাম। মেয়েদের মাও তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। কী যে হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
ব্রুকলিনের বাসিন্দা সিরাজুল আলমের দুই ছেলে আরিফ হোসেন ও শাহাদাত হোসেন। বাংলাদেশের সিলেট থেকে তারা আমেরিকায় এসেছেন। বারো বছর বয়সে আসেন আমেরিকায়। বর্তমানে দুই ছেলেই ভালো চাকরি করছেন। সিরাজুলের শেষ চাওয়া, ছেলেদের বিয়ে করাবেন এবং নাতিপুতির মুখ দেখে যাবেন। কিন্তু কোনোভাবেই ছেলেরা তার আশা পূরণ করছেন না। ছেলেরা থাকেন আলাদা বাসায়। তারা তেমন একটা বাংলা ভাষাও বলতে পারে না।
সিরাজুল চান আমেরিকায় অথবা দেশে যেকোনো জায়গায় সন্তানেরা বিয়ে করলেই হবে। তবে তারা অবশ্যই বাঙালি পরিবারের মেয়ে হতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলেকে একাধিকবার বিয়ের ব্যাপারে বলেছি। বিয়ের ব্যাপারে তাদের কোন আগ্রহ আছে কিনা, সেটাও আমি বুঝতে পারি না। তারা আমার ভাষাও বুঝতে পারে কি না, সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ নিয়ে আমার পরিবারে চরম হতাশা বিরাজ করছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।’
প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ সোসাইটির এক কর্মকর্তার ছেলে বাবার কথা মতো দেশে গিয়ে বিয়ে করেন। কিন্তু কয়েক মাস পরেই তাদের মধ্যে মতের অমিল শুরু হয়। প্রতিদিন ঘরে ঝগড়া লেগেই থাকত। ছেলেটি মেয়েটিকে তালাক দেয়। ছেলে আর ছেলে বউয়ের বিরোধ দেখে সহ্য করতে না পেরে বাবা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এক বছরের মাথায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওই কর্মকর্তার ছেলে বিখ্যাত একটি কার কোম্পানির সঙ্গে কাজ করত।
ম্যারেজ মিডিয়া নামক একটি সামাজিক সংগঠনসহ একাধিক সামাজিক সংগঠন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ–তরুণীদের বিয়ের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এবং নতুন প্রজন্মকে সংসারমুখী করতে কাজ করছে। তারা প্রতিবছর অভিজাত রেস্টুরেন্টে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে মুসলিম তরুণ–তরুণীদের এক জায়গায় একত্রিত করেন। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন করে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে আয়োজকদের একজন তহলিমা খানম মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, চার মাস অন্তর অন্তর এই উদ্যোগ নেওয়া গেলে হয়তো আরও কিছু আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যেত।
ম্যারেজ মিডিয়ার আবদুল ওয়াহিদ বলেন, ‘আমাদের পরিবারগুলোতে প্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ে নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে নীরব কান্না চলছে। আমরা সামান্য কিছু পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিয়ে করে সংসারী করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছি। বেশির ভাগই ছেলেমেয়ে বিয়েতে আগ্রহী নয়। এ সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকে ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে ছেলেমেয়েক সচেতন করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করলে ছেলেমেয়েদের প্রথামাফিক বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন