ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের রাজনৈতিক রেকর্ড, সুপ্রিম কোর্ট ইস্যু, কোভিড-১৯, দেশের অর্থনীতি, আমেরিকার নগরেগুলোতে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, সহিংসতা ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা বিতর্কের মূল ইস্যু হতে পারে। তবে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ট্রাম্পের আয়কর ফাঁকির প্রতিবেদন যে তাঁকে নতুন চিন্তায় ফেলছে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। বিতর্কে তিনি এটি কীভাবে সামাল দেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এর মধ্যে রোববার বিকেলে নিউইয়র্ক টাইমস ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর রিটার্ন নিয়ে তুমুল আলোচিত সংবাদ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বেশ কয়েক বছর কোন আয়করই দেননি। যে বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, সে বছর ট্যাক্স দিয়েছেন মাত্র ৭৫০ ডলার! যুক্তরাষ্ট্রে নিম্ন মজুরিতে কাজ করা কোন কর্মজীবী মানুষও এর চেয়ে বেশি আয়কর দেন। বাইডেন এই প্রশ্নটি যে বিতর্কে নিয়ে আসবেন, তা নির্ঘাত বলা যায়।

সঞ্চালক ক্রিস ওয়ালেস প্রথম প্রশ্নটি করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীরা বিতর্ক নিয়ে বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। নিজেদের প্রচার শিবিরে দিনের পর দিন মহড়া চলে। সম্ভাব্য সবদিকেই পূর্ণ প্রস্তুত থাকেন প্রার্থীরা। জো বাইডেন বিতর্কের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে তাঁর প্রচার শিবির থেকে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিতর্কে ভোটারদের মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে না। তবে এমন বিতর্ক ভোটারদের মনোভাবের শক্তি বাড়ায়। তিনি মনে করেন, বিতর্কে জয় নয়, তাঁরা যেন হেরে না যান—দুজনকে সে কথাই ভাবতে হবে
মিচেল ম্যাককিনি, পরিচালক, মিজৌরি ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন ইনস্টিটিউট

ভোটের পাঁচ সপ্তাহ আগে সরাসরি বিতর্কে মুখোমুখি হচ্ছেন ট্রাম্প ও বাইডেন। নির্বাচন সর্বোতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত সব জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন বাইডেন। তারপরও আমেরিকার জটিল নির্বাচনী হিসাব ইলেকটোরাল কলেজ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ‘সুইং স্টেট’ হিসেবে রাজ্যগুলোতে পরিস্থিতি এদিক-ওদিক হচ্ছে। বহু রাজ্যে ইতিমধ্যে ডাকযোগে ভোট দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। মনস্থির করেনি, এমন ভোটার খুব কম আছে বলে নানা জরিপে উঠে এসেছে।

এমন টান টান উত্তেজনার বিতর্কে কোন প্রার্থীর একটা সামান্য কথা, মুখ ফসকে বলে ফেলা কোন উক্তি, ভুলে যাওয়া কোন তথ্য বা বিভ্রান্তির কোন বক্তব্য প্রার্থীর ভাবমূর্তিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।

মিজৌরি ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন ইনস্টিটিউটের পরিচালক মিচেল ম্যাককিনি বলেন, বিতর্কে ভোটারদের মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে না। তবে এমন বিতর্ক ভোটারদের মনোভাবের শক্তি বাড়ায়। তিনি মনে করেন, বিতর্কে জয় নয়, তাঁরা যেন হেরে না যান—দুজনকে সে কথাই ভাবতে হবে।

সানফ্রান্সিসকো ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিশেষজ্ঞ জোসেফ টুম্যান মনে করেন, সমর্থকদের ধরে রাখতে বিতর্ক বড় ভূমিকা রাখে। দুই প্রার্থীকে নজরে রাখতে হবে অনেক কিছুই। সামান্য বিভ্রান্তিকর তথ্য বা লাগামহীন কথা সমর্থকদেরও আহত করতে পারে।

বিজ্ঞাপন
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বিতর্কের মঞ্চ বেশ প্রতিকূল হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট এমনিতেই সমস্যায় থাকেন। তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় চলমান সমস্যা নিয়ে। কোভিড-১৯–এ দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু সামনে নিয়ে বিতর্কে দাঁড়াচ্ছেন ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বিতর্কের মঞ্চ বেশ প্রতিকূল হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট এমনিতেই সমস্যায় থাকেন। তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় চলমান সমস্যা নিয়ে। কোভিড-১৯–এ দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু সামনে নিয়ে বিতর্কে দাঁড়াচ্ছেন ট্রাম্প।

ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে প্রাইমারি নির্বাচনের টানা বিতর্ক পেরিয়ে আসতে হয় না। বাইডেন নিজের দলের প্রাইমারিতে সমান সমান অবস্থানে অন্যদের সঙ্গে বিতর্ক করে আসছেন। অন্যদিকে সাড়ে তিন বছর ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফা বলছেন। লাগামহীন কথা বলার জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। বিতর্কের মঞ্চে এমন লাগামহীন, তথ্য উপাত্তহীন বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ নেই। নিজের সমালোচনায় অসহিষ্ণু ট্রাম্প হালকা চামড়ার লোক হিসেবে পরিচিত।

নিকট ইতিহাসে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টরা প্রথম বিতর্কে ভালো না করারও উদাহরণ আছে। ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেও রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির সঙ্গে বিতর্কে হিমশিম খেতে হয়েছে। ২০০৪ সালে ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জন কেরির সঙ্গে প্রথম বিতর্ক ভালো যায়নি প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের।

বিতর্ক ভালো না করার মানে নির্বাচনে হেরে যাবেন—এমন নয়। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবারের নির্বাচনে সামান্য প্রভাবকেও অনেক বড় করে দেখা হচ্ছে। জো বাইডেন দলের প্রাইমারিতে মোকাবিলা করেছেন মাইকেল ব্লুমবার্গকে। মোকাবিলা করেছেন তাঁর রানিং মেট কমলা হ্যারিসকে। সব শেষে মঞ্চকে সদা উজ্জীবিত রাখা প্রবীণ ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে জো বাইডেন চমৎকার বিতর্ক করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ডোনাল্ড ট্রাম্প বাইডেন সম্পর্কে নানা কথা বলে আসছেন, বিদ্রূপ করছেন। ‘স্লিপি বাইডেন’ বলা থেকে শুরু করে বিতর্কের আগে বাইডেন ‘মাদক’ নিতে পারেন—এমন কটাক্ষও করছেন ট্রাম্প। বিতর্কের আগে বাইডেনের ড্রাগ টেস্ট করার কথাও বলেছেন ট্রাম্প। মঞ্চে ওঠার আগেই প্রতিপক্ষকে অমূলক কথা বলে ঘায়েল করার ট্রাম্পের এমন কৌশল তাঁর জন্য বুমেরাংও হতে পারে।

ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে চার দশকের অভিজ্ঞতা জো বাইডেনের। ৭৭ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে রাজনীতির বিষয়ভিত্তিক বিতর্কে বাইডেন খারাপ করবেন, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। যদিও ট্রাম্প বলছেন, বাইডেন কিছুই মনে রাখতে পারেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্টদের বিতর্কে এমন মনভোলা অবস্থাও বিরল নয়। ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বিতর্ক করছিলেন ওয়াটার মেন্ডেলের সঙ্গে। বিতর্কে রিগ্যানকে অনেকটা আত্মভোলা মনে হয়েছিল। তিনি যে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, এমন সমালোচনা উঠেছিল প্রতিপক্ষ শিবির থেকে।

পরের বিতর্কে দাঁড়িয়ে রিগ্যান প্রতিদ্বন্দ্বী মেন্ডেলকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘আমি জানাতে চাই, নির্বাচনী প্রচারে বয়সকে আমি কোন ইস্যু করছি না। আমার প্রতিপক্ষ যে অল্প বয়সী ও অনভিজ্ঞ, এ কথাও আমি রাজনৈতিক কারণে তুলে ধরছি না।’

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এমন চৌকস বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিতর্কের ইতিহাসে আলোচিত। ট্রাম্প-বাইডেনের বহু প্রতিক্ষিত বিতর্কে কোন ইতিহাস সৃষ্টি হয়—তা দেখার অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো সারা বিশ্বের রাজনীতিমনস্ক মানুষের।

মন্তব্য পড়ুন 0