ট্রাম্প-বাইডেন কাউকেই পছন্দ নয় অনেকের

বিজ্ঞাপন
default-image

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী জো বাইডেন উভয়েই জোর প্রচার চালাচ্ছেন। তারপরও অনেক ভোটার নির্বাচন নিয়ে তেমন আগ্রহ পাচ্ছেন না। এই ভোটারদের নিজ দলে টানার চেষ্টা করছেন উভয় পক্ষের সমর্থকেরা। কিন্তু অনেক চেষ্টাতেও তাদের আগ্রহী করা যাচ্ছে না। কারণ, ভোটারদের অনেকেই দুই প্রার্থীর কাউকেই পছন্দ করছেন না।

নির্বাচনের আর মাত্র মাত্র দেড় মাস বাকি। উভয় দলই এই নির্বাচনকে বর্ণনা করছে, ‘মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন’ বলে। গত কয়েক সপ্তাহে উভয় পক্ষই রেকর্ড পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করেছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও অনেক হবে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা। কিন্তু এত সবের পরও এখনো বহু ভোটার রয়েছেন, যারা না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, না জো বাইডেন—কারও পক্ষেই অবস্থান নিতে রাজি নন। তাঁরা দুজনের কাউকেই পছন্দ করেন না।

টেক্সাসের হিউস্টনের বাসিন্দা সায়মন কাজি এ দলের একজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ৩২ বছর বয়সী সায়মন বিবিসি অনলাইনকে বলেন, ‘এই নির্বাচন নিয়ে আমার মোহভঙ্গ হয়েছে। আমাদের হাতে সত্যিই কোনো ভালো বিকল্প নেই। দুই প্রার্থীর কেউই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আমলে নিয়ে মানুষের জীবনকে আরও ভালো ও উন্নত করার প্রয়াস নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা কেউই এই দেশকে আশা দেখাতে পারছেন না।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
এই দেশের ক্ষমতাধরেরা, যারা সংবাদমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রক, তারা চায় না তাদের স্বার্থে আঘাত পড়ুক। এবার যা ঘটল, তা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র এখনো গণতন্ত্রের মুখোশ পরতে চাইছে। অথচ সত্য হচ্ছে, এখানে আদতে ধনিকতন্ত্র চলে। সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য যখনই অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসে, তখনই তারা মনে করে তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। ফলে, তারা এক জোট হয়ে সেই ব্যক্তিকে সরিয়ে দেয়, যে এই পরিবর্তনটি আনতে পারত
সায়মন কাজি, ডেমোক্র্যাট সমর্থক

এমন নয় যে, সায়মন কাজি ভোট দেন না। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ডেমোক্রেটিক দলের এই সমর্থক। কিন্তু এবার তিনি একেবারে হতাশ। নিজের পছন্দের প্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স এবারও মনোনয়ন না পাওয়ায় গোটা নির্বাচনের বিষয়েই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। সায়মন বলেন, ‘এই দেশের ক্ষমতাধরেরা, যারা সংবাদমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রক, তারা চায় না তাদের স্বার্থে আঘাত পড়ুক। এবার যা ঘটল, তা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র এখনো গণতন্ত্রের মুখোশ পরতে চাইছে। অথচ সত্য হচ্ছে, এখানে আদতে ধনিকতন্ত্র চলে। সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য যখনই অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসে, তখনই তারা মনে করে তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। ফলে, তারা এক জোট হয়ে সেই ব্যক্তিকে সরিয়ে দেয়, যে এই পরিবর্তনটি আনতে পারত।’

রান্ট পাপাজিয়ানও এমন ঘরানার মানুষ। ৫২ বছর বয়সী এই আরমেনীয় অভিবাসী কোনো মার্কিন নির্বাচনেই ভোট দেননি। যদিও লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে আসা পাপাজিয়ান ভোটার হয়েছেন অনেক আগে। ভোট না দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ভোট দিলে হয়তো আপনার ভালো লাগবে, নিজেকে ক্ষমতাবানও মনে হবে। কিন্তু আপনার অবস্থান বরাবরই এক থাকবে। আমার এই খেলা ভালো লাগে না। আমি বিশ্বাস করি না, আমরা কখনো এমন কোনো প্রার্থী পাব, যিনি সামগ্রিক উন্নয়ন ও ভারসাম্যের ব্যাপারে আগ্রহী হবেন। আমি বিশ্বাস করি না যে, এই ব্যবস্থা এমন রাজনীতিকের জন্ম দেবে, যার ওপর আমরা আস্থা রাখতে পারব। কথা ছিল গণতন্ত্র আরও ভালো অবস্থায় যাবে। কিন্তু আদতে হচ্ছে উল্টো। যত বড় দেশ, তত বাজে দশা। আমাদের ছোট ছোট গোত্রে ভাগ করে ফেলা হচ্ছে, যাতে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। পরিবর্তনের একমাত্র পথ হচ্ছে, এই ব্যবস্থাকেই প্রত্যাখ্যান করা।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এমনিতেই ভোটারদের অংশগ্রহণ কম। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কম হওয়ায় ভোটারেরা অন্য দেশের মতো এখানে নির্বাচনের দিন কেন্দ্রমুখী হয় না। গত কয়েকটি নির্বাচনে মোট ভোটারের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। অথচ ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোয় এ হার গড়ে ৭০ শতাংশ। এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশেও এর চেয়ে অনেক বেশি ভোট পড়ে। ২০০৮ সালের মার্কিন নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৬৪ শতাংশ ভোটার। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে এ হার নেমে ৫৫ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এমনিতেই ভোটারদের অংশগ্রহণ কম। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কম হওয়ায় ভোটারেরা অন্য দেশের মতো এখানে নির্বাচনের দিন কেন্দ্রমুখী হয় না। গত কয়েকটি নির্বাচনে মোট ভোটারের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। অথচ ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোয় এ হার গড়ে ৭০ শতাংশ। এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশেও এর চেয়ে অনেক বেশি ভোট পড়ে। ২০০৮ সালের মার্কিন নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৬৪ শতাংশ ভোটার। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে এ হার নেমে ৫৫ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান নাইট ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোটারদের প্রায় অর্ধেকই নির্লিপ্ত বসে থাকেন। সংখ্যার হিসেবে এটি ১০ কোটির বেশি। এ বিষয়ে ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও টাফটস ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইটান হার্শ বিবিসি অনলাইনকে বলেন, ‘এটি অনেক বড় একটি জনগোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রের মোট ভোটারের অর্ধেকই এমন। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় তাঁরা নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের কোনো সংযোগ বোধ করেন না। নিজেদের অংশগ্রহণ করা-না করায় কিছু যাবে-আসবে না বলে তাঁরা মনে করেন।’

এ জন্য ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়ারও একটা ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেলজিয়াম ও চিলির কথা বলা যায়, যেখানে ভোট দেওয়া অনেকটা বাধ্যতামূলক। ফলে এ দুদেশের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি থাকে। আর অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির মতো দেশে নতুন ভোটার নিবন্ধন অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়া ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়াটাকে অনেকটা ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত জরিপের তথ্য বলছে, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তারপরও নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ বোধ করছেন না তাদের ৪৫ শতাংশ। ২০১৬ সালের জুন মাসে এ হার ছিল ১৭ শতাংশ। নিবন্ধিত ভোটারদের ৫৯ শতাংশই মনে করেন, দুই প্রার্থীর কেউই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেননি

গত কয়েক দশকে অবশ্য কিছু কিছু অঙ্গরাজ্য ভোটার নিবন্ধন বাড়াতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ভোটের দিনই কেন্দ্রের বাইরে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় খোলা রাখারও উদ্যোগ নিয়েছিল কেউ কেউ।

বরাবরের মতোই এবারের নির্বাচন নিয়েও একের পর এক জরিপের ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত জরিপের তথ্য বলছে, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তারপরও নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ বোধ করছেন না তাদের ৪৫ শতাংশ। ২০১৬ সালের জুন মাসে এ হার ছিল ১৭ শতাংশ। নিবন্ধিত ভোটারদের ৫৯ শতাংশই মনে করেন, দুই প্রার্থীর কেউই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেননি। আর আগামী নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন ৫১ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার।

এই গোলমেলে পরিস্থিতি নিয়ে অধ্যাপক ইটান হার্শ বলেন, এর মূল কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভাব। মানুষকে কী উদ্দীপ্ত করে, মানুষের আকাঙ্ক্ষা কী—এগুলোই এখানে মুখ্য। যে খেলার সঙ্গে মানুষের কোনো যোগ নেই, সেই খেলা সে দেখবে কেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি হলে ওই খেলার দর্শকেরা তা উপভোগ করবে। যারা পছন্দ করে না, তাদের কাছে বিষয়টি তখন হাঙ্গামা ছাড়া আর কিছুই নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অনেকে খেলাটি কী, তাই দেখতে চাইছেন না। মূল নির্বাচনের আগে প্রার্থী মনোনয়নের প্রাথমিক বাছাই পর্বেই তাদের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি প্রথমবার ভোটার হয়েছেন এমন অনেকেরও কোনো আগ্রহ নেই নির্বাচন নিয়ে। মোহ তৈরির আগেই তাদের মোহভঙ্গ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য উইসকনসিনের ভোটার গ্রেস লিংক। এবারই তিনি প্রথম ভোট দেবেন। ২০ বছর বয়সী এই তরুণী বলেন, তিনি চেয়েছিলেন এবার ভোট দিতে। কিন্তু এখন হতাশ। তরুণদের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে কীভাবে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে—তা সহজেই নজরে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘জো বাইডেনকে ভোট দিলে আমরা অপরাধী হয়ে যাব। প্রাথমিক বাছাই পর্বে তরুণ ভোটারদের মতামতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। জো বাইডেনের মনোনয়নই বলে দেয়, দল শ্বেতাঙ্গ ও ধনী ভোটারদের ওপর কতটা নির্ভরশীল। তারা যে তরুণদের কথা শুনতে চায় না—তার প্রমাণ এই মনোনয়ন।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন