default-image

বর্তমান বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এখনো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নির্বাচনের দিকে তাই পুরো বিশ্বেরই নজর থাকে। এবারও স্বাভাবিকভাবে এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। নির্বাচনে জয়ের পর বিজয়ী প্রার্থী ও ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টকে দ্রুততম সময়ে অভিনন্দন বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন বিশেষত মার্কিন মিত্র দেশগুলোর নেতারা। এখানেই এবার গোল বেঁধেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যকার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হন, তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বনেতারা। এই উদ্বেগে আরও জ্বালানি দিচ্ছে ফল নিয়ে তৈরি হওয়া সংশয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। এবারের নির্বাচনে জোর লড়াই হচ্ছে। আর এ কারণেই চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে দুই প্রার্থীর কাউকে অভিনন্দন জানানোটা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, গেলবারের মতো এবারও হয়তো মোট ভোটে একজন এগিয়ে থাকলেও অন্য কেউ ইলেকটোরাল ভোটের জোরে প্রেসিডেন্ট হয়ে যেতে পারেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণা নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা না থাকায় গেলবার এ নিয়ে তেমন গোল বাঁধেনি। কিন্তু এবার জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই শঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য। নির্বাচনী প্রচারের একেবারে শুরু থেকেই তিনি ডাকযোগে ভোটে জালিয়াতি হবে বলে দাবি করে আসছেন। অথচ করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার সর্বোচ্চসংখ্যক ডাকযোগে ভোট পড়েছে। এই ডাকযোগে ভোটের ফল আবার সব অঙ্গরাজ্য একসঙ্গে ঘোষণা করবে না। কোনো কোনোটিতে এর ফল আসতে সপ্তাহ গড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন
অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই।
জ্যঁ–ক্লদ জুয়েঙ্কা, ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতারা রীতিমতো সংশয়ে রয়েছেন। উত্তর ইউরোপীয় এক নেতার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘এত গুরুত্বপূর্ণ এক মিত্র দেশের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে আপনি দ্রুততার সঙ্গে অভিনন্দন জানাতে চাইবেন। কিন্তু এবার এটি ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপনি ভুল করতে পারবেন না। ফলে দ্রুত বার্তা পাঠানো সম্ভব হবে না। নির্বাচনের দিন পার হওয়ার পরও আমাদের হয়তো অপেক্ষা করতে হবে।’

এবারের নির্বাচনের পরিস্থিতি অনেকটা ২০০০ সালের নির্বাচনের মতো। সেবার যুক্তরাষ্ট্রের কিছু টিভি চ্যানেলে জর্জ ডব্লিউ বুশকে বিজয়ী বলে প্রচার করার পরপর জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা জর্জ বুশকে অভিনন্দন জানান। কিন্তু এরও পাঁচ সপ্তাহ পর সুপ্রিম কোর্ট ওই নির্বাচনের বিজয়ী ঘোষণা করে। রায়ে জর্জ বুশকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তত দিনে অনেকেই তাঁদের অভিনন্দন বার্তা ফিরিয়ে নেন। অনেকে নীরব থাকার কৌশল নেন।

যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও জটিলতা হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটন মোট ভোট বেশি পেলেও ইলেকটোরাল ভোট বেশি পাওয়ায় নির্বাচনে বিজয়ী হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবারও তেমন কিছু হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ফলে বিশ্বনেতাদের পক্ষে সাবধানী না হয়ে আর উপায় নেই।

ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যঁ-ক্লদ জুয়েঙ্কা জার্মানির এআরডি-টিভিকে বলেন, অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই জটিল ও সংবেদনশীল। নির্বাচনের সুস্পষ্ট ফল আসতে হবে। একই সঙ্গে উভয় প্রার্থীর ফল মেনে নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এবার উভয়েই নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারেন

এ বিষয়ে ইউরোপের আরেকটি দেশের শীর্ষ নেতার প্রধান উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি খুবই জটিল ও সংবেদনশীল। নির্বাচনের সুস্পষ্ট ফল আসতে হবে। একই সঙ্গে উভয় প্রার্থীর ফল মেনে নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এবার উভয়েই নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘ধরুন বাইডেন জিতলেন, আপনি তাঁকে অভিনন্দন জানান; সমস্যা নেই। কিন্তু ভুলেও ট্রাম্পকে সমবেদনা জানাতে যাবেন না। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী তিনি আগামী বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আছেন।’

প্রতিবেশী কানাডা স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচনের দিকে কড়া নজর রাখছে। অটোয়ার একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সুস্পষ্ট ফল আসা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে। পরিস্থিতি কেমন হবে তা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও কোনো একজন প্রার্থীকে শেষ পর্যন্ত ছাড় দিতে হতে পারে। কিন্তু যদি কেউ ছাড় না দেয়, তাহলে নিজেদের করণীয় নিয়ে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। সূত্রটি জানায়, ‘আমরা যত দিন প্রয়োজন, তত দিন পর্যবেক্ষণ করব।’

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ব্রিটেনের সাবেক রাষ্ট্রদূত কিম ডারোচ সরাসরিই বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না কেউ এই নির্বাচনের ফল নিয়ে আগাম মন্তব্য করবে। আমি আশা করি তারা চুপ থাকবে এবং নিজেদের ভূমিকা রাখার মুহূর্ত আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0