অনুপ কুমারের মরদেহ নিয়ে টানাটানি এবং শেষকৃত্য হয়ে যাওয়ার পর অনেকটা উদাস মনে সকালে লিভিং রুমে বসে ছিলাম, কোন কাজ করার ইচ্ছে ছিল না। অনুপের দিদি আলপনা গুহের একই অবস্থা। মাঝেমধ্যে একে–ওকে কল দিচ্ছিলাম। ড. নুরুন নবীর সঙ্গে অনুপকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বললাম। মনটা কিছুক্ষণ শান্ত হলো। খানিক বাদে একটি কল এল। অপরিচিত নম্বর, অন্য স্টেট থেকে, ধরলাম।
অন্য প্রান্ত থেকে বললেন, আমার নাম হিরণ্ময় বিশ্বাস। আপনার ফোন নম্বরটি আমি ফিউনারেল হোম থেকে অনেক কষ্টে পেয়েছি, তাঁরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে আমায় নম্বরটি দিয়েছে। কণ্ঠস্বর শুনে মনে হলো ভদ্রলোক বয়স্ক। তিনি আবার বললেন, আমি একটি খুব খারাপ সংবাদ শুনে আপনার কাছে কল দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি ফিউনারেল হোমের নম্বর পেলেন কোত্থেকে? বললেন, আমার কাছে এক ভদ্রলোক দুঃসংবাদটি দিয়ে ফোন নম্বরটি দিয়েছেন।
ও, আচ্ছা। ভদ্রলোক আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। বললাম, ফিউনারেল হোম নম্বর দিল, নাম দেয়নি? বললেন, না।
আবার জিজ্ঞাসা করলাম, দুঃসংবাদটা কি? তিনি বললেন, আমার পরিচিত এক ছোট ভাই মারা গেছেন। সরি, যিনি মারা গেছেন, তাঁর নাম কি? বললেন, ‘শিতাংশু গুহ’। আমার তো আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। কনফার্ম হওয়ার জন্য আবার প্রশ্ন করলাম, ‘শিতাংশু গুহ’ মারা গেছেন। বললেন, হ্যাঁ। নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল, কারণ নিজের মৃত্যু সংবাদ তো সবার শুনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় না?
হিরণ্ময় বিশ্বাসকে কি আমি চিনি? মনে পড়ল, জগন্নাথ হলে আমাদের একজন শিক্ষকের নাম ছিল ‘হিরণ্ময়’, আমরা বলতাম, ‘হিরণ্ময় স্যার’, টাইটেল ভুলে গেছি। ভাবলাম, স্যার এখনো বেঁচে আছেন? হিসাব করে দেখলাম, তাই যদি হয়, স্যারের বয়স এক শ’র কাছাকাছি!
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি কখনো ঢাকা ছিলেন?
বললেন, হ্যাঁ।
জিজ্ঞেস করলাম, কখন?
বললেন, ১৯৬৩ সালে আমি ঢাকা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করি।
–ঢাকা ইউনিভার্সিটি?
–বললেন, না, বুয়েট। যোগ করলেন, বুয়েট থেকে ‘এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ পাশ করি।
–বাঁচা গেল, আমাদের হিরণ্ময় স্যার নন!
তিনি বলেছেন, ‘আমরা ১৩ জন তখন বুয়েট থেকে পাশ করে বের হই। তারপর জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করি। দীর্ঘদিন ইপিএ (এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সি) চাকরি করে এখন রিটায়ার লাইফ। থাকি গ্রিনস্প্রিং রিটায়ারমেন্ট হোমে। বয়স ৮০। তিনি তাঁর রুমের সরাসরি ফোন ও সেলফোন নম্বর দিলেন। বোঝা গেল, এটি অবস্থাসম্পন্ন মানুষের বৃদ্ধাশ্রম?
জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার স্ত্রী? বললেন, তিনি আমেরিকান, থাকেন লাসভেগাসে, তাঁর সঙ্গী দুটি কুকুর।
প্রশ্ন করলাম, ঢাকা ছেড়েছেন কবে?
বললেন, ১৯৬৪ সালে ঢাকা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জে ভয়াবহ দাঙ্গার পর আমি ঢাকা ছেড়ে কলকাতা চলে যাই।
জানতে চাইলাম, শিতাংশু গুহকে চেনেন কীভাবে? বললেন, আমার বন্ধু সাধনময় গুহের ছোট ভাই শিতাংশু। একসময় শিতাংশু নিউইয়র্কে থাকত। সাধনময় গুহ এবং ওঁর স্ত্রী সন্ধ্যা গুহ নিউজার্সির রার্টসগার্টসে থাকে।
হিরণ্ময় আমায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি ওদের চেনেন? ওদের টেলিফোন নম্বর দিতে পারবেন?
বললাম, না, চিনি না, তবে টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে দিতে চেষ্টা করব।
হিরণ্ময় এর মধ্যে কয়েকবার আমার নাম জানতে চেয়েছেন, আমি এড়িয়ে গেছি। এবার বললাম, আমার নাম শিতাংশু গুহ। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আপনি কল দিয়েছেন, আমি মরিনি। তাঁর তেমন ভাবান্তর লক্ষ্য করিনি।
হিরণ্ময় বিশ্বাস বললেন, জানেন, সন্ধ্যা গুহের ছোট মেয়েটি যখন হয়, আমি ওঁকে কোলে করে হাসপাতাল থেকে এনেছি। জিজ্ঞাসা করলাম, নাম কি? বললেন, মনে নেই, তবে তিনি ইপিএতে চাকরি করেন এবং স্বামীর নাম, ঠিক বলতে পারলেন না, এটুকু বললেন, পদবি ‘বিশ্বাস’। আরও বললেন, রোহিণী বিশ্বাসের দুই মেয়ে, ওঁরা সম্ভবত নিউইয়র্কে থাকে। রোহিণী বিশ্বাসকে তা আমার জানা হয়নি।
ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, কে মারা গেছে?
বললাম, আমার স্ত্রীর ইমিডিয়েট ছোট ভাই অনুপ কুমার দাস।
নৃত্যশিল্পী অনুপ কুমার দাসের মরদেহ ‘ভিউইং’ ছিল বুধবার, দাহ বৃহস্পতিবার। আড্ডা’র (অনুপ দাশ ড্যান্স একাডেমি) শিক্ষার্থীরা এই মর্মে একটি ফ্লায়ার সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে। তাতে ফিউনারেল হোমের নম্বর, ঠিকানা ছিল। কারও নাম ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে সেটি বেশ প্রচার পেয়েছে। ভদ্রলোক ঠিক কীভাবে ভাবলেন, শিতাংশু গুহ মারা গেছেন, জানি না। হয়তো শিতাংশু গুহের শ্যালক মারা গেছেন, এই সংবাদ ভাসতে ভাসতে এক সময় ‘শ্যালক’ অংশটি বাদ পড়ে যায় এবং তাঁর কাছে সংবাদ পৌঁছে, শিতাংশু মারা গেছে!
হীরণ্ময় যেই শিতাংশুর জন্য শোকাতুর ছিলেন, আমি সেই শিতাংশু না হলেও, তাঁর আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। তার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছে। বয়স্ক মানুষ, কথা বলতে ভালোবাসেন। কেউ যদি সাধনময় গুহ/সন্ধ্যা গুহ বা এঁদের পরিবারের খোঁজ জানেন, জানালে খুশি হব। ভদ্রলোককে সরাসরি ফোন দিলে তিনি খুশি হবেন (হিরণ্ময় বিশ্বাস সেল: ৫৭১-৪৯৪-৬১৩৬/ রুম ৭০৩-২৭০-৫৯১৯)। আমাকেও জানাতে পারেন (৬৪৬-৬৯৬-৫৫৬৯)। সবশেষে জানাই, অনুপ কুমার দাশের শ্রাদ্ধ মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, বিকেলে।
ইঞ্জিনিয়ার হলেও ভদ্রলোক রসিক আছেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে তিনি বললেন যে, কে যেন লিখেছেন ——মরিয়া প্রমাণ করিল —- ইত্যাদি। বললাম, দাদা, রবীন্দ্রনাথের গল্প ‘কাদম্বিনী’, যেখানে কবিগুরু বলেছেন, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। ঠিক তেমনি ‘শিতাংশু গুহ, আপনার ফোন ধরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’! বললাম, আবারও আপনাকে ধন্যবাদ, আমি সত্বর আবার আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0