default-image

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ট্যাম্পা বে-তে গত সপ্তাহে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে এক অজ্ঞাতনামা উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, সবাই বলছে, নারী ভোটাররা তাঁকে পছন্দ করেন না। তিনি যেভাবে কথা বলেন, তা নাকি নারীদের পছন্দ নয়। বিস্মিত ট্রাম্প বলেন, ‘কিন্তু আমি তো “আইন ও শৃঙ্খলা”র প্রেসিডেন্ট। আমি তাদের জন্য শহরতলি নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করেছি।’ হাত দুখানা প্রসারিত করে তিনি আবেদন করেন, ‘আমি আপনাদের কাছে একটি অনুরোধ করছি। শহরতলির নারীরা, আপনারা কি আমাকে একটু ভালোবাসতে পারেন? হাজার হোক, আমি আপনাদের পাড়া নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করেছি।’

ট্রাম্প সেই প্রেসিডেন্ট, যিনি চার বছর আগে গর্ব করে বলেছিলেন, নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে তিনি কাউকে গুলি করে মারলেও তাঁর অনুগত সমর্থকেরা তাঁকেই ভোট দেবেন। এখন নারী ভোটারদের কাছে ‘করজোড়ে’ ভোট ভিক্ষা করছেন তিনি। এর একটা স্পষ্ট কারণ রয়েছে। দেশের সব জনমত জরিপ বলছে, নারী ভোটারদের অধিকাংশ ট্রাম্পকে নয়, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনকে সমর্থন করছেন। শুধু শহরের ও আফ্রিকান-আমেরিকান নারী ভোটারদের মধ্যেই নয়, শহরতলির শ্বেতকায় ও উচ্চবিত্ত নারীদের মধ্যেও জনপ্রিয়তায় বাইডেন এগিয়ে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের তুলনায় ট্রাম্প এই গ্রুপের ভোটারদের মধ্যে ৪ শতাংশ বেশি ভোট পেয়েছিলেন। জনমত জরিপের তথ্য বলছে, এবার ট্রাম্পকে ১৩ পয়েন্টে পেছনে ফেলে দিয়েছেন বাইডেন।

বিজ্ঞাপন

শহরতলি নিরাপদ রাখার যে দাবি ট্রাম্প করেছেন, সে কথা আজ থেকে ২০ বছর আগে বললে হয়তো ফল পাওয়া যেত। শহরতলি নিরাপদ রাখা বলতে তিনি গৃহায়ণ প্রশ্নে সমানাধিকার–সংক্রান্ত আইনে তাঁর বিরোধিতার কথা বুঝিয়েছেন। এই আইনের অধীনে শ্বেতকায়–অধ্যুষিত আবাসিক এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ ও মিশ্র বর্ণের মানুষ বাড়িভাড়া বা বাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি সমর্থন পেয়েছেন। সম্প্রতি সারা দেশে যে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন ছড়িয়েছে, তার বিরোধিতাকে উল্লেখ করেও ট্রাম্প নারীদের কাছে ভোটের আবেদন করেন। এই আন্দোলনের ফলে কোথাও কোথাও লুটপাট হয়েছে; শ্বেতকায় ভোটারদের, বিশেষত নারী ভোটারদের যা ভীত করেছে।

ট্রাম্প আশা করেছিলেন, আইনশৃঙ্খলার পক্ষে তাঁর কঠোর অবস্থান শহরতলির শ্বেতকায় নারীদের উৎফুল্ল করবে। বাস্তবে তাঁরা মোটেই উৎফুল্ল হননি। এর প্রধান কারণ বর্ণভিত্তিক বৈষম্যকে তাঁরাও আর মেনে নিতে প্রস্তুত নন। আজকের শহরতলি গঠনগতভাবে বদলে গেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম ফ্রেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে আজ আর ‘শুধু শ্বেতকায়’ পাড়া নেই। এখন সবখানেই সাদা-কালো পাশাপাশি বসবাস করছে। বর্ণভিত্তিক আবেদন এখন আর আগের মতো কাজ করে না।

নারীদের কাছে ভোটের আবেদন করতে গিয়ে ট্রাম্প বেশ কিছু কৌশলগত ভুল করে ফেলেছেন। তিনি শহরতলির নারীদের গৃহবধূ বা হাউসওয়াইফ নামে সম্বোধন করে এক টুইটে দাবি করেন, বাইডেন ক্ষমতায় এলে তাঁদের, অর্থাৎ গৃহবধূদের জীবনযাপন পদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর এই সম্বোধন সব ধরনের নারীদের মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। শহরতলির নারীরা এখন আর শুধু হাউসওয়াইফ নন, তাঁরা কর্মজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক। সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি উপহাস করে প্রশ্ন করেন, ‘এই লোকটা (ট্রাম্প) কোন শতকে বাস করেন? আজকের বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগই নেই।’

ট্রাম্প আরও একটি ভুল করেছেন। নারীদের কাছে ভোটের আবেদন করতে গিয়ে তিনি যুক্তি দেখান, তাঁদের (অর্থাৎ নারীদের) স্বামীদের চাকরি ফিরিয়ে দিতে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মিশিগানে এক জনসভায় তিনি নারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের স্বামীরা সবাই কাজে ফিরে যেতে উদ্‌গ্রীব। আমিও চাই, তাঁরা যেন অবিলম্বে কাজে ফিরতে পারেন।’

এ কথা বলার সময় ট্রাম্প হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ শতাংশ নারী শ্রমজীবী। সে কথা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়ে ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, করোনাভাইরাসের নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ব্যর্থতার কারণে প্রায় ১০ লাখ নারী শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, যা চাকরি হারানো পুরুষের সংখ্যার প্রায় চার গুণ।

নারীদের প্রতি ট্রাম্পের এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু সাবেকি নয়, বাস্তবতার সঙ্গেও সংগতিহীন। একই কথা খাটে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির ক্ষেত্রেও। এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন শ্বেতকায় পুরুষেরা। নারীদের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নারীস্বার্থবিরোধী ও বৈষম্যমূলক। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ নারী গর্ভপাতের অধিকার সংরক্ষণের পক্ষে। অথচ রিপাবলিকান পার্টি এই অধিকার রদের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি এমন একজন বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টে মনোনয়ন দেবেন, যাঁর হাতে গর্ভপাতের চলতি অধিকার রদ সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টের প্রয়াত বিচারপতি রুথ বেইডার গিন্সবার্গের শূন্য আসনে গত সপ্তাহে ট্রাম্পের মনোনীত অ্যামি কোনি ব্যারেটের নিয়োগ মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে নিশ্চিত হয়েছে। রক্ষণশীল ব্যারেট গর্ভপাতবিরোধী। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতৃত্ব এই নিয়োগকে তাঁদের বড় জয় বলে ধরে নিয়েছেন। সমস্যা হলো, রক্ষণশীল রিপাবলিকান মহলে এই সিদ্ধান্ত সমাদর পেলেও শিক্ষিত ও শহুরে নারী ভোটাররা এতে খুশি হতে পারেননি।

চলতি শতকে নারী শিক্ষায় অগ্রগতির কারণে নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বদলালেও তাঁরা এখনো সমানাধিকার অর্জন করতে পারেননি। কর্মক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে, ওয়াল স্ট্রিটের খুব কম প্রতিষ্ঠানেই নেতৃত্বে রয়েছেন নারীরা। পিউ রিসার্চের এক সমীক্ষার তথ্যানুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ নারী মনে করেন, দেশটিতে সমানাধিকার অর্জনের পথে এখনো বিস্তর বাধা রয়েছে। একই সমীক্ষা বলছে, ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক এমন পুরুষদের ৭০ শতাংশ এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। অথচ রিপাবলিকান পুরুষদের ৮১ শতাংশ ঠিক উল্টো মনোভাব পোষণ করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এখন আর নারীদের সমানাধিকার অর্জনে কোনো বাধা নেই।

রিপাবলিকান পার্টির এই অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা ক্রমেই ডেমোক্রেটিক পার্টির দিকে ঝুঁকছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। সে বছর প্রধানত নারী ভোটারদের বিপুল সমর্থনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হিসাব অনুসারে, ২০১৮ সালের নারী ভোটাররা রিপাবলিকানদের তূলনায় ডেমোক্র্যাটদের ১৯ শতাংশ বেশি ভোট দিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, নভেম্বরের নির্বাচনে এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। জাতীয় জনমত জরিপ অনুসারে, নারীদের মধ্যে মাত্র ৩৭ শতাংশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাজে সন্তুষ্ট, বাকি ৬৩ শতাংশই সন্তুষ্ট নন।

মন্তব্য পড়ুন 0