default-image

নির্বাচন শেষ হওয়ার চার দিন পর ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন ভোট গণনায় সুস্পষ্টভাবে নিজের অগ্রগতি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সামান্য ব্যবধানে হলেও তিনি অ্যারিজোনা, জর্জিয়া ও নেভাদায় ভোট গণনায় এগিয়ে গেছেন। ভোট চুরির অভিযোগ তুলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোট পুনর্গণনার দাবি তুলেছেন এবং আদালতের সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। নির্বাচনে কে জয়ী হলেন, সে কথা সুনিশ্চিতভাবে জানতে তাই আরও বিলম্ব হবে।

কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচন ঠিক এভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল না। দেশের প্রায় সব প্রধান জরিপ সংস্থা গভীর আস্থার সঙ্গে জানিয়েছিল, জো বাইডেন শুধু জিতবেন তা–ই নয়, বিপুল ব্যবধানে জিতবেন। তারা এ কথাও জানিয়েছিল, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে ও প্রতিনিধি পরিষদে তাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে। বলা হচ্ছিল এক ‘নীল ঢেউ’ আসছে, যা রিপাবলিকানদের সুনামির মতো উড়িয়ে নেবে। নীল হলো ডেমোক্র্যাটদের প্রতীকী রং। আর লাল রিপাবলিকানদের প্রতীকী রং।

বিজ্ঞাপন

বাস্তবে তা হয়নি। হোয়াইট হাউস হারাতে বসলেও রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, প্রতিনিধি পরিষদ ফিরে না পেলেও ডেমোক্র্যাটদের একাধিক আসন ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের অবস্থা সুদৃঢ় করতে পেরেছে এবং রাজ্য পর্যায়ে আরও একটি গভর্নরশিপ দখলে এনেছে। এটি কোনো নীল ঢেউ নয়, বরং কোনো কোনো ডেমোক্র্যাট স্বীকার করছেন, এক ‘লাল ঢেউ’ তাদের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ছে।

ট্রাম্পের লাজুক সমর্থক

জরিপ এতটা ভুল হওয়ার পেছনে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ স্বীকার করছেন, তাঁরা নীরব ও লাজুক ট্রাম্প সমর্থকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হননি। এই লাজুক সমর্থক হলেন সেই সব প্রধানত শ্বেতকায় ভোটার, যাঁরা মুখে নিজেদের ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিতে বিড়ম্বিত, কিন্তু ভোট বাক্সের গোপনীয়তায় নির্দ্বিধায় তাঁকে ভোট দিয়েছেন। এর পেছনে যে বর্ণবাদী মনোভাব কাজ করছে, তেমন অনুমান একদম অমূলক না–ও হতে পারে। ‘পলিটিকো’ একজন জরিপকারীর উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ব্যালটে ট্রাম্পের নাম থাকার মানেই হলো মানুষ তাঁর দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।

ট্রাম্পের সাফল্যের অন্য কারণ, তিনি ধরতে পেরেছিলেন কোভিড-১৯ নয়, অর্থনীতিই হবে এই নির্বাচনের প্রধান চালিকা শক্তি। সিএনএনের ভোটফেরত মানুষের অভিমত অনুসারে, তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল করোনাভাইরাস নয়, অর্থনীতি। শুধু রিপাবলিকান নয়, ডেমোক্রেটিক ভোটারদের মধ্যেও এই মনোভাব প্রবল। ডেমোক্রেটিক সমালোচনা সত্ত্বেও ট্রাম্প কোভিড–১৯ উপেক্ষা করে অবিলম্বে অর্থনীতি সচল করার দাবি তুলেছিলেন। সেটি কাজে লেগেছে।

বাইডেন-হ্যারিস জুটিকে অতি বামপন্থীদের হাতের পুতুল হিসেবে চিহ্নিত করার যে রণকৌশল তিনি অনুসরণ করেন, তাও কাজে লেগেছে। ফ্লোরিডার কিউবা ও ভেনেজুয়েলা থেকে আগত অভিবাসীরা তাঁর সে কথায় বিশ্বাস করেছে, ভোটের ফলাফল থেকে তা স্পষ্ট। এই নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজেকে ‘আইন ও শৃঙ্খলার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সে বুদ্ধিও কাজে লেগেছে। দেশজুড়ে পুলিশ ও বর্ণ বিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের ফলে ভাবা হয়েছিল এই ঢেউয়ের প্রভাবে ট্রাম্প পর্যুদস্ত হবেন, প্রগতিশীল ও বামপন্থী প্রার্থীরা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থা অর্জন করবেন। সে কথা সত্য প্রমাণিত হয়নি। যেসব ডেমোক্রেটিক প্রার্থী পুলিশের জন্য বাজেট বরাদ্দ হ্রাসের প্রস্তাব করেছেন অথবা সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সবার জন্য সরকারি খরচে স্বাস্থ্যসেবা দাবি করেছেন, তাঁরা নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ‘গভীর নীল’ রাজ্য ছাড়া অন্যত্র সুবিধা করতে পারেননি।

ডেমোক্রেটিক নেতৃত্ব এখন খোলামেলাভাবেই নির্বাচনে আংশিক বিপর্যয়ের জন্য স্যান্ডার্স বা আলেকজান্দ্রিয়া ও কাসিও-কর্টেজের মতো বামপন্থী নেতাদের দুষছেন। তাঁরা এখনো আশায় আছেন, জর্জিয়ার দুটি সিনেট আসন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। এই অঙ্গরাজ্যে প্রার্থীদের কেউ ৫০ শতাংশের অধিক ভোট না পাওয়ায় দুটি সিনেট আসনেই আগামী ৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণ হবে। এখনো সিনেটে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া সম্ভব, সে কথা উল্লেখ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতা জেমস ক্লাইবার্ন সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছেন, জর্জিয়ার নির্বাচনের আগে কেউ যেন পুলিশি বাজেট বাতিল করা বা সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার দাবি তুলে ঝামেলা না পাকায়। তাহলে আর ওই দুই আসন ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প না থাকলেও ট্রাম্পইজম থাকবে

এই নির্বাচনের অপ্রত্যাশিত ফলাফল থেকে এ কথা স্পষ্ট যে আমেরিকা এখন গভীরভাবে বিভক্ত একটি দেশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের আসন ধরে রাখতে পারুন বা না–ই পারুন, ‘ট্রাম্পইজম’ এখন একটি অনিবার্য বাস্তবতা। প্রায় ৭ কোটি মানুষের ভোট পেয়েছেন তিনি (বাইডেন পেয়েছেন সাড়ে ৭ কোটি), যা সব সময়ের জন্য একটি রেকর্ড। এই ভোটাররা ট্রাম্পের প্রতি অতি অনুগত, স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো নির্বাচনকে তাঁরা প্রভাবিত করতে সক্ষম। ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এই সমর্থকদের ঘাড়ে ভর করে ট্রাম্প ও ট্রাম্পইজম আগামী চার বছর রিপাবলিকান রাজনীতিকে নানাভাবে প্রভাবিত করবে। ইতিমধ্যে শোনা যাচ্ছে তিনি হয়তো ২০২৪ সালে আবার নির্বাচনে দাঁড়াবেন। বয়সের কারণে তিনি যদি শেষ পর্যন্ত মত বদলান, তাঁর পুত্র-কন্যাদের একজন যে সে চেষ্টা করবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মাঠপর্যায়ে দলীয় সমর্থকদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা অপ্রতিরোধ্য, তাঁকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা যে সম্ভব নয়, বৃহস্পতিবার তার একটি সহজ প্রমাণ মিলেছে। ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ পুত্র ট্রাম্প জুনিয়র অভিযোগ করেছিলেন, কোনো শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান নেতা এই দুঃসময়ে তাঁর পিতার পক্ষাবলম্বন করছেন না। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে পুনর্নির্বাচিত সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম ফক্স টিভিতে এসে জানালেন, তিনি ট্রাম্পের ভোট চুরির অভিযোগ বিশ্বাস করেন। তিনি এ কথাও বললেন, এত ব্যাপক ভোট কারচুপি হয়েছে যে পেনসিলভানিয়ায় রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত আইন পরিষদের উচিত হবে ভোটের ফলাফল উপেক্ষা করে তাদের পছন্দমতো ‘ইলেকটর’ মনোনীত করা। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক যে এমন অগণতান্ত্রিক কথা প্রকাশ্যে বলতে পারলেন, তার একমাত্র কারণ ‘ট্রাম্পবাদ’ এখনো সজীব ও সক্রিয়।

মন্তব্য পড়ুন 0