default-image

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে বিপাকে পড়েছেন জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকানরা। রক্ষণশীল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যে তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী খুবই অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। অপেক্ষায় আছে অঙ্গরাজ্যটির দুটি সিনেট আসনের নির্বাচন। আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারিত হবে। জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সিতে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পরিচয় খুবই মুখ্য হয়ে উঠবে। এটিই মূলত আগামী প্রশাসনের গতিপথটি, আরও ভালো করে বললে একটি দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান শিবির আক্ষরিক অর্থেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। দলের নেতাদের মধ্যে বিভাজনের রেখা সুস্পষ্ট। এই বিভাজনের কেন্দ্রে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রতি রিপাবলিকানদের নিবেদন কোন মাত্রার হবে, তা নিয়েই এখন দলটির মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব। নির্বাচনের ফল চুরি করা হয়েছে মর্মে ট্রাম্প যে দাবি করে যাচ্ছেন, তাকে সমর্থন দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠছে।

জর্জিয়ার মতো অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর রিপাবলিকানরা এখন খুবই সংশয়ের মধ্যে আছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির দাবিই তাঁদের এই সংকটে ফেলে দিয়েছে। জর্জিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। কারণ, সেখানে দুটি সিনেট আসনে নির্বাচন হবে। ফলে অঙ্গরাজ্যটির রিপাবলিকান নেতাদের এখন বেছে নিতে হবে, তাঁরা ট্রাম্পের পক্ষে নাকি তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখলে, তাঁর কট্টর সমর্থকদের ভোট পাওয়াটা এক রকম নিশ্চিত। কিন্তু একই সঙ্গে হারাতে হতে পারে মধ্যপন্থী ও উদারবাদী ভোটারদের, যাদের সম্মিলিত ভোটে এবার জর্জিয়ায় বাইডেন জয়ী হয়েছেন। আবার ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ বা কিছুটা আলগা করলেও বিপদ আছে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের গোঁড়া সমর্থকদের পাশাপাশি রক্ষণশীল ভোটারদেরও হারাতে হতে পারে। অর্থাৎ দু দিকেই ঝুঁকিতে রয়েছে অঙ্গরাজ্যটির রিপাবলিকান শিবির।

বিজ্ঞাপন
default-image

এ বিষয়ে রিপাবলিকান নেতা অ্যাশলি ও’কনর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘জর্জিয়ার রিপাবলিকানদের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই খুবই সংকটের সময়। খুবই বিভাজনমূলক পরিস্থিতি এখানে। কিন্তু সিনেটের নেতৃত্বের বিষয়টি এই অঙ্গরাজ্যের ওপরই নির্ভর করছে। তাই নিঃসন্দেহে এখানকার সবাই এ জন্য সর্বোচ্চ কাজ করবে।’

জর্জিয়ার বিদ্যমান পরিস্থিতি আর জর্জিয়ায় আবদ্ধ থাকছে না। এখানকার বিরোধের সঙ্গে রিপাবলিকান দলের জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বও জড়িয়ে পড়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এই বিরোধ গত সপ্তাহে অনেকটাই প্রকাশ্যে চলে আসে। জর্জিয়ার পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়া দুই রিপাবলিকান সিনেটর কেলি লোফলার ও ডেভিড পারডু এক যৌথ বিবৃতিতে রিপাবলিকান সেক্রেটারি অব স্টেট ব্র্যাড রাফেন্সপারজারকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। তাঁদের ভাষ্য, রাফেন্সপারজার যে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলেন, তাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ১৪ হাজার ভোট কম পেয়েছেন, যা খুবই অস্বস্তিকর।

জর্জিয়ার রিপাবলিকানদের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই খুবই সংকটের সময়। খুবই বিভাজনমূলক পরিস্থিতি এখানে। কিন্তু সিনেটের নেতৃত্বের বিষয়টি এই অঙ্গরাজ্যের ওপরই নির্ভর করছে
অ্যাশলি ও’কনর, রিপাবলিকান নেতা

এই বিবৃতিতে যা উল্লেখ করা হয়েছে, বিষয়টি কিন্তু আদতে তা নয়। লোফলার ও পারডু—এই দুই সিনেটরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ। মুশকিল হচ্ছে, ট্রাম্পের তোলা ভোট জালিয়াতির দাবির বিপক্ষে গিয়ে রাফেন্সপারজার নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো কিছুতেই কিছু হতো না, যদি রিপাবলিকান প্রার্থীরা আরও বেশি ভোট পেতেন। এখানেই থামেননি রাফেন্সপারজার। ভোট পুনঃগণনায় ট্রাম্পের দাবির পক্ষে দাঁড়ানো রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডাউ কলিনসকে ‘মিথ্যাবাদী’ আখ্যা দিয়েছেন তিনি। অবশ্য কলিনসও চুপ থাকেননি। তিনি রাফেন্সপারজারকে উল্টো ‘অযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

এই বিতর্ক এখন জর্জিয়ার সীমা ছাড়িয়ে সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামকেও জড়িয়ে ফেলেছে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এতে যোগ দিয়েছেন। ট্রাম্প রাফেন্সপারজারকে ‘নামমাত্র রিপাবলিকান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে জর্জিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থাকে আগের মতোই বিতর্কিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। আক্রমণ করছেন জর্জিয়ার রিপাবলিকান গভর্নর ব্রায়ান কেম্পকে। আর লিন্ডসে গ্রাহাম রাফেন্সপারজারকে ভোট জালিয়াতির প্রমাণ খুঁজে বের করার জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া রাফেন্সপারজারের এই তথ্যকে অবশ্য ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন লিন্ডসে গ্রাহাম।

জর্জিয়ায় চলমান এ বিতর্ক সেখানকার রিপাবলিকানদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু করছে না। বিশেষত দুই সিনেটরের পুনর্নির্বাচনের পথে এ বিতর্ক এখন বিরাট বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে। সেখানকার দুই রিপাবলিকান সিনেটর যত দিন ট্রাম্পের ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সমর্থন দিয়ে যাবেন এবং বাইডেনের জয়কে স্বীকার করবেন না, তত দিন তাঁরা মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারবেন না। এই অবস্থান ত্যাগ করলেই বরং তাঁদের পক্ষে আসন্ন নির্বাচনে ভালো করার সম্ভাবনা বাড়ে। কারণ, তখন জর্জিয়ার ভোটারেরা হয়তো ডেমোক্র্যাট প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সিনেটে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিতে তাঁদের পক্ষে দাঁড়াবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁরা মূলত ট্রাম্পের ভোটার-ভিতটি হারানোর ভয়ে দ্বিধায় আছেন।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, জর্জিয়ায় যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা রিপাবলিকান দলের ভবিষ্যৎ অস্থিরতার আভাস। ডোনাল্ড ট্রাম্প জামানার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর এই অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রবল। ট্রাম্প এরই মধ্যে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আভাস দিয়ে রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি রিপাবলিকান দলেও নেতৃত্ব ধরে রাখতে চান। দলের সিদ্ধান্ত প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি ভ্যাটো ক্ষমতা চান বলেও কথিত আছে। এ অবস্থায় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও দল পরিচালনাকারী নেতাদের হয় ট্রাম্পকে ত্যাগ করতে হবে, নয়তো একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে নিজেদের সঁপে দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
২০২২ সালে বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যের গভর্নর এবং প্রতিনিধি পরিষদের সব ও সিনেটের কিছু আসনে নির্বাচন হবে। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি আবারও সামনে চলে আসবে। আর সে সময় বিভিন্ন আসনের রিপাবলিকান প্রার্থী বাছাইয়ের দলীয় প্রাইমারিতে চাপ প্রয়োগের পথ নেবেন ট্রাম্প

রিপাবলিকান বিজ্ঞাপন নির্মাতা টড হ্যারিস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘এটা খুবই সম্ভব যে, ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় দলীয় প্রাইমারিতে ট্রাম্প নেতা নির্মাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। কেউ পছন্দ করুক, আর না-ই করুক, এটা ট্রাম্পের দল।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য এই অবস্থান নিয়ে অনেক রিপাবলিকান নেতাই এখন শঙ্কায় ভুগছেন। ফলে তাঁদের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নেব্রাস্কার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন ব্যাকন বলেন, ‘আমি মূল্যবোধসম্পন্ন একটি দলে থাকতে চাই। কোনো একক ব্যক্তির দলে পরিণত হওয়া আমাদের উচিত নয়। অবশ্য (আব্রাহাম) লিঙ্কনের বিষয়টি আলাদা।’

ট্রাম্প কিন্তু এরই মধ্যে এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে শুরু করেছেন। এই নির্বাচনে তাঁর প্রতি নিবেদনে ঘাটতি ছিল—এমন নেতাদের তিনি শিক্ষা দিতে তৎপর হয়েছেন। এরই মধ্যে ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় দলীয় প্রাইমারির দিকে ইঙ্গিত দিয়ে ওহাইও গভর্নরকে পরোক্ষে হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। ২০২২ সালে বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যের গভর্নর এবং প্রতিনিধি পরিষদের সব ও সিনেটের কিছু আসনে নির্বাচন হবে। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি আবারও সামনে চলে আসবে। আর সে সময় বিভিন্ন আসনের রিপাবলিকান প্রার্থী বাছাইয়ের দলীয় প্রাইমারিতে চাপ প্রয়োগের পথ নেবেন ট্রাম্প। সে সময়ের কথা মাথায় রেখেই অনেক নেতা এখনো ট্রাম্প সম্পর্কে মুখ খুলতে নারাজ।

মন্তব্য পড়ুন 0