default-image

আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণসহ নানা কারণে ভিন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের নির্বাচন। অতীতের মতো নির্বাচনী প্রচারে উত্তেজনা না থাকলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব নির্বাচনে বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আগাম ও ডাকযোগে ভোট দেওয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশি মার্কিনদের মধ্যেও অতীতের তুলনায় এবার বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। শুধু নিউইয়র্ক নয়, এর বাইরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও ভাবছেন নির্বাচন নিয়ে। এবার কথা হয় জর্জিয়া, টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় বসবাসরত বাংলাদেশি মার্কিনদের সঙ্গে।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট স্টেট সিনেটর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শেখ রহমান। তিনি বলেন, তাঁর এলাকায় ট্রাম্পের চেয়ে বাইডেন ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিকদের মধ্যে জো বাইডেন তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। নারী ভোটারদের কাছে ট্রাম্প পিছিয়ে আছেন।

শেখ রহমান বলেন, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের বিজয় সহজ হয়েছিল প্রবীণ শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনের কারণে। এবার তাদের অনেকেই ট্রাম্পের কাছ থেকে সরে এসেছেন। বাইডেন ভোট বেশি পাবেন। তবে ইলেকটোরাল ভোটে রিপাবলিকানদের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশি কমিউনিটির ভোটারদের প্রসঙ্গে স্টেট সিনেটর শেখ রহমান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে এবারও অনেক বাঙালি আদমশুমারিতে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি। আমরা এত বোঝানোর পরও কমিউনিটির মানুষকে ঠিক সেভাবে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব হয়নি। আমরা এ দেশে এসেও কথা বেশি বলে বিভক্ত জাতি হয়ে থাকলাম।’

কথা হয় পেশায় আইটি ইঞ্জিনিয়ার রম্য লেখক ও কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট আবু লিয়াকত হোসেনের সঙ্গে। তিনি ১৯ বছর ধরে জর্জিয়ার গুনেটে বসবাস করছেন। আবু লিয়াকত বলেন, এই শহরকে রুড রেড বলা হতো। তাদের এলাকায় ৩৫ শতাংশ অভিবাসী ভোটার রয়েছে। এসব মানুষকে আগে তেমন একটা ভোট দিতে দেখা যায়নি। এবারই প্রথম হিস্পানিক, কালো কিংবা অন্যান্য অভিবাসী মানুষকে দল বেঁধে লাইন দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেখা গেছে। ছয় দিন টানা লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে ভোট দিতে তিনি দেখেছেন। এরই মধ্যে সাড়ে তিন লাখ মানুষ ভোট দিয়েছে। এখন জর্জিয়াকে টস আপ রাজ্য বলা যায়। অভিবাসী মানুষ এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এতে ভোটের হিসাবও এবার পাল্টে যেতে পারে।

জর্জিয়ায় বসবাসর বাঙালি ব্যবসায়ী জয়ন্ত রায় নিজেকে রেজিস্টার্ড ডেমোক্র্যাট বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ১৬টি ইলেকটোরাল ভোটের রাজ্য জর্জিয়া রিপাবলিকান দলের রাজ্য হিসেবেই পরিচিত ছিল। এখানে বিপুলসংখ্যক বয়স্ক মানুষের বাস। এ রাজ্যে পিছিয়ে পড়া কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী এবারের নির্বাচনে বেঁকে বসার আভাস দিচ্ছে। তবে এখানে জনমত জরিপে খুবই কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে দুই প্রার্থীকে। কোনো কোনো জনমত জরিপে বাইডেন এক পয়েন্টে এগিয়ে থাকায় ট্রাম্প শিবিরে এ রাজ্যের ফল নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে টেক্সাসের বৃহত্তম শহর হিউস্টনে আছেন প্রচুর বাংলাদেশি। ইতিহাস বলে, মেক্সিকো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে এর উৎপত্তি। একে রিপাবলিক অব টেক্সাসও বলা হয়। সেখানকার ভোটের হালচাল নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশি কমিউনিটির বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই অঙ্গরাজ্যে প্রতি সবার দৃষ্টি রয়েছে। এই অঙ্গরাজ্যে ইলেকটোরাল কলেজের সংখ্যা ৩৮।

কথা হয় এই রাজ্যে বসবাসরত আবাসন ব্যবসায়ী, ফোবানার বর্তমান সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট শাহ হালিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সব ধরনের জনমত জরিপে বাইডেন এগিয়ে আছেন। তাঁর এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটার ও নারী ভোটারদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।

এবার যেসব অঙ্গরাজ্যকে ‘সুইং স্টেট’ অর্থাৎ যারা একেক নির্বাচনে একেক প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে বলে পূর্বে দেখা গেছে, সেগুলোতে বাইডেন এগিয়ে আছেন। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ নিয়ে অনেকের মধ্যে কিছুটা বিভক্তি রয়েছে। অভিবাসন ইস্যু, কখনো মুসলমান, কখনো ভিন্ন চামড়ার রঙের ইস্যু, দেয়াল নির্মাণ, সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের প্রবাহ বন্ধ করা হবে—এসব নানা বিষয়ে ট্রাম্প সমর্থকেরা এতটাই হতাশ যে, অনেকে মুখ খুলতেও লজ্জা পায়। সর্বোপরি, করোনা মহামারির তথ্য লুকিয়ে ট্রাম্প সরকার যে অন্যায় করেছে, তার জন্য মানুষ এবার রিপাবলিকানদের ভোট দিতে ভাবনায় পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্বপ্নিক খান ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ আমেরিকান বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য। তাঁর মতে, মানুষের উচিত হবে দেখেশুনে লোকাল কাউন্সিলর নির্বাচন করা। যাকে নির্বাচিত করলে এলাকার উন্নয়ন হবে সে যে দলেরই হোক, তাকে ভোট দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র এমন অনেক মানুষ রয়েছে, তারা বলতেও পারবে না কোন দলের কে প্রেসিডেন্ট। তবে টেক্সাসে হার্ডকোর রিপাবলিকান যেমন রয়েছে তেমনি হার্ডকোর ডেমোক্র্যাটও কম নেই। এদের মধ্যে ২০ শতাংশ সুইং ভোটার রয়েছে। তারাই এবারের নির্বাচনের চেহারা বদলে দিতে পারে।

কথা হয় সাউথ ক্যারোলাইনার বাংলাদেশি মার্কিন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার যূথিকা গোলদার সঙ্গে। তিনি সাউথ ক্যারোলাইনার ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশনের ট্রাফিক সিগনাল ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। নির্বাচন নিয়ে ভাবনার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, তার এলাকা ‘রেড স্টেট’। পুরোটাই কনজারভেটিভ। সেখানে গোঁড়া আমেরিকানদের বসবাস। সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মার্কিন। তারা বিশ্বাস করে, নভেম্বরের পর এ দেশে কোন করোনা থাকবে না। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, করোনা মিডিয়ার সৃষ্টি। তারা চোখ বন্ধ করে ট্রাম্প যা বলে তাতেই বিশ্বাস করে। এরা অফিসে অনেকটা বাধ্য হয়ে মাস্ক পরে। এরা লেখাপড়া করলেও তা পেশাভিত্তিক পড়াশোনা। এর বাইরে এদের জ্ঞান কম। এখানে অভিবাসী অনেক কম। ডাইভার্সিটি কমিউনিটি না থাকায় তারা নিজেদের মধ্যেই নিজেরা গুটিয়ে থাকে। এখানকার লোকজন বিজ্ঞানে বিশ্বাস করে না। তাই সাউথ ক্যারোলাইনায় বাইডেনের জেতার কোন সম্ভাবনাই নেই।

মন্তব্য পড়ুন 0