default-image

এবারের মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে তহবিল সংগ্রহের দিক থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছেন। এটা পুরোনো কথা। তবে নতুন কী? নতুন হলো, এ দুই প্রার্থীর তহবিলে যারা অর্থ দিয়েছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পৃথক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন। দুই প্রার্থীর তহবিলে অর্থদাতাদের মধ্যে শ্রেণি, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা বিবেচনাতেই পার্থক্য রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের শহর ও উপশহরগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন। গত দুই মাসে দুই দিন বাদে বাকি প্রতিটি দিনই তহবিল সংগ্রহের দিক থেকে ট্রাম্প থেকে এগিয়ে ছিলেন বাইডেন। তাঁর নির্বাচনী তহবিলে অর্থদাতাদের মধ্যে যেমন রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অনেকে, তেমনি রয়েছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। গত এপ্রিল থেকে বাইডেনের তহবিলে এ ধরনের ৭৬ লাখ মানুষ ১৮০ কোটি ডলার জমা করেছে।

বাইডেনের নির্বাচনী তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রান্তের, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অর্থ দিয়েছে। আর এই বহুবিচিত্র মানুষের আর্থিক সহায়তাতেই বাইডেন এত বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি নির্বাচনী তহবিল গঠন করতে পেরেছেন। দুই প্রার্থীর নির্বাচনী তহবিলে অর্থদাতাদের পরিচয় খুঁজলে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পৃথক গোষ্ঠীর দেখা মিলবে।

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, বাইডেনের তহবিলে তাঁর ভিত হিসেবে পরিচিত দুটি উপকূল থেকেই কেবল অর্থ আসেনি। একই কথা খাটে ট্রাম্পের নির্বাচনী তহবিলের ক্ষেত্রেও। তাঁর তহবিলেও টেক্সাসের বাইরে থেকে প্রচুর অর্থ জমা পড়েছে। পুরো দেশের বিভিন্ন অর্থদাতা গোষ্ঠীর জিপ কোড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দুই প্রার্থীর পেছনে রয়েছে দুটি ভিন্ন গোষ্ঠী। এ ভিন্নতা তাদের শ্রেণি চরিত্রে যেমন, তেমনি শিক্ষাগত যোগ্যতায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

বহু বছর ধরে ধনী ও কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকেই রিপাবলিকান দল বেশি নির্বাচনী তহবিল পেয়ে আসছে। বুথফেরত জরিপের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল এবং ২০১২ সালে কলেজ ডিগ্রিধারীদের ভোট রিপাবলিকান প্রার্থীই বেশি পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, ১ লাখ ডলারের বেশি আয় রয়েছে—এমন ভোটারদের সমর্থনও বরাবরই পেয়ে আসছেন রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জমানায় নেওয়া বিভিন্ন বিভাজনমূলক নীতি ও জাতিগত বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ এই ভোটারদের ক্ষুব্ধ করেছে। তাদের একটি অংশ তাই এবার ট্রাম্পের প্রচার দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এতে ভোটের সংখ্যার বিচারেই শুধু নয়, তহবিল সংগ্রহের দিক থেকেও বড় ধাক্কা খেয়েছে দলটি।

গত নির্বাচনের সময়ও তহবিল সংগ্রহের দিক থেকে পিছিয়ে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেবার কলেজ ডিগ্রিধারী ভোটারদের একটি অংশকে হারালেও তিনি কাছে টানতে পেরেছিলেন শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটারদের। এখন তিনি এই একই কাজ নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে করতে চাইছেন। এতে তিনি শেষ পর্যন্ত জিতুন বা হারুন, মার্কিন রাজনীতির ধারায় বড় পরিবর্তন তিনি ঠিকই নিয়ে এসেছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, এবারে নির্বাচনে মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীকে বাইডেন বেশি কাছে টানতে পেরেছেন। মধ্যম আয়ের মানুষের বাস যেসব জিপ কোডে, সেসব এলাকা থেকে বাইডেন মোট ৪৮৬ মিলিয়ন (৪৮ কোটি ৬০ লাখ) ডলার সংগ্রহ করেছেন। বিপরীতে ট্রাম্প সংগ্রহ করেছেন ১৬৭ মিলিয়ন (১৬ কোটি ৭০ লাখ) ডলার। বাকি জনগোষ্ঠী থেকে অর্থ সংগ্রহের দিক থেকে দুই প্রার্থী সমানে সমান।

default-image

একইভাবে যদি উচ্চশিক্ষিত অংশের দিকে তাকানো যায় তবে, দেখা যাবে সেখানেও বাইডেন তহবিল সংগ্রহে এগিয়ে। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, অন্তত ৬৫ শতাংশ মানুষের কলেজ ডিগ্রি রয়েছে—এমন জিপ কোডগুলো থেকে বাইডেন সংগ্রহ করেছেন ৪৭৮ মিলিয়ন বা ৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। বিপরীতে এ ধরনের জিপ কোড থেকে ট্রাম্পের সংগ্রহ ১০৪ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আবার শিক্ষার হার এত বেশি নয় এমন জিপ কোডভুক্ত এলাকা থেকে ট্রাম্প বাইডেনের চেয়ে ৪০ মিলিয়ন বা ৪ কোটি ডলার বেশি সংগ্রহ করেছেন।

গড় আয়কে ভিত্তি ধরে করা হিসাবেও দুই প্রার্থীর তহবিলে অর্থদাতাদের মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট পার্থক্য। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ঘরপ্রতি গড় আয় ৬৮ হাজার ৭০৩ ডলার। এ আয়ের চেয়ে বেশি আয়ের মানুষেরা বাস করেন-এমন জিপ কোডগুলো থেকে বাইডেন এবার ট্রাম্প থেকে ৩৮৯ দশমিক ১ মিলিয়ন বা ৩৮ কোটি ৯১ লাখ ডলার বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছেন। আর এর চেয়ে কম আয়ের বসবাস রয়েছে-এমন জিপ কোডগুলো থেকে ট্রাম্প বাইডেন থেকে ৫৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ৩৪ লাখ ডলার বেশি সংগ্রহ করেছেন।

নির্বাচন বিশ্লেষণকারী নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের জাতীয় পর্যায়ের সম্পাদক অ্যামি ওয়াল্টার বলেন, ‘শ্বেতাঙ্গ কলেজ ডিগ্রিধারী ভোটারদের ভোট হারানোর চেয়েও এটি অনেক বড় ব্যাপার। কারণ, এটি সরাসরি তহবিলের সঙ্গে যুক্ত। এই জনগোষ্ঠী কয়েক বছর আগেও রিপাবলিকান দলের সবচেয়ে শক্তিশালী দাতাগোষ্ঠী হিসেবে কাজ করেছে। এখন এই দাতারা নীরব। শুধু নীরবই নন, তাঁরা উল্টো ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থীর তহবিলে অর্থ দিচ্ছেন।’

বিজ্ঞাপন
অনুদানের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রবণতা আগে থেকে টের পাওয়া যায়। গত এক দশক ধরেই কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা ডেমোক্রেটিক দলকে বেশি সমর্থন দিচ্ছেন
হুইট অ্যায়ারস, রিপাবলিকান জনমত যাচাইকারী

ফেডারেল ইলেকশন কমিশন জানিয়েছে, গত ১ এপ্রিল থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের নির্বাচনী তহবিলে আড়াই কোটির বেশি অনুদান জমা পড়েছে। উভয় দলের জাতীয় কমিটি ও অনুদান প্রক্রিয়াকরণ সাইট উইনরেড ও অ্যাক্টব্লু-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা এটি জানিয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে উভয় দলের তহবিলে সরাসরি জমা পড়া অনুদানের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নয়।

ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের তথ্যমতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের প্রচার তহবিলে জমা পড়া অনুদানের ৯০ শতাংশই রয়েছে এই হিসাবে, যেখানে ১ ডলারের অনুদান থেকে ৭ লাখ ডলারের অনুদান—সব হিসাবই রয়েছে। গড়ে ট্রাম্পের তহবিলে অনুদানপ্রতি জমা পড়েছে ৭১ ডলার করে। আর বাইডেনের তহবিলে জমা পড়েছে ৭৬ ডলার করে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ হাজার জিপ কোড থেকে গত ছয় মাসে ট্রাম্প সংগ্রহ করেছেন ৭৩৪ মিলিয়ন বা ৭৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর বাইডেনে সংগ্রহ ১০৭ কোটি ডলার।

তবে হিসাবটি বুঝতে হলে আরেকটু পেছনে যেতে হবে। কারণ, দুই প্রার্থী নির্বাচনী তহবিল একই সময়ে শুরু করেননি। নির্বাচনী তহবিলে অনুদানের জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দ্বারস্থ অনেক আগেই হয়েছেন ট্রাম্প। এর কয়েক মাস পর বাইডেন তাঁর নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে নামেন। ফলে নির্বাচনী তহবিলে পিছিয়ে থাকাটা রিপাবলিকান দলের জন্য বিশেষ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে রিপাবলিকান জনমত যাচাইকারী হুইট অ্যায়ারস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘অনুদানের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রবণতা আগে থেকে টের পাওয়া যায়। গত এক দশক ধরেই কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা ডেমোক্রেটিক দলকে বেশি সমর্থন দিচ্ছেন। ২০২০ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনে থাকায় এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

জর্জিয়া থেকে আসা অনুদান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আটলান্টার আশপাশের উপশহরগুলোর জিপ কোডগুলো বাইডেনকে বেশি সমর্থন দিচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়েই বহু বছর পর এবার জর্জিয়া ব্যাটলগ্রাউন্ড অঙ্গরাজ্য হিসেবে সামনে এসেছে। পেনসিলভানিয়াতেও একই ঘটনা ঘটেছে। ফিলাডেলফিয়ার আশপাশের উপশহরগুলোর জিপ কোডগুলো থেকে ট্রাম্প যতটা অনুদান পেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি পেয়েছেন বাইডেন। ফলে ওই অঞ্চলগুলোকে এবার ডেমোক্র্যাট অঞ্চল হিসেবে আগে থেকেই চিহ্নিত করা হচ্ছে।

দুই প্রার্থীর তহবিলে আসা অনুদানের এই প্রবণতা এবার অনেক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। স্পষ্টভাবেই রিপাবলিকান দল তাদের কিছু নির্ধারিত দাতা হারিয়েছে। এটি শুধু অর্থ হারানোই নয়। দাতা হারানো মানে ভোটের মাঠেও পিছু হটা। এই ধাক্কা যে শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই লাগছে, তা নয়। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট নির্বাচনেও এর ধাক্কা লাগছে। অনেক অঙ্গরাজ্যেই কংগ্রেস নির্বাচনের তহবিল সংগ্রহে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী। ফল ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকান বলে পরিচিত বেশ কিছু সিনেট আসন এবার হারানোর শঙ্কাও তৈরি হয়েছে দলটির মধ্যে।

তহবিলে পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে অনেক আগে থেকেই চিন্তিত ছিলেন ট্রাম্প। একবার তো নিজেই বড় অঙ্কের অর্থ তহবিলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি সর্বশেষ প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কেও বিষয়টি আর এড়াতে পারেননি ট্রাম্প। বাইডেনকে উদ্দেশ্য করে তিনি সরাসরি বলেছেন, ‘জো, আপনি অনেক অর্থ সংগ্রহ করেছেন, বিপুল পরিমাণে অর্থ। প্রতিবার অর্থ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে জো আপনি তাদের (দাতাদের) সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেন।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কথাটি অবশ্য উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এও তো সত্য, ট্রাম্প নিজে ব্যবসায়ী হয়ে গত চার বছর শুধু ব্যবসায়ীদেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

মন্তব্য পড়ুন 0