বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উইসকনসিনে জ্যাকব ব্ল্যাক নামের একজন কৃষ্ণাঙ্গ গত সপ্তাহে পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হলে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। গত মে মাসে মেনিয়াপোলিসে জর্জ ফ্লয়েড পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার পর আন্দোলনের ঢেউ সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্ল্যাক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ‘ডিফান্ড পুলিশ’ স্লোগান আরও বেশি করে উচ্চারিত হচ্ছে। বড় বড় নগরীতে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের সংগঠকেরা আবারও রাস্তায় নেমে আসেন।

২৮ আগস্ট মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ ড্রিম’ বক্তব্যের বর্ষপূর্তি নিয়ে বড় বড় নগরীতে সমাবেশ হয়েছে। এসব সমাবেশের অগ্রভাগে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক আন্দোলনের নেতাদের উপস্থিতি থাকে। ডেমোক্রেটিক প্রধান নগরীগুলোতে এসব আন্দোলনের সুযোগে সহিংস ঘটনাও ঘটে থাকে। পুলিশের তহবিল কর্তনের ডাকের কারণে সর্বত্রই পুলিশের সঙ্গে নগর কর্তৃপক্ষের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। নিউইয়র্কসহ বহু নগরীতে পুলিশের ওভারটাইম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সহিংসতা ও অপরাধ বেড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায়। এর পুরো সুবিধা নিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেহেতু এসব আন্দোলনকারী ব্যাপকভাবে ডেমোক্র্যাট সমর্থক। ফলে ট্রাম্প সহজেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁর বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারছেন।

default-image

যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে প্রকাশ্য না হলেও, চাপা বর্ণবিদ্বেষ বেশ শক্তিশালী। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশ মনে করে, দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এসব কালো গাত্রবর্ণের লোকজন দায়ী। দায়ী অভিবাসী হিসেবে আমেরিকায় থাকা নানা গ্যাং। এসব বর্ণবাদী পূর্ব ধারণা শুধু যে অল্প শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গদের, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণেই কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়—এমন অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে নেওয়া সম্ভব নয়। জো বাইডেন ডেমোক্রেটিক দলের মধ্যে মধ্যপন্থী লোক হিসেবে পরিচিত। এমনিতেই দলের অতি উদারনৈতিক পক্ষের পূর্ণ আস্থায় তিনি নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী বহু লোকজনের ভোটাধিকারই নেই। অপরাধে দণ্ডিত হয়ে ভোটাধিকার হারানো এসব বহু লোকজনকে আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে ঠিকই। যদিও জো বাইডেনের নির্বাচিত হওয়া নিয়ে এঁদের মধ্যে তেমন কোনো উত্তেজনা নেই। জো বাইডেনকে এসব লোকজন আরেকজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান হিসেবেই মনে করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে গত এক দশকে নাগরিক আন্দোলনে একটি উদারনৈতিক জাগরণ ঘটেছে। এ জাগরণে উঠে আসা লোকজন দেশটির উদারপন্থী ডেমোক্র্যাটদের চেয়েও উদারনৈতিক। এসব লোকজন জো বাইডেনের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মতো কসরত করবেন কিনা, এ নিয়ে দলের মধ্যেই সন্দেহ আছে। এসব লোকজন ভোটকেন্দ্রেই যাবেন না অনেকে। যদিও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমত জরিপে যোগ দেবে। এতে করে নির্বাচনের ফল ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপক্ষে যাবে, এমন মনে করারও কোনো কারণ নেই।

উইসকনসিনে আবার অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর কিছু ডেমোক্র্যাদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সব সামাজিক এবং নাগরিক অস্থিরতার দায় রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে সূক্ষ্মভাবে হলেও ডেমোক্র্যাটদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রিপাবলিকান সমর্থক ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তৃতা শুনলে মনে হবে, সব সহিংসতাই হচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের নির্দেশে। দলের মনোনয়ন গ্রহণ করে দেওয়া বক্তৃতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, জো বাইডেনকে ভোট দেওয়া মানে দেশের জনগণের নিরাপত্তা হুমকিতে ফেলা।

যুক্তরাষ্ট্রে গত এক দশকে নাগরিক আন্দোলনে একটি উদারনৈতিক জাগরণ ঘটেছে। এ জাগরণে উঠে আসা লোকজন দেশটির উদারপন্থী ডেমোক্র্যাটদের চেয়েও উদারনৈতিক

ট্রাম্প বলেছেন, ভুল করার কোনো কারণ নেই, জো বাইডেনকে ক্ষমতায় বসালে বাম নৈরাজ্যবাদীরা পুলিশের তহবিল কর্তন করবে। তাঁরা ফেডারেল আইন প্রণয়ন করে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে। সব নগরীকে পোর্টল্যান্ডের মতো অস্থিরতার নগরীতে পরিণত করবে বলে ট্রাম্প মনোনয়ন গ্রহণের পরদিন এসব কথা বলেছেন।

ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য হিসেবে পরিচিত রাজ্যগুলোতে গত মাসেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বেশ পিছিয়ে ছিল। নির্বাচন ঘনিয়ে আসতে আসতে এসব রাজ্যের জনমতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রান্তিক শ্বেতাঙ্গ লোকজন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নানা কথাবার্তায় আগে বিরক্তি প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের ভয় দেখানোর রাজনীতিতে এ দলটিকে সহজেই বিভ্রান্ত করা সম্ভব বলে ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদরাও মনে করছেন।

জো বাইডেনকে ক্ষমতায় বসালে বাম নৈরাজ্যবাদীরা পুলিশের তহবিল কর্তন করবে। তাঁরা ফেডারেল আইন প্রণয়ন করে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
default-image

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভয়ের রাজনীতির শক্ত জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন জো বাইডেন। এমএসএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাইডেন বলেছেন, ট্রাম্প চাচ্ছেন সহিংসতা বিরাজ করুক। ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট, তখনই এসব সহিংসতা এবং অস্থিরতা চলছে। এসবের দায় তো দেশের প্রেসিডেন্টেরই নেওয়ার কথা। বাইডেন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব অস্থিরতা প্রশমনে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে আরও উসকে দিচ্ছেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সময় ডেমোক্রেটিক দলের কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করা মাইক লাকস বলেছেন, জো বাইডেন রাজনৈতিকভাবে নিজেকে পৃথক করতে সক্ষম হয়েছেন। একজন মধ্যপন্থী হিসেবে তাঁর এ মাঝামাঝি অবস্থান নির্বাচনে সুবিধা দেবে বলে তিনি মনে করেন।

সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টিকারীদের প্রতি জো বাইডেনের সমর্থন আছে, এ কথা কৌশলে চাপিয়ে দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসবের দায় ডেমোক্রেটিক দলের ওপর চাপিয়ে রিপাবলিকান দল নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে ব্যাপক টিভি প্রচারণা চালাচ্ছে। আইওয়া, ক্যানসাস, আলাবামাসহ স্থানীয়ভাবে যেসব রিপাবলিকান জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন পদে লড়ছেন, তাঁদের সবার একই প্রচারণা। অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের জন্য ডেমোক্র্যাটরা দায়ী।

সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভোটারদের মধ্যে এ টানা প্রচারণা কী ভূমিকা রাখবে, এ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নির্বাচনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নর্থ ক্যারোলাইনার ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ মরগান জ্যাকসন বলেছেন, এটা ঠিক রিপাবলিকান দল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি, কর্মসংস্থান এবং জনস্বাস্থ্যের আবেদন রাজনৈতিকভাবে বেশি শক্তিশালী।

জো বাইডেন রাজনৈতিকভাবে নিজেকে পৃথক করতে সক্ষম হয়েছেন। একজন মধ্যপন্থী হিসেবে তাঁর এ মাঝামাঝি অবস্থান নির্বাচনে সুবিধা দেবে
ডেমোক্রেটিক দলের সাবেক কৌশলবিদ মাইক লাকস
default-image

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কলেজ পেরোনো লোকজন সহজেই রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রভাবিত না হওয়ার কথা। এঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্ধ সমর্থকও নন। যদিও এঁদের মধ্যে দোদুল্যমান একটি অংশ, যারা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সব অহংকার এখন অন্যদের কারণেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের ব্যাপক আগমনকে এঁরা নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করেন। সব সময় প্রকাশ্য না হলেও এঁদের উল্লেখযোগ্য লোকদের মধ্যে কালোদের নিয়ে চাপা বিদ্বেষ আছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের যত চাপ দেন, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের লোকজনকে নৈরাজ্যবাদী বলে যতই গালাগালি করেন, ততই এ শ্বেতাঙ্গ ট্রাম্প সমর্থকেরা উজ্জীবিত হয়। ট্রাম্প নিজেই এটা জানেন, এঁদের উদ্দীপ্ত রাখতে পারলেই এবারও তিনি পার পেয়ে যাবেন।

অপরদিকে ৪৭ বছরের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জো বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মার্কিন সিনেটে তাঁর দীর্ঘ নৈতিক অবস্থান সব সময়ই প্রশংসা পেয়ে আসছিল। একজন ভালো রানীতিক হিসেবে তিনি সব পক্ষকে সামাল দেওয়ার কাজ করেন। দেশের জনগণকে বিভেদ নয়, ঐক্যবদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা দেখেন। তাঁর এ বার্তা রাজনৈতিকভাবে খুবই শক্তিশালী বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

আসছে তিন নভেম্বরের ভোটের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রান্তিক লোকজন ঐক্যের আহ্বানে নয়, বিভেদের আহ্বানে সাড়া দেবে এমন প্রত্যাশা থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মাঠ চষে বেড়ানো শুরু করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন