default-image

সিনেটে রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল স্পষ্ট করে বলেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর রিপাবলিকান দলের ভবিষ্যৎ হতে পারেন না।

সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন দণ্ড থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। এর পরেই মিচ ম্যাককনেল পরিষ্কার এই বার্তা দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিনেটের অভিশংসন আদালতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ট্রাম্পকে দণ্ড দেওয়ার পক্ষে ভোট দেন। তবে তিনি সাংবিধানিক আইনে রেহাই পেয়েছেন। দণ্ড আরোপের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সিনেট সদস্যের ভোট দরকার। কিন্তু তাঁকে দণ্ডিত করার মতো পর্যাপ্ত ভোট পড়েনি। ফলে অভিশংসন আদালতের চূড়ান্ত ৫৭-৪৩ ভোটের মাধ্যমে দণ্ড থেকে এ দফায়ও বেঁচে যান ট্রাম্প।

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় দোষারোপ করেছিলেন মিচ ম্যাককনেল। তবে স্থানীয় সময় ১৩ ফেব্রুয়ারি সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন তিনি।

এর কিছু পরেই ম্যাককনেল ট্রাম্পের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ক্যাপিটল হিলে সহিংসতার ঘটনার আগে ট্রাম্পের আচরণ ছিল অসম্মানজনক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন। ওই দিন সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঘটনায় ট্রাম্প নৈতিকভাবে দায়ী।

দোষারোপ করলেও ক্ষমতার শেষ মেয়াদে ট্রাম্পের দ্রুত বিচারের জন্য সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন ম্যাককনেল। সে সময় তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার উপায় নেই। জো বাইডেনের অভিষেকের আগে ট্রাম্পের বিচার অসম্ভব বলেও জানান ম্যাককনেল।

বিজ্ঞাপন
এই হামলা চালিয়েছে মাত্র কয়েক শ দাঙ্গাবাজ মানুষ। ৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ভুল তথ্য প্রচার করে মানুষকে উসকে দেয়নি। উসকে দিয়েছেন মাত্র একজন মানুষ
মিচ ম্যাককনেল, সিনেটের সংখ্যালঘু রিপাবলিকান দলের নেতা

সিনেটের সংখ্যালঘু রিপাবলিকান দলের নেতা ম্যাককনেল বলেন, ‘তাঁর (ট্রাম্প) ভয়াবহ এই আচরণ লাখো ভোটারকে অপমান করার শামিল বলেই যে কেউ মত দেবে। ৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন কিন্তু ক্যাপিটল হিলে হামলা চালায়নি। এই হামলা চালিয়েছে মাত্র কয়েক শ দাঙ্গাবাজ মানুষ। ৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ভুল তথ্য প্রচার করে মানুষকে উসকে দেয়নি। উসকে দিয়েছেন মাত্র একজন মানুষ।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপাবলিকান পার্টি ট্রাম্প থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এখন রিপাবলিকান পার্টিকে ভাবতে হবে, প্রকৃত অর্থে তারা ট্রাম্পের ষড়যন্ত্র করার প্রবণতাকে কতটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ, ট্রাম্প আগেই বলেছেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আবার প্রার্থী হতে চান। অভিশংসন আদালতের রায় তাঁর বিপক্ষে না যাওয়ায় ওই নির্বাচনের জন্য ট্রাম্প অযোগ্য ঘোষিত হননি। তিনি তাঁর সমর্থকদের উজ্জীবিত করে সে লক্ষ্যেই এখন থেকে কাজ শুরু করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন আইওয়ার রিপাবলিকান সিনেটর চাক গ্রাসলে। ট্রাম্পই দলের ভবিষ্যৎ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সময়ই আসলে সব বলে দেবে। তবে মনে রাখতে হবে, নেতা হতে হলে তাঁর অসংখ্য অনুগামী থাকতে হবে। তাই আমরা খুঁজে নেব, কে আমাদের পরবর্তী নেতা হবেন। এই দৌড়ে সবাই থাকতে পারেন। কারণ, আমরা একটা অনেক বড় তাঁবুর নিচে আছি।’

সিনেটে ট্রাম্পের অভিশংসনের বিপক্ষে ভোট দেওয়া নর্থ ডাকোটার রিপাবলিকান সিনেটর কেভিন ক্র্যামার বলেন, ‘আমি মনে করি, যা ঘটেছে তারপর তাঁর (ট্রাম্প) আর কখনো প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমার ধারণা, অভিশংসন প্রক্রিয়া এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

এদিকে সিনেটে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা অভিশংসন বিচারে ভোটাভুটির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে বাইডেন উল্লেখ করেন, ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার অভিযোগের বিষয় নিয়ে বিতর্ক না থাকলেও চূড়ান্ত ভোটে ট্রাম্পের দণ্ডাদেশ আসেনি।

বাইডেন বলেন, ‘ইতিহাসের এই দুঃখজনক অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র ভঙ্গুর।’

বাইডেন আরও বলেন, গণতন্ত্রকে সর্বদা রক্ষা করা দরকার। এ জন্য অবশ্যই সবাইকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে সহিংসতা ও উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই বলে উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। তিনি বলেন, মার্কিন হিসেবে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতা হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব সত্যকে সমুন্নত রাখা। মিথ্যাকে পরাজিত করা।

ক্যাপিটল হিলে হামলার মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে প্ররোচনা ও উসকানির অভিযোগে সিনেটে ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসনের বিচার হয়।

কিন্তু রিপাবলিকান সিনেটরদের প্রয়োজনীয়সংখ্যক ভোট না পাওয়ায় বিচারে ট্রাম্পকে দণ্ডিত করা যায়নি। এমনটা যে ঘটবে, তা বিচার শুরুর আগেই প্রতীয়মান হয়েছিল। রিপাবলিকান বেশির ভাগ সিনেটর ট্রাম্পের বলয়ের বাইরে গিয়ে এই অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেবেন না বলে আগেই ধরে নেওয়া হয়েছিল।

৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার জন্য দায়ী করে আনা অভিযোগ অভিশংসনযোগ্য বলে ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। ট্রাম্পের পক্ষে তাঁর আইনজীবীরা যুক্তিগুলো খণ্ডন করেন।

অভিশংসন বিচারের জন্য মার্কিন সিনেটের ১০০ জন সদস্যই শপথ নিয়ে তাতে অংশগ্রহণ করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে অভিশংসন আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে ডেমোক্রেটিক পার্টি ও ট্রাম্পের আইনজীবীরা সমাপনী বক্তব্য দেন।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ প্রমাণের জন্য আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্যের বাইরে সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হবে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। কোনো সাক্ষ্য ডাকার প্রয়োজন নেই মর্মে সমঝোতা হলে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে সমাপ্তের দিকে চলে যায়।

বিচার নিয়ে উত্তেজনা ছিল। কিন্তু বিচারের ফলাফল অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল।

অভিশংসন আদালতের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রবীণ ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্যাট্রিক লেহি সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দণ্ডিত করার জন্য ভোট আহ্বান করেন।

আগের অবস্থান থেকে একজন রিপাবলিকান সিনেটর তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করে ট্রাম্পকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন। ফলে সাতজন রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাঁরা হলেন সিনেটর রিচার্ড বার, বিল কেসেডি, সুজান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, মিট রমনি, বেন সাসেই ও প্যাট টোমি।

প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের অভিশংসন প্রস্তাবের পক্ষে ১০ জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ভোট দিয়েছিলেন।

সিনেটে অভিশংসন দণ্ড দেওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া রিপাবলিকান সিনেটরদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে। অঙ্গরাজ্য রিপাবলিকান কমিটি থেকে এসব আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার শুরু হয়েছে।

ট্রাম্পের ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র এক টুইটবার্তায় বলেছেন, এখন দলের তালিকায় নাম থাকা এসব রিপাবলিকানকে উচ্ছেদ করার কাজ শুরু হবে।

অভিশংসন আদালতে রায় ঘোষণার পর সিনেটে রিপাবলিকান পার্টির নেতা মিচ ম্যাককনেল বলেন, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ৬ জানুয়ারি বা তার আগে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা ম্রিয়মাণ হয়ে যায় না। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সিনেটররা আজকের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাংবিধানিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে সিনেটর মিচ ম্যাককনেল উল্লেখ করেন।

ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনাও করেছেন মিচ ম্যাককনেল। তিনি বলেন, নীতিগত ও বাস্তবসম্মতভাবে ট্রাম্প এ ঘটনার জন্য দায়ী।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন