পরিবর্তন চেয়েছিলেন তাঁরা। ভোটের রায়ে নিশ্চিত হয়েছে তা। সেই প্রাপ্তির আনন্দে রাস্তায় নেমে উল্লাস। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্ট হলিউডে
পরিবর্তন চেয়েছিলেন তাঁরা। ভোটের রায়ে নিশ্চিত হয়েছে তা। সেই প্রাপ্তির আনন্দে রাস্তায় নেমে উল্লাস। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্ট হলিউডে ছবি: এএফপি

‘আজ আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন’—এটি জো বাইডেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর খ্যাতনামা লেখক স্টিফেন কিংয়ের কথা। সুপরিচিত টিভি ব্যক্তিত্ব ৮৯ বছর বয়স্ক ড্যান র‍্যাদারের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘মৃত্যুর আগে এমন সুখবর পাব, বিশ্বাস করিনি।’

বাইডেনের বিজয়ে এভাবে টুইটারের মাধ্যমে দুজন খ্যাতনামা ব্যক্তি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। লাখ লাখ সাধারণ আমেরিকান তাঁদের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন ভিন্নভাবে। তাঁরা রাস্তায় নেমে এসেছেন, অনেকে সঙ্গে নিয়েছেন নিজের শিশুপুত্র ও কন্যাকে। হাতে হাত রেখে হেঁটেছেন প্রতিবেশীর সঙ্গে; চিৎকার করে উল্লাস করেছেন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে। মানুষ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন, বুক ভরে শ্বাস নিয়েছেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, ‘এই তো আমার আমেরিকা, তাকে আবার ফিরে পেয়েছি।’

এই স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস জো বাইডেনের বিজয়ের জন্য যতটা, ঠিক ততটাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্থানের সম্ভাবনায়। এই সম্ভাবনায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ কতটা উদ্বেলিত, তার ভালো উদাহরণ সিএনএনের ভাষ্যকার ভ্যান জোন্সের প্রতিক্রিয়া। প্রেসিডেন্ট ওবামার এই সাবেক উপদেষ্টা টেলিভিশনের পর্দায় আবেগে কেঁদে ফেলেন। সে জন্য তিনি বিব্রত হননি, বিন্দুমাত্র লজ্জিত হননি। চোখে জল নিয়েই তিনি বলেন, অনেক মানুষই আজ স্বস্তি বোধ করছেন। কারণ, এরপর কোনো মুসলিমকে বহিষ্কারের উদ্বেগে দিন কাটাতে হবে না। কোনো অভিবাসীকে নিজের শিশুকে সীমান্তে ছিনিয়ে নেওয়ার ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে হবে না। জর্জ ফ্লয়েডের মতো যাঁরা সকাতরে বলেছেন, ‘শ্বাস নিতে পারছি না’, আজ তাঁরা স্বস্তি পেয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থকদের জন্য আজ সুখের দিন নয়, কিন্তু অন্য অনেকের জন্য আজ একটি প্রকৃত সুখের দিন।

বিশ্বের মানুষও সমান উৎসাহে জো বাইডেনকে স্বাগত জানিয়েছে। তাঁদের স্বাগত উচ্চারণের আড়ালে ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্থানে অনুক্ত স্বস্তি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, যাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘আলাদা রকম’ সখ্য ছিল, এক অভিনন্দনবার্তায় জানান, পরিবেশসংকট, বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ সব প্রশ্নে তিনি বাইডেনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। একই কথা বলেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির চ্যান্সেলর। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রশ্নেই ট্রাম্পের অনুসৃত নীতি ছিল ভিন্ন। তিনি জলবায়ু সংকট প্রশ্নে প্যারিস চুক্তি থেকে সরে এসেছেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিল করেছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। ট্রাম্পের পরাজয়ে বিশ্বনেতারা তাঁদের হাঁপ ছেড়ে বাঁচার কথা বলেননি বটে, কিন্তু তাঁদের কথার আড়ালে তেমন স্বস্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁদের আশা, এখন অবস্থা বদলাবে।

বাইডেন, এই সময়ের সঠিক নেতা

আমেরিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত এবং একে অপরের প্রতি ত্যক্তবিরক্ত ও ক্রুদ্ধ—এবারের নির্বাচনের এটি ছিল প্রধান বার্তা। এই আমি-তুমির লড়াই, যাঁকে অনেকে লাল-নীলের বিভক্তি বলে থাকেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে বর্ণভিত্তিক বিভাজন। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তার শ্বেতকায় চরিত্র হারাচ্ছে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে সে একটি অশ্বেতকায় প্রধান দেশে পরিণত হবে। এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে শ্বেতকায়দের মধ্যে ভয় জন্মেছে, তারা আর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থাকছে না। ফলে ক্ষোভ জন্মেছে আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিক এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অশ্বেতকায় অভিবাসীদের প্রতি। ২০০৮ সালে কৃষ্ণকায় বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনের পর শ্বেতকায়দের মধ্যে এই ক্ষোভ প্রকাশ্য উদ্বেগ ও ঘৃণায় পরিণত হয়। এই অনুভূতিকে আশ্রয় করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রথম রাজনৈতিক তাস ছিল মার্কিন নাগরিক হিসেবে ওবামার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

ট্রাম্পের চার বছরে এই ঘৃণা ও বিভক্তির রাজনীতি এ দেশের মূলধারাভুক্ত হয়ে পড়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রায় ৭ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে। বাইডেন, যিনি সাড়ে ৭ কোটি মানুষের ভোট পেয়েছেন, তাঁকে বাদ দিলে এটি আমেরিকার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প মঞ্চ থেকে অন্তর্হিত হলেও এই ৭ কোটি মানুষের অধিকাংশই তাঁদের ক্রোধ ও ঘৃণা পুষে রাখবেন, যা ব্যবহার করে এক বা একাধিক নতুন ট্রাম্প মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেন। ট্রাম্প চলে গেলেও টিকে থাকবে ট্রাম্পবাদ।

স্বস্তির কথা শুধু এটুকুই যে ট্রাম্পের স্থলাভিষিক্ত হতে চলেছেন এমন একজন, যিনি প্রথম দিন থেকেই বিভাজন ভুলে এ দেশের মানুষকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার পর তিনি যে ভাষণ দেন, তার মোদ্দা কথা ছিল, ‘আমি লাল ও নীল এই বিভক্তি মানি না। যাঁরা আমাকে ভোট দিয়েছেন এবং যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, আমি তাঁদের সবারই প্রেসিডেন্ট হতে চাই। এই কাজে আমাকে সাহায্য করুন।’

ভাষণে বাইডেন বলেন, ‘সামনে এগোতে হলে আমাদের একে অপরকে শত্রু ভাবা বন্ধ করতে হবে। বাইবেল আমাদের শিক্ষা দেয়, প্রতি কাজের জন্য নির্ধারিত সময় রয়েছে, রয়েছে নির্ধারিত ঋতু। নির্মাণের এক সময়, ফসল তোলার এক সময়, ফসল বোনার এক সময় এবং নিরাময়ের এক সময়। এখন আমেরিকার জন্য নিরাময়ের সময়।’

ভোটে বাইডেনের ‘প্রধান অস্ত্র’ কমলা

নির্বাচনে বাইডেনের জয়ের প্রধান কারণ, নারী ভোটার—বিশেষত আফ্রিকান-আমেরিকান—নারীদের বিপুল সমর্থন। প্রায় ৯০ শতাংশ আফ্রিকান-আমেরিকান নারী বাইডেনের পক্ষে ভোট দেন। এই ভোট সংগ্রহে বাইডেনের একটি প্রধান অস্ত্র ছিল তাঁর রানিং মেট কমলা হ্যারিস। তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। এ দেশের সব নারীর জন্য এটি একটি গভীর গর্বের বিষয়।

ডেলাওয়ারে বাইডেনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় কমলা নিজেও সে কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো প্রথম নারী যে এই পদে আসীন হচ্ছি, কিন্তু আমি কখনোই সে দায়িত্বে শেষ নারী হব না। প্রতিটি শিশুকন্যা যারা আজকে আমার কথা শুনছে, তারা বুঝতে পারছে এই দেশ বিপুল সম্ভাবনাময়।’ তিনি সব মেয়েকে স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানান, আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে সরবে সমর্থন জানাব।’

ধারণা করা হচ্ছে, অভিজ্ঞ কৌঁসুলি ও বাক্‌পটু কমলা অনেক নীতিগত উদ্যোগে নেতৃত্ব দেবেন। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা স্বীকৃতি পাবে, তাঁদের অন্তর্ভুক্তি বাড়বে। বাইডেন জানেন, টিকে থাকতে হলে তাঁর প্রশাসনকে নারী ভোটারদের সহানুভূতি অর্জন করতে হবে। সে কাজে কমলা হবেন তাঁর ‘প্রধান অস্ত্র’।

নারীবাদী সংগঠন ‘হায়ার হাইটস’–এর পরিচালক গ্লিন্ডা কার বলেছেন, কবি মায়া অ্যাঞ্জেলু বলতে ভালোবাসতেন, ‘আমি প্রবেশ করি একজন হয়ে, কিন্তু যখন উঠে দাঁড়াই, তখন আমি ১০ হাজারের প্রতিনিধি হয়ে উঠি।’ জো বাইডেনের সঙ্গে কমলা যখন ওভাল অফিসে প্রবেশ করবেন, তিনি নারীদের জন্য ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করবেন। একা হলেও তিনি হবেন লাখো নারীর কণ্ঠস্বর।

প্রধান বাধা ট্রাম্প

নিরাময় ও বিভক্তি ভোলার যে আহ্বান বাইডেনের, তার লক্ষ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর অনুগত সমর্থকেরা। ডেলাওয়ারের ভাষণে তাঁদের উদ্দেশে বাইডেন বলেন, ‘আপনারা যাঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, আমি জানি আপনাদের বুক ভেঙে গেছে। এক-দুবার পরাজয়ের অভিজ্ঞতা আমারও রয়েছে। সে কথা ভুলে আসুন আমরা একে অপরকে একটি সুযোগ দিই।’

ট্রাম্প অথবা তাঁর সমর্থকেরা কেউই এখনো সেই সুযোগ দিতে প্রস্তুত নন। বাইডেনের জয়ের ঘোষণা আসার সময় ট্রাম্প গলফ খেলতে যান। হোয়াইট হাউসের সামনে ততক্ষণে হাজার মানুষের উল্লাস সমাবেশ শুরু হয়েছে। এই উল্লাসের জবাবে এক টুইটে ট্রাম্প জানান, বাইডেন নন, তিনিই নির্বাচনে জিতেছেন। তাঁর টুইট: ‘আমি ৭১ মিলিয়ন আইনসম্মত ভোট পেয়েছি।’ অন্য এক টুইটে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর পক্ষের পর্যবেক্ষকদের ভোট গণনাকক্ষে থাকতে দেওয়া হয়নি। তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমরা সব আইনি পদক্ষেপ অনুসরণ করব।’

যেভাবে সম্ভব বাইডেনের জয়ের বৈধতা অস্বীকার করাই এই মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রধান রণকৌশল। ভোটের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি বিভিন্ন রাজ্যের আদালতে মামলা করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপও তিনি কামনা করেছেন। ট্রাম্পের অন্যতম কৌঁসুলি রুডি জুলিয়ানি পরিহাস করে বলেছেন, বাইডেন ও তাঁর সমর্থকেরা আসলে ‘ফ্যান্টাসি ল্যান্ডে’ বাস করছেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অনিয়ম ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগের কোনো অর্থপূর্ণ প্রমাণ নেই। ইতিমধ্যে একাধিক মামলা রাজ্য পর্যায়ে খারিজ হয়েছে।

নেভাদায় ট্রাম্পের কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেছিলেন, ব্যালটে স্বাক্ষর নির্ণয়ের জন্য যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা ত্রুটিপূর্ণ। একজন ফেডারেল বিচারক সে অভিযোগ খারিজ করে বলেছেন, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। অ্যারিজোনায় এক নারী অভিযোগ করেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ ভোট দিয়েছেন। পরে ব্যালটে স্বাক্ষর মেলানোর পর দেখা যায় অন্য কেউ নন, সেই নারীই ভোট দিয়েছেন। মিশিগানে মৃত ব্যক্তির নামে ভোট দেওয়া হয়েছে, ট্রাম্পের সমর্থকদের এই দাবি ভিত্তিহীন, তা–ও ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় যাঁরা ৩ তারিখের পর ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন, তা বাতিলের এক অভিযোগ ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের সামনে দাখিল করেছেন। বন্ধুপ্রতিম বিচারকদের হাতে সে অভিযোগ যদি আমলে আসে, তাহলেও মোট ভোটের বিপুল ব্যবধানের কারণে বাইডেনের বিজয়ে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না।

যাঁরা ভেবেছিলেন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প হয়তো বাইডেনের বিজয় মেনে নেবেন, তাঁরা সম্ভবত ভুল করছেন। পরাজয় মানতে অভ্যস্ত নন ট্রাম্প। জিতুন না জিতুন, তিনি মামলা চালিয়ে যাবেন। হোয়াইট হাউস ছেড়ে যেতে হলেও তিনি পরাজয় স্বীকার করবেন না। অনবরত বলে যাবেন, ভোট চুরির মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে ‘নির্বাচন এখনো শেষ হয়নি’।

যে কথাই ট্রাম্প বলুন না কেন, আমেরিকার মানুষের রায়ে তাঁর স্থান এখন ইতিহাসের অন্ধকারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0