default-image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। কিন্তু এরই মধ্যে দলের বাম ও মধ্যপন্থীদের বিভেদ তাঁর শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রগতিশীলদের দাবি, এই নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের পেছনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা বাইডেনের মন্ত্রী পরিষদে প্রগতিশীল বলে পরিচিত মানুষদের দেখতে চায়। এ তালিকায় সর্বাগ্রে রয়েছেন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক হিসেবে পরিচিত সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।

স্যান্ডার্স শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব চান, এমন গুজব অনেক আগে থেকেই চালু রয়েছে। গত মঙ্গলবার সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই সে দাবি উত্থাপন করলেন। তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসনকে সফল করতে তিনি সর্বাত্মক সহায়তা করতে প্রস্তুত। এ দেশের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হবে তাঁর কাজ। শ্রম দপ্তরের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্যান্ডার্স বলেন, ‘শ্রমিক শ্রেণির জন্য লড়াই চালাতে পারব, এমন কোনো দায়িত্ব যদি আমাকে দেওয়া হয়, আমি অবশ্যই তা গ্রহণ করব।’

বিজ্ঞাপন

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের সবচেয়ে সরব কণ্ঠ আলেকজান্ডারিয়া ওকাসিও-কর্তেজ স্যান্ডার্সের এই দাবি সমর্থন করেছেন। নির্বাচনের আগেই তিনি বলেছিলেন, বাইডেন জয়ী হলে স্যান্ডার্সকে তাঁর মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া খুবই জরুরি। শ্রমিক ইউনিয়নের তরফ থেকেও এই প্রস্তাবের সমর্থন আসবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেই এমন অনেকে রয়েছেন, যাঁরা সব রকম সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণার বিরোধিতা করছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেল না এবং প্রতিনিধি পরিষদে কম করে হলেও ছয়টি আসন হারাল, তার অন্যতম কারণ ট্রাম্প খুব সফলভাবে তাঁদের গায়ে সমাজতন্ত্রের তকমাটি সেঁটে দিতে পেরেছিলেন। এই বিপর্যয়ের জন্য কেউ কেউ সরাসরি আঙুল তুলেছেন স্যান্ডার্স ও ওকাসিও-কর্তেজের দিকে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হওয়ার পরপর কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক সদস্যদের এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বাম-ডানের এই দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এই টেলিবৈঠকে দলের মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত কংগ্রেস সদস্য আবিগেইল স্প্যানবার্গার ক্রুদ্ধভাবে নির্বাচনে বিপর্যয়ের জন্য দলের প্রগতিশীলদের দায়ী করেন। এরপর আর কেউ যেন ‘সমাজতন্ত্র’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ এই শব্দ ভুলেও উচ্চারণ না করেন, সে ব্যাপারে সাবধান করে তিনি বলেন, তাহলে ২০২২ সালের নির্বাচনে আমাদের গোহারা হারতে হবে।

একই কথা বলেছেন ডেমোক্র্যাটদের হুইপ পোড়–খাওয়া রাজনীতিক জিম ক্লাইবার্ন। ৫ জানুয়ারি জর্জিয়ায় দুটি সিনেট আসনে ফিরতি নির্বাচনে কেউ যেন সমাজতন্ত্রের কথা না বলে, তার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। পুলিশের বাজেট বাতিল বা সমাজতান্ত্রিক স্বাস্থ্যসেবার দাবি তুলে রক্ষণশীল জর্জিয়ায় জেতা যাবে না বলে তিনি মনে করেন।

ডেমোক্র্যাট পার্টির মধ্যপন্থী নেতা কংগ্রেস সদস্য হাকিম জেফরিস ওকাসিও-কর্তেজের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘সমাজতন্ত্রের কথা বলে আমরা জিততে পারব না। আমরা জিততে চাই, ইন্টারনেট সেলেব্রিটি চাই না।’

দলের মধ্যপন্থীদের এই সমালোচনায় চুপ করে নেই প্রগতিশীল অংশ। প্রমিতা জয়পাল, রশিদা তালিব ও ওকাসিও-কর্তেজ কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, মধ্যপন্থীরা কর্মজীবী মানুষের স্বার্থ বিবেচনার বদলে ‘সাদা মানুষদের খুশি রাখতেই অধিক ব্যস্ত’। মধ্যপন্থীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য যে তিনি, সে কথা স্বীকার করে ওকাসিও-কর্তেজ বলেছেন, সবার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে এই দলের সদস্যদের কাছে তিনি একজন ‘শত্রু’। সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনী ফলাফলের জন্য শুধু প্রগতিশীলদের দোষ দেওয়া অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। দলের মধ্যে এমনিতেই অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে, সেখানে এভাবে পেট্রল ঢালা মোটেই সুবুদ্ধির কাজ নয়।

বাইডেনের জন্য সমস্যা হলো নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই তিনি নিজে আগের মধ্যপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসে অধিক প্রগতিশীল অবস্থান গ্রহণ করেছেন। সরকার নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যবিমার বিরোধিতা করলেও তিনি বামপন্থীদের চাপের মুখেই স্বাস্থ্যসেবাকে একটি মানবিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, অতিধনীদের ওপর বর্ধিত আয়করের প্রস্তাব করেছেন এবং ওকাসিও-কর্তেজ প্রস্তাবিত পরিবেশবান্ধব ‘নিউ গ্রিন ডিলে’র পক্ষে মত দিয়েছেন। এর কোনোটাই সিনেটে রিপাবলিকানদের প্রতিরোধের মুখে গৃহীত হবে না। ফলে শাসনকাজ চালিয়ে যেতে হলে বাইডেনকে সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে। তা করতে গিয়ে তাঁকে হয়তো প্রগতিশীলদের কোপানলে পড়তে হবে।

বিজ্ঞাপন

দলের এই প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষের কথা মাথায় রেখে বাইডেন তাঁর চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী রন ক্লাইনকে। এটি তাঁর নতুন প্রশাসনের প্রথম নিয়োগ। ক্লাইনের মতো একজন পরিচিত ডেমোক্রেটিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে তিনি বাম-মধ্যপন্থী উভয় শিবিরকে খুশি করতে পেরেছেন বলে ভাবা হচ্ছে। প্রগতিশীলদের অন্যতম মুখপাত্র সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এই নিয়োগে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, বাইডেন ঠিক লোককেই বাছাই করেছেন।

স্পিকার পেলোসিকেও সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। তাঁর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ সিনেটের রক্ষণশীল রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে ঐকমত্য অর্জন। এ জন্য যে উচ্চাভিলাষী প্রণোদনা বরাদ্দ প্রস্তাব তিনি ইতিপূর্বে করেছেন, তা থেকে সরে আসতে হতে পারে। এই বরাদ্দ প্রস্তাব গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য তিনি ইতিপূর্বে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় এড়াতে চেয়েছেন। কিন্তু এখন তা আর সম্ভব হবে না। বাইডেন প্রশাসনকে সাহায্য করতে হলে তাঁকে অবিলম্বে একটি বাস্তবসম্মত প্যাকেজ অনুমোদন করতে হবে। তা করতে গিয়ে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজনে তিনি যদি অতিরিক্ত ছাড় দেন তাহলে নিজ দলের প্রগতিশীলেরা তাঁকে আক্রমণ করতে দ্বিধা করবেন না।

মন্তব্য পড়ুন 0