default-image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি। নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে দেশটির ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় শিবিরই। এবারের প্রচারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন প্রশ্ন। এই প্রশ্নে উভয় শিবিরই নিজেকে কঠোর প্রমাণ করতে চাইছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চলমান জমানা তো চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিতই হয়ে আছে। এই লড়াই এখনো চলমান। বলা যায় নির্বাচন সামনে রেখে এ লড়াই বেশ জোরদারও হয়েছে। ফের ক্ষমতায় এলে চীনের প্রতি আরও কঠোর হবেন বলে এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। সঙ্গে এও বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জো বাইডেন ক্ষমতায় এলে চীনের সঙ্গে আবারও নরম ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আসলেই কি তা–ই?

২০১৮ সাল থেকে চীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফ্রন্টে মার্কিন প্রশাসন এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন একই ইস্যুতে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান বলে দেয়, আগের সেই অবস্থান ততটা কঠোর ছিল না। গত কয়েক সপ্তাহে চীনের শীর্ষ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে রয়েছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একজন পলিটব্যুরো সদস্যও। কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ১১টি চীনা কোম্পানিকে। উভয় ক্ষেত্রেই উইঘুরে চীনা কর্তৃপক্ষের চালানো নির্যাতনকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ দুইয়ে থেমে থাকেনি মার্কিন প্রশাসন। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একচেটিয়া কর্তৃত্বের দাবিকেও বেআইনি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে হংকং ও তাইওয়ান ইস্যু, চার চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের এবং ১৯৭৯ সালের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে চীনের কোনো কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও যুক্ত হয়েছে। এসব পদক্ষেপই দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনার মাত্রা সম্পর্কে জানান দেয়।

ওপরে বর্ণিত এই যাবতীয় পদক্ষেপই নেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায়, যিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের প্রতি ব্যক্তিগত আকর্ষণের কথা বহুবার নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্টের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের ভাষ্যমতে, যে উইঘুর প্রশ্নে হালে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তার প্রতি সম্মতি জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এত দিন পর্যন্ত বাণিজ্য প্রশ্ন এবং কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর নিজের দায় এড়ানোর লক্ষ্যে চীনের ওপর দায় এড়ানো ছাড়া দেশটির সঙ্গে রাজনৈতিক অন্য কোনো প্রশ্নে বিবাদেও জড়াতে চাননি তিনি। কিন্তু এখন নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ট্রাম্প ততই চীনবিরোধী হয়ে উঠছেন।

মার্কিন পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনকে অনেক আগেই নিজেদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই একই অবস্থান গত মাসে আরেকবার ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়ান, এফবিআই পরিচালক ক্রিস্টোফার রে ও অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার। তাঁদের ভাষ্যমতে, চীন তার আদর্শ ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাইছে। আর এ ক্ষেত্রে তাঁরা বিশ্বকে বাঁচাতে টোটকা হিসেবে হাজির করেছেন যুক্তরাষ্ট্রকে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন মনে করে, চীনের সঙ্গে আর আগের মতো সম্পর্ক রক্ষা করে চলা সম্ভব না। তাকে চাপে রাখতে হবে। না হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দয়ার ওপর থাকতে হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর নির্বাচনী প্রচারশিবির বর্তমানে এই একটি কথাই বারবার করে প্রচার করছে। এ ক্ষেত্রে মহামারিকালে কাজ হারানো নাগরিকদের দলে টানতে চাইছে তারা, ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল গত নির্বাচনে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান দিয়ে। তারা এও দেখাতে চাইছে যে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন চীনের প্রতি নমনীয় থাকবেন। তাঁদের যুক্তি, বারাক ওবামা প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বাইডেন চীনকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন।

এ ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর প্রচারশিবিরের যুক্তি হচ্ছে, জো বাইডেন জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে আনছেন। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন বাইডেন। বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টাদের একটি বড় অংশই সাবেক বারাক ওবামা প্রশাসনেও ছিলেন। ফলে বাইডেন চীনের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হবেন।

এর বিপরীতে বাইডেন শিবিরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রশ্নে চীনকে জবাবদিহির আওতায় আনবে। বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই অবস্থানটি পুনরুদ্ধার করা হবে। একই সঙ্গে চীনকে তার আচরণ পরিবর্তনের জন্য মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে একযোগে কাজ করা হবে। বর্তমান প্রশাসন প্রায় সব মিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। পাশাপাশি ফাইভ-জিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করা হবে, যাতে চীনকে মোকাবিলা করা যায়। এসব ক্ষেত্রে বর্তমান প্রশাসন এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বিশ্বদরবারে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন থেকে দুর্বল করে দিয়েছে।

মোদ্দাকথা হচ্ছে, আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুপক্ষই নিজেদের কঠোর অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে। এক পক্ষ নিজেদের নেওয়া বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ সবার সামনে তুলে ধরে জো বাইডেনকে নরম লোক হিসেবে প্রমাণে ব্যস্ত। আর বাইডেন বলছেন, তিনি নরম তো ননই, চীনকে মোকাবিলায় বেশি দক্ষ বরং। এ ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে চীনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ দ্রুত না নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা বাণিজ্য যুদ্ধের ফলাফল কী—এই প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগ আছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুনর্নির্বাচনে সহায়তার শর্তেই বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছিল।

এই যখন অবস্থা, তখন মার্কিন জনগণ কীভাবে দেখছে বিষয়টিকে? মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইউএসএ টুডের করা সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, চীনকে মোকাবিলায় বাইডেনের ওপর আস্থা রেখেছেন অধিকাংশ ভোটার। জরিপে অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৫১ শতাংশই এ ক্ষেত্রে বাইডেনকে যোগ্য লোক মনে করছেন। বিপরীতে ট্রাম্পের ওপর আস্থা রেখেছেন ৪১ শতাংশ ভোটার। আর যদি চীনের মত বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলেও পিছিয়ে আছেন ট্রাম্প। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকলে তাদের জন্য সুবিধা হয়। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প জমানায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়েছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে বিশ্বের দুই বড় শক্তি। বর্তমানে যাবতীয় ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এ দুই দেশের কোনো না কোনো উপস্থিতি দৃশ্যমান। এ অবস্থায় দুই দেশের দ্বন্দ্ব সারা বিশ্বের জন্যই চিন্তার কারণ। এ দ্বন্দ্ব যত বাড়বে বাংলাদেশসহ ছোট-বড় দেশগুলোর জন্য সংকট তত বাড়বে। ফলে এ দ্বন্দ্বের সুরাহা না হলেও একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা সবার কাম্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা শুধু আসন্ন নির্বাচনে জয়ের প্রশ্নে চীন ইস্যুকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন, যা প্রায় অপরিবর্তনীয় অবস্থায় গিয়ে ঠেকছে। ফলে আগামী নির্বাচনে যে-ই ক্ষমতায় আসুন না কেন, তাঁর পক্ষে চীনের সঙ্গে আপাতসহজ সম্পর্ক স্থাপনও এমনকি কঠিন হয়ে পড়ছে। এটি যত কঠিন হবে, বিশ্ব তত সংকটে পড়বে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0