default-image

রোম যখন আগুনে পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় যখন মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো ঘোষণা করছে, তখন তিনি নিজের গলফ ক্লাবে গলফ খেলছেন। কী দারুণ মিল।

রোমান সম্রাট নিরোর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণের এই মিল দেখে বিস্ময়ের কিছু নেই। চরম আপৎকালে এই ক্রীড়া ও সুরসঙ্গ দেখে ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই দুই নেতা খুবই কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইতিহাস এখনো অতীত নয়। ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জো বাইডেনের জয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হলেও মসনদে আছেন আগামী বছরের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। সবকিছু সামলে ও যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার পর ওই দিনই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হবেন বাইডেন। তার আগ পর্যন্ত ট্রাম্পই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ওভাল অফিস তাঁর দখলে।

আসা যাক নিরোর প্রসঙ্গে। ৫৪-৬৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল রোমান সম্রাট হিসেবে নিরোর মেয়াদ। মাত্র ১৪ বছর। কিন্তু ইতিহাস নিরোকে মনে রেখেছে। এবং অদ্ভূতভাবে তাঁর সাম্রাজ্য পুড়বার সময় বাঁশি বাজানোর কিংবদন্তির জন্যই। তাঁকে মানুষ মনে রেখেছে একজন নিষ্ঠুর সম্রাট হিসেবে। তিনি তাঁর মাকে হত্যা করেছিলেন। নিজের কাছের আত্মীয়দের ধরতে গেলে কেউই তাঁর নিষ্ঠুর আচরণ থেকে রেহাই পায়নি। নিজের স্ত্রীকে অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় তিনি এত জোরে লাথি দিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মা, স্ত্রী ও সন্তানঘাতি এই সম্রাটকে ইতিহাস নিষ্ঠুর আচরণের জন্যই মনে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

ঠিক একইভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বিভাজন সৃষ্টিকারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখা উচিত। সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, অভিবাসী-মার্কিন ইত্যাদি নানাভাবে তিনি বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। ক্ষমতায় এসেই ধর্মের জিগির তুলে নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ছয় মুসলিম দেশের ওপর আরোপ করেছিলেন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয়সহ বিভিন্ন অশ্বেতাঙ্গ জাতিগোষ্ঠীর ওপর যখন শ্বেতাঙ্গরা হামলা চালাল, যতবার চালাল, ততবারই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরবে বা নীরবে হামলাকারীদেরই পক্ষ নিলেন।

এই ট্রাম্পই যখন নির্বাচনের ফল একেবারে নিজের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, তখন গলফ খেলায় ব্যস্ত। যখন সব টিভি চ্যানেল পেনসিলভানিয়ায় বাইডেনের জয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর প্রেসিডেন্সি জয়ের খবর দিচ্ছে, তখন তিনি গলফ ক্লাবে। নিরো ঠিক কতক্ষণ বাঁশি বাজিয়েছিলেন, তা জানা যায় না। কিন্তু ট্রাম্প বেশিক্ষণ গলফ খেলেননি। দ্রুতই তিনি বাইডেনের এই বিজয়ের দাবিকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিলেন। বললেন, ‘নির্বাচন এখনো শেষ হয়নি।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বিবৃতিতে বারবার করে ভোট গণনা শেষ হওয়ার কথা বলেছেন। বলেছেন, কোনো অঙ্গরাজ্যেই বাইডেন বিজয়ীর সনদ পাননি। কিন্তু বললেন না যে, তিনিও কোনো এমন কোনো সনদ পাননি। কারণ, কোনো অঙ্গরাজ্যই এখনো চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেনি। যে ফল এসেছে, তা বেসরকারি হিসাবের। সরকারি হিসাব আসতে এখনো দেরি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই বলে আসছেন, ডেমোক্র্যাটরা এবার ভোট জালিয়াতি করবে। বাইডেনের জয় নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই একই কথা বলে আসছেন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে তাঁর প্রচার শিবির থেকে মামলাও করা হয়েছে। এর কোনোটির ক্ষেত্রেই যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ হাজির করা হয়নি। এসব অভিযোগ এতটাই অস্পষ্ট যে, ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান দলের নেতারাই তাঁর প্রতি হয় প্রমাণ হাজির করার, নয়তো ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রিপাবলিকান শীর্ষ নেতাদের অনেকেই বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ভোট ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যেসব অস্পষ্ট অভিযোগ তুলছেন, তা দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই ক্ষতিকর। এই ক্ষতি সহজে পুষিয়ে ওঠা যাবে না।

মিথ্যা বলার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকবার আলোচিত হয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন চলাকালে তাঁর ভুয়া দাবি ও মিথ্যা ভাষ্যের পরিমাণ এতই বেড়ে যায় যে, টুইটারে করা তাঁর প্রায় প্রতিটি পোস্টেই টুইটার সতর্কবার্তা জুড়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক থেকে শুরু করে নির্বাচনের পর রাখা বক্তব্যেও তিনি এত মিথ্যা বলেছেন যে, একপর্যায়ে সংবাদমাধ্যমগুলো তা প্রচার বন্ধ করে দেয়।

সংবাদমাধ্যমগুলোর সৌভাগ্য যে, ট্রাম্প নিরো নন। ট্রাম্পকে নির্বাচিত হয়ে আসতে হতো। সম্রাট নিরোকে তার ধার ধারতে হয়নি। নিরোর প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসছে এই কারণে যে, গত চার বছরে ট্রাম্পের নেওয়া বহু পদক্ষেপ দেখে বিভ্রান্ত হতে হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে কি গণতন্ত্র না রাজতন্ত্র চলছে! একের পর এক নির্বাহী আদেশ। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তর্ক করে কোনো কর্মকর্তার পক্ষেই নিজ পদে থাকা সম্ভব হয়নি। হোয়াইট হাউসের পদগুলোকে তিনি মিউজিক্যাল চেয়ার বানিয়ে ফেলেছিলেন। পান থেকে চুন খসলেই তিনি বলেছেন মাত্র তিনটি শব্দ—ইউ আর ফায়ারড। এই শব্দ তিনি কার ক্ষেত্রে উচ্চারণ করেননি? সত্যিই নিজেকে তিনি যেন সম্রাটই মনে করতেন। তাই তাঁর গলফ খেলার দৃশ্যটি বারবার নিরোর বাঁশি বাজানোর দৃশ্যটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0