বিতর্কে বিজয়ী বাইডেন

তিন সপ্তাহ আগে দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বনাম জো বাইডেনের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম বিতর্কের সময় মনে হয়েছিল স্কুলের মাঠে দুই উচ্ছৃঙ্খল বালকের হাতাহাতি দেখছি। গত বৃহস্পতিবার টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে তাঁদের দ্বিতীয় ও শেষ বিতর্কেও কথার যুদ্ধ কম হয়নি, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল না। তাই মোটের ওপর একটি স্বাভাবিক বিতর্ক উপভোগ সম্ভব হয়েছে। দর্শকদের বিচারে জয়ী হয়েছেন বাইডেন, তবে প্রকৃত বিজয়ী যে মার্কিন গণতন্ত্র, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

বিতর্কের আগে ট্রাম্প ও তাঁর শিবিরের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের সঙ্গে রুশ-আমেরিকান ব্যবসায়ী টনি বাবুলিন্সকির গোপন সম্পর্ক বিষয়ে একটি ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ প্রচার। বাবুলিন্সকির দাবি ছিল, জো বাইডেনের নাম ব্যবহার করে তাঁর ছেলে হান্টার চীনের সঙ্গে অবৈধ ব্যবসায়ে বিস্তর অর্থ উপার্জন করেছেন, আর তার সবই জানতেন বাইডেন। এদিন দুপুরে ট্রাম্প শিবির তড়িঘড়ি করে বাবুলিন্সকিকে নিয়ে একটি সাংবাদ সম্মেলনের আয়জন করে। পরে ন্যাশভিলের দ্বিতীয় বিতর্কে ট্রাম্পের বিশেষ অতিথি হিসেবে বাবুলিন্সকিকে উপস্থিত করা হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

বিতর্কের আগে এই যে ‘সাইড শো’র আয়োজন, অধিকাংশ দর্শক তা টের পাননি। ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক পোস্ট ছাড়া এই সংবাদ অধিকাংশ টিভি ও পত্রপত্রিকা উপেক্ষা করে। তাদের কাছে এটি একটি ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ছাড়া আর কিছু নয়। বাইডেনের সংযুক্তির প্রমাণ আছে বলে যে দাবি বাবুলিন্সকি করেন, তার কিছুই তিনি সাংবাদিকদের দেখাতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য সে কথা উল্লেখ করে বাইডেনকে জেলে পাঠানোর দাবি করেছেন। এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগ তাঁর সে দাবি পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলেছে।

নীরব’ মাইক্রোফোন

শেষ বিতর্ক মোট ছয়টি বিষয়ভিত্তিক পর্বে ভাগ করা হয়েছিল। প্রথম বিতর্কের দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতার পর নিরপেক্ষ বিতর্ক কমিশন প্রতি পর্বের শুরুতে প্রত্যেক বক্তাকে দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ করে দেয়। এই সময় অপর বক্তার মাইক্রোফোন মিউট বা নীরব করে রাখা হয়। এটি মূলত ট্রাম্পকে বাগে আনার জন্যই করা, এই ব্যবস্থা নেওয়ায় তাঁরা দুজনই কম-বেশি অর্থপূর্ণ বিতর্কে নিয়োজিত হতে সক্ষম হন। একজন ভাষ্যকারের মতে, এই বিতর্কের প্রকৃত বিজয়ী আসলে এই নীরব মাইক্রোফোন।

বিদেশি অর্থ

বিতর্কে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাইডেনের কথিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, জো বাইডেন ও হান্টার বাইডেন উভয় দেশ থেকেই বড় ধরনের অর্থ পেয়েছেন, সম্ভবত এখনো পাচ্ছেন। উত্তরে বাইডেন জানান, এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর তোলা অভিযোগ ট্রাম্পকে ফিরিয়ে দিয়ে বাইডেন জানান, সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ট্রাম্প একটি চীনা ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ‘তাঁর চীনের সঙ্গে গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, আর সেই তিনি কিনা আমার বিরুদ্ধে চীনের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলছেন? আমি বিদেশি কারও কাছ থেকে একটি পয়সাও নিইনি’, সরোষে বলেন বাইডেন। তিনি জানান, গত ২১ বছরের আয়করের হিসাব তিনি দাখিল করেছেন, কিন্তু ট্রাম্প সে হিসাব দেননি। ‘কেন, কী গোপন করছেন আপনি আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে?’ তিনি জানতেন চান।

default-image

কোভিড-১৯

স্বভাবতই বিতর্কের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল কোভিড-১৯। ট্রাম্পের দাবি, তাঁর গৃহীত ব্যবস্থার ফলে লাখো মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাইডেন বলেন, জানুয়ারির শেষের দিকেই ট্রাম্প জানতেন এটি মারাত্মক একটি ভাইরাস, কিন্তু সে সত্য তিনি গোপন করে যান। ট্রাম্প দাবি করেন, ‘কঠিন সময় পেরিয়ে গেছে, অবস্থা এখন ভালোর দিকে।’ তবে বাইডেন বলেন, ‘মোটেই না। আমরা এক তমসাময় শীতকালে প্রবেশ করছি।’

স্বাস্থ্যবিমা

স্বাস্থ্যবিমা প্রশ্নেও দুজনের তুমুল বিতণ্ডা হয়। বাইডেন অভিযোগ করেন, ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি বাতিল হলে লাখো মানুষ স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। উত্তরে ট্রাম্প জানান, তিনি ওবামাকেয়ারের চেয়ে অনেক গুণে ভালো বিমা কর্মসূচি চালু করবেন।

এমন দাবি ট্রাম্প চার বছর ধরেই করছেন, কিন্তু কাগজে-কলমে কিছুই করেননি। বাইডেন জানান, তিনি ওবামাকেয়ারকে বাতিল করার বদলে তা সম্প্রসারিত করে ‘বাইডেনকেয়ার’ চালু করবেন। ট্রাম্প পাল্টা যুক্তি দেখান, বাইডেন স্বাস্থ্যসেবা সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে চান, যা হবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে এ কথা মিথ্যা, এমন দাবি করে বাইডেন জানান, তাঁর প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচিতে একই সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারি বিমা ব্যবস্থা থাকবে।

ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম বেতন

বিতর্কের একপর্যায়ে বাইডেন জানান, নিম্নবিত্তদের সাহায্যার্থে তিনি ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম ১৫ ডলার বেতনের পক্ষে। তবে ট্রাম্প দাবি করেন, এর ফলে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই পর্যায়ে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এনবিসি টিভির সাংবাদিক ক্রিস্টেন ওয়েলকার ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন, তিনি নিজেই এমন প্রস্তাব বিবেচনা করার কথা বলেছেন। সে কথার জবাবে ট্রাম্প বলতে বাধ্য হন, বিষয়টি তিনি বিবেচনায় আনবেন, তবে ছোট ব্যবসায়ের ক্ষতি হয়, এমন কিছু তিনি করবেন না।

বিজ্ঞাপন
default-image

তেল-গ্যাস

এদিন সন্ধ্যার একমাত্র নতুন প্রসঙ্গ ছিল জ্বালানি ব্যবহার প্রশ্নে বাইডেনের প্রস্তাবিত নীতি। তিনি জানান, নির্বাচিত হলে তাঁর প্রশাসন জীবাশ্মভিত্তিক তেল ও গ্যাসের বদলে পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেবে। সে কথা বলামাত্রই ট্রাম্প বাইডেনকে আক্রমণ করে বলেন, এর ফলে আমেরিকার তেল ও গ্যাসশিল্প ধ্বংস হবে। কিছুটা নাটকীয়ভাবে তিনি টেক্সাস ও পেনসিলভানিয়ার অধিবাসীদের ভোট প্রদানের সময় বাইডেনের কথা মনে রাখার পরামর্শ দেন।

কোনো কোনো ভাষ্যকারের ধারণা, তেল ও গ্যাস প্রশ্নে বাইডেনের এই অবস্থান জ্বালানিনির্ভর এই দুই রাজ্যের ভোটারদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ এবোট এক তাৎক্ষণিক টুইটে দাবি করেন, বাইডেনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই রাজ্যের সাধারণ মানুষ। ‘ভোটের দিন এই কথাটা আপনারা মনে রাখবেন’, গভর্নর এবোট মন্তব্য করেন।

default-image

অবিরল মিথ্যা

অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, ট্রাম্প হয়তো ফের পুরোনো নাটুকেপনায় ফিরে যাবেন এবং বিতর্কমঞ্চে তেল ঢেলে নিজেকে নিজেই জ্বালিয়ে দেবেন। তা ঘটেনি, বরং তিনি জোরের সঙ্গে নিজের অনুসৃত নীতির পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখান। তা করতে গিয়ে অবশ্য তিনি বিস্তর মিথ্যা অথবা অর্ধসত্যের আশ্রয় নেন। সিএনএনের হিসাবমতে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বিতর্কে ট্রাম্প অধিকসংখ্যক মিথ্যার আশ্রয় নেন। বাইডেনও সে দোষমুক্ত নন। ফ্রাকিং নামে পরিচিত তেল আহরণপদ্ধতি পরিহারের কথা বলেননি বলে যে দাবি বাইডেন করেন, সেটি ছিল মিথ্যা।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর ভাষায়, জো বাইডেনের রেকর্ড বিকৃত করতে গিয়ে ট্রাম্প অবিরল মিথ্যা বলে গেছেন। করোনাভাইরাস থেকে বর্ণ সমস্যা প্রশ্নে নিজের সাফল্যের যে গান তিনি গান, বাস্তবের সঙ্গে তার মিল সামান্যই। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, তাঁর মতো বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী ব্যক্তি দুটি নেই। টাইমসের ভাষায়, ট্রাম্পের এই দাবি হাস্যকর।

বিজয়ী বাইডেন

বিতর্কে কে জিতেছেন, এই প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্প ও বাইডেন শিবির নিজেদের প্রার্থীর কথাই বলেছে। তবে সিএনএনের তাৎক্ষণিক জরিপে ৫৩ শতাংশ দর্শক বাইডেনকেই বিজয়ী হিসেবে সাব্যস্ত করেন। ৩৯ শতাংশ দর্শকের ধারণা, বাইডেন নন, ট্রাম্পই জিতেছেন।

বিতর্কে যিনিই জিতুন, এর ফলে মার্কিন ভোটারদের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন হবে, এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। অধিকাংশ ভোটার ইতিমধ্যেই তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এই বিতর্ক যাঁর যাঁর সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করবে মাত্র। যদি কোনো একজনকে বিজয়ী নির্ধারণ করতেই হয়, তাহলে বলতে হবে, এই বিতর্কের প্রকৃত বিজয়ী আমেরিকার গণতন্ত্র।

মন্তব্য পড়ুন 0