default-image

মার্কিন নির্বাচনের লড়াইয়ে এই মুহূর্তে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন জো বাইডেন। অবস্থা অনেকটা এমন যে, অধিকাংশ নির্বাচন বিশ্লেষক ডোনাল্ড ট্রাম্প জমানার শেষ দেখছেন। কিন্তু এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরা। তাদের ভাষ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প যা চান, তা ঠিকই করে ফেলেন। ফলে তাঁরা আশা ছাড়ছেন না। এই আশার কথা শুনে যতই ভ্রু কুঁচকাক, তা একেবারে অমূলক নয়।

নির্বাচনের আর মাত্র দু সপ্তাহ বাকি। এ অবস্থায় জো বাইডেন বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, সুইং স্টেট খ্যাত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতেও তাঁর অবস্থান বেশ শক্ত। গেল নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয় পেয়েছিলেন, তার বেশ কয়েকটির জনমত এবার ঝুঁকেছে জো বাইডেনের দিকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের করা সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপের ফলকে বিবেচনায় নিয়ে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তো তাই বলেই দিয়েছে, এবার ইলেকটোরাল ভোটেও বাইডেন জয়ী হতে যাচ্ছেন।

এ অবস্থায় ট্রাম্প শিবিরে উৎকণ্ঠা স্বাভাবিক। তা হচ্ছেও। স্বয়ং ট্রাম্পের আচরণে এই উৎকণ্ঠা বেশ ভালোভাবেই প্রকাশ পাচ্ছে। যদিও তিনি কথায় বেশ শক্ত অবস্থানে আছেন আগের মতোই। কিন্তু ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলের মতো বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে, যা তাঁর মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রিপাবলিকান নেতাদের একাংশ ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছেন। বিশেষত যেসব সিনেট আসনে এবার নির্বাচন হচ্ছে, সেসব আসনের রিপাবলিকান প্রার্থীরা ট্রাম্প ইস্যুতে আগের মতো সরাসরি পক্ষ নিতে পারছেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোভিড আক্রান্ত হওয়া থেকে শুরু করে নানা প্রশ্নে তাঁদের বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সার্বিকভাবে এমন পরিস্থিতির কারণে অনেকেই আগাম বলে দিচ্ছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার আশা শেষ। কিন্তু এই সরলীকরণে বিপত্তিও কম নয়। কারণ, গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেও হিলারি শিবির বেশ উদ্দীপ্ত ছিল। নির্বাচনে জয় পাওয়াটা তাদের কাছে সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি। হয়নি কারণ, ট্রাম্পের সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রে গেছেন, আর ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থকেরা সে হারে ভোটকেন্দ্রে যাননি। যদিও জনমত জরিপগুলোয় রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের অংশগ্রহণ বেশি ছিল।

আর ছিল ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’। ২০১৬ সালের নির্বাচনের ঠিক ১১ দিন আগে, অর্থাৎ অক্টোবর মাসের শেষ দিকে তৎকালীন এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি জানান, হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল কেলেঙ্কারির তদন্ত তিনি আবার শুরু করছেন। এই খবর হিলারি নির্বাচনী প্রচারের খবরকে ই-মেইল কেলেঙ্কারির খবর দিয়ে চাপা দিয়ে দেয়। সঙ্গে জনমনে তৈরি করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচার শিবিরের জন্য বড় সুযোগ হয়ে এসেছিল। এবারও ট্রাম্প তেমন কোনো চমক দিতে পারেন কিনা, তা এখন দেখার বিষয়।

তবে এখন পর্যন্ত তেমন চমক ট্রাম্প শিবির দিতে পারেনি। বরং উল্টো ঘটনা ঘটেছে। এ মাসের শুরুর দিকে নিউইয়র্ক টাইমসের কল্যাণে বিশ্বের সব সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়কর রিটার্নের তথ্য। স্বয়ং প্রেসিডেন্টের কর ফাঁকি দেওয়ার তথ্য সমালোচনার ঝড় তোলে। এর বিপরীতে শক্ত কোনো অবস্থান ট্রাম্প নিতে পারেননি। বরাবরের মতোই তিনি ‘ভুয়া খবর’ শব্দবন্ধটি দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

ট্রাম্প শিবির যে বসে আছে এমন নয়। গতবারের মতো এবারও তারা একটি ই-মেইল কেলেঙ্কারি হাজির করতে চেয়েছিল। আর তা জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের। নিউইয়র্ক পোস্টের এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ওই ই-মেইলটি হান্টার বাইডেন ইউক্রেনের গ্যাস কোম্পানির হয়ে লবিংয়ের উদ্দেশে করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এই দাবির পক্ষে প্রমাণ এতই দুর্বল যে, তা জনপরিসরে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

ট্রাম্প শিবির থেকে জোর চেষ্টা করা হচ্ছে ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকালে জো বাইডেনের নানা ভুলকে সামনে আনতে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাইডেন নিয়েছিলেন কিনা, তা জড়ো করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন কিছু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প শিবির সামনে আনতে পারলে এবং তা মানুষকে বিশ্বাস করানো গেলে—তা নিঃসন্দেহে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেক এগিয়ে দেবে।

প্রথম প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক নিশ্চিতভাবেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নিজের আচরণের কারণেই তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। কোভিড আক্রান্ত হওয়ায় দ্বিতীয় প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক দিয়ে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগটিও তিনি হারিয়েছেন। এখন হাতে আছে তৃতীয় প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক। সেখানে তিনি যদি প্রেসিডেন্টসুলভ আচরণ করেন এবং বাইডেন যদি কোনো কারণে বিচ্যুত হন, তাহলে তাঁর জনসমর্থনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প বারবারই বলছেন, খেলা এখনো শেষ হয়নি। তাঁর সমর্থকেরাও আশায় বুক বেঁধে আছে। শেষ মুহূর্তে কোনো চমক দিয়ে তিনি সব ওলট-পালট করে দেবেন—কট্টর ট্রাম্প সমর্থকেরা এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর ট্রাম্পের জন্য তাঁরা যেভাবে হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়েছিলেন, তা অনেক বড় ব্যাপার। নিশ্চিতভাবেই এই সমর্থকেরা ট্রাম্পকে ভোট দেওয়ার জন্য কেন্দ্র পর্যন্ত যাবেন। কিন্তু বাইডেন সমর্থকদের ক্ষেত্রে এ কথা হলফ করে বলা যায় না। জনমত জরিপে অংশ নেওয়াদের একটা বড় অংশই বয়সে তরুণ, অথবা মধ্যবয়সী। ডেমোক্রেটিক দলের এই সমর্থকদের একটি বড় অংশের পরিচয় আবার যতটা ট্রাম্প-বিরোধী, ততটা বাইডেন সমর্থক নয়। ফলে ভোটকেন্দ্রে তাঁরা যাবেনই—এ কথা বলবার সুযোগ নেই।

এই অনিশ্চয়তাই এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় সব জনমত জরিপের ফল উল্টে ক্যাপিটল হলে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রবেশের জন্য এই সবগুলো বিষয়কেই এখন ট্রাম্পকে কাজে লাগাতে হবে। আর বিপরীতে বাইডেনকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য চলতে হবে সাবধানীভাবে, যাতে কোনোভাবেই পা না হড়কায়। কারণ, আপাতভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে মনে হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সত্যিই এখনো বড় সুযোগ রয়েছে।

মন্তব্য পড়ুন 0