default-image

যুক্তরাষ্ট্রে এই মুহূর্তে প্রতি সেকেন্ডে একজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, প্রতি দুই মিনিটে মারা যাচ্ছেন একজন। গত শুক্রবার সারা দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে প্রায় এক লাখ, মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার। নির্বাচনের তিন দিন আগে ঠিক এই চিত্র আশা করেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পরাজিত হন, তার প্রধান কারণই হবে কোভিড-১৯ নামের এই অদৃশ্য শত্রু। এই ভাইরাসকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেননি। তিনি জানতেন এই ভাইরাস সাধারণ ফ্লুর চেয়ে পাঁচ গুণ অধিক ক্ষতিকর, সাংবাদিক-লেখক বব উডওয়ার্ডকে ট্রাম্প নিজে সে কথা বলেছিলেন ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে। কিন্তু শেয়ারবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এই বিবেচনায় পুরো ব্যাপারটা তিনি চেপে যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, খুব দ্রুত এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। গরম পড়লেই এই ভাইরাস শক্তি হারায় বলে তাঁকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল। সে কারণে খুব শিগগির ম্যাজিকের মতো এই ভাইরাস অন্তর্হিত হবে বলে তিনি আমেরিকানদের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

আট মাস পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতিমধ্যে ৯০ লাখের বেশি আমেরিকান এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সারা দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, কে কোথায় আক্রান্ত, তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ট্রাম্প মুখে যতই বলুন ‘আমরা করোনাকে বাগে এনেছি’, তাঁর অনুগত সমর্থকেরা ছাড়া সে কথায় কেউ বিশ্বাস করছেন না। ট্রাম্পের জন্য বাড়তি সমস্যা, এই সংক্রমণ এ মুহূর্তে সবচেয়ে দ্রুত ছড়াচ্ছে ট্রাম্প-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ১৬-টি ‘লাল’ অঙ্গরাজ্যে। করোনার কারণেই একাধিক নিরাপদ ‘লাল’ রাজ্য এখন বাইডেনের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

জো বাইডেন এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের চার বছরের ওপর একটি রেফারেনডাম বা গণভোট হিসেবে হাজির করেছেন। এই চার বছরে ট্রাম্পের ঝুড়িতে বেশ কিছু সাফল্য জমা পড়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনীতি। অথচ করোনার কারণে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে, বেড়েছে অভাবী মানুষের সংখ্যা। ট্রাম্প যুক্তি দেখিয়েছেন, ‘এই ভাইরাসের জন্য আমি দায়ী নই, এটি চীনা ভাইরাস।’ কিন্তু আক্রান্ত মানুষ এই দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে তাঁর ব্যর্থতাকেই বড় করে দেখছেন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুত একটি সমীক্ষা অনুসারে, শুধু মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হতো। একই কথা বলেছে ট্রাম্পের করোনাভাইরাস টাস্কফোর্স। কিন্তু ট্রাম্প নিজে শুধু যে সে নীতিমালা অগ্রাহ্য করেছেন তা–ই নয়, তাঁর সমর্থকদের সব বাধানিষেধের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছেন। মিশিগানের গভর্নর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, সে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ট্রাম্প টুইট করেন, ‘লিবারেট মিশিগান’, অর্থাৎ মিশিগানকে মুক্ত করো। তাঁর সে কথায় সাড়া দিয়ে একটি মিলিশিয়া গ্রুপ মিশিগানের গভর্নরকে অপহরণের চক্রান্ত করেছিল।

সব পরামর্শ অগ্রাহ্য করে ট্রাম্প হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে একের পর এক নির্বাচনী সমাবেশ করে গেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষায় স্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, এই গ্রীষ্মে ট্রাম্প ১৮টি নির্বাচনী সভা করেন, সেখান থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন, মারা গেছেন ৭০০ জন। এই দায়ভার ট্রাম্প এড়াতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রের দুর্যোগ প্রতিরোধ দপ্তরের সাবেক পরিচালক জেরেমি কনিন্ডিক মনে করেন, যেকোনো বড় দুর্যোগের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সবল নেতৃত্ব। ট্রাম্প সেই নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘করোনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অন্তরায় ট্রাম্প নিজে।’

তাঁর এই ব্যর্থতা দেশের জনমত জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে। ফাইভথার্টিএইট নামের নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ করোনা মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা অনুমোদন করেন না। অন্যদিকে ঠিক একই পরিমাণ মানুষ মনে করেন জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে তিনি সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন। বস্তুত শুধু করোনা নয়, অর্থনীতি ছাড়া বাকি সব প্রশ্নেই মার্কিন জনগণ বাইডেনের প্রতি তাঁদের সমর্থন প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনে মানুষের এই মনোভাবের প্রকাশ ঘটবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আরেক সমস্যা ওবামা

নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাইডেন-হ্যারিসের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু তাঁকে একই সঙ্গে পুরোনো শত্রু বারাক ওবামার বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। ট্রাম্পের রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছিল ওবামার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে। প্রথম অশ্বেতকায় প্রেসিডেন্টের নির্বাচনে অসন্তুষ্ট শ্বেত আমেরিকা তাঁর সে আক্রমণ সাগ্রহে গ্রহণ করেছিল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প পদে পদে চেষ্টা করেছেন ওবামার সব সাফল্য রদ করতে। অনেকের ধারণা, ওবামা আমলে স্বাক্ষরিত ইরানের সঙ্গে আণবিক চুক্তি ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাতিলের পেছনে যত না নীতিগত পার্থক্য, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল ওবামার প্রতি ট্রাম্পের বিরাগ। একই কারণে তিনি এখনো ‘ওবামাকেয়ার’ নামে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা আইন বাতিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

চার বছর পর, নির্বাচনী প্রচারণার শেষ সপ্তাহে ওবামা মঞ্চে নেমেছেন শুধু জো বাইডেনের পক্ষে ওকালতির জন্য নয়, ট্রাম্পের প্রতি এত দিন পুষে রাখা ক্রোধ প্রকাশেও। তাঁর প্রশাসনের আট বছরের অর্জনকে মনে করিয়ে দেওয়াও তাঁর উদ্দেশ্য। ডেমোক্র্যাটদের জন্য ওবামা তাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। গত এক সপ্তাহ তিনি পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডা ও মিশিগানে নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়েছেন। এসব সভায় তিনি ট্রাম্পের ব্যর্থতার ফিরিস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে তুমুল হাসিঠাট্টাও করেছেন। অনেকেই বলছেন, বাইডেনের যে সমাপ্তি বক্তব্য দেওয়ার কথা, তা দিচ্ছেন ওবামা।

বিজ্ঞাপন

ফ্লোরিডায় তাঁর ভাষণে বক্র হাসি দিয়ে ওবামা বলেন, বাইডেন আর যা–ই করুন, করোনা টেস্টিং নিয়ে উটকো ঝামেলা করবেন না, বিজ্ঞানীদের মূর্খ বলবেন না অথবা ট্রাম্পের মতো নির্বাচনী সভা করে করোনাভাইরাস ছড়াবেন না। ট্রাম্প সাংবাদিকদের সমালোচনা করে বলেছেন, তাঁরা সারাক্ষণ শুধু কোভিড, কোভিড আওড়ে যাচ্ছেন। সে কথা উল্লেখ করে ওবামা বলেন, এই লোক মিডিয়াতে কোভিডের প্রতি মনোযোগ দেখে, তাঁর টিভি রেটিং দেখে ঈর্ষা বোধ করছেন। গত সপ্তাহে সিবিএস টিভির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ট্রাম্প মাঝপথে উঠে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করা হচ্ছে, অথচ বাইডেনের বেলায় সব হালকা প্রশ্ন। সে কথা উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্ট টিভি সাক্ষাৎকারকে ভয় পান। তাহলে তিনি বিদেশি একনায়কদের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বার্থকে রক্ষা করবেন কী করে?’

কোনো সন্দেহ নেই, মিশিগান বা পেনসিলভানিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ওবামার উপস্থিতি শহুরে, বিশেষত আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের উৎসাহিত করবে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই দুই রাজ্যেই আফ্রিকান-আমেরিকানদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটদানে বিরত ছিল। হিলারির পরাজয়ের সেটাই প্রধান কারণ। শুধু ওবামা নন, বাইডেনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তাঁর দলের একাধিক শীর্ষ নেতা, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বার্নি স্যান্ডার্স, এলিজাবেথ ওয়ারেন ও স্টেসি এব্রামস।

অন্যদিকে নিজের পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করতে ঠিক এই রাজ্যগুলোতেই বারবার ফিরে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার এক পেনসিলভানিয়াতেই তিনি চারটি সভা করেন। সমস্যা হলো, এসব সভা তাঁকে একা সামলাতে হচ্ছে, দলের কোনো নামকরা নেতা তাঁর পাশে নেই। বড়জোর তাঁর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে পাশে পেয়েছেন। একমাত্র জীবিত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তাঁর পক্ষে একটি কথাও বলেননি। কোনো সভায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।

‘পলিটিকো’ কিছুটা শ্লেষের সঙ্গে মন্তব্য করেছে, ট্রাম্প একদম একা।

মন্তব্য পড়ুন 0