default-image

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন অ্যামি কোনি ব্যারেট। মাত্র ৪৮ বছর বয়সী এই রক্ষণশীল বিচারপতি সদ্য প্রয়াত উদারনৈতিক বিচারপতি রুথ বেইডার গিন্সবার্গের স্থলাভিষিক্ত হলেন। গত সোমবার মার্কিন সিনেট শুধু রিপাবলিকান সমর্থনে ৫২-৪৮ ভোটে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত করে। একই দিন সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর ফলে অবিলম্বে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণে তাঁর আর কোনো বাধা রইল না।

গিন্সবার্গ নারী অধিকারের প্রবক্তা হিসেবে মার্কিন প্রগতিশীল মহলে শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তাঁর স্থলে একজন অতিরক্ষণশীল ও আচারপন্থী ক্যাথলিক বিচারপতির নিয়োগ ডেমোক্রেটিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ব্যারেটের নিয়োগের ফলে এই আদালতে আসনসংখ্যা দাঁড়াল নয়জন, যার মধ্যে ছয়জন রক্ষণশীল ও তিনজন উদারনৈতিক। অনেকের ধারণা, নভেম্বরের নির্বাচন নিয়ে আইনি লড়াই শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে গড়াবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা করছেন, রক্ষণশীল বিচারপতিদের সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষেই যাবে, ঠিক যেমন ঘটেছিল ২০০০ সালে আল গোর বনাম জর্জ বুশের ক্ষেত্রে। এটি কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই খোলামেলাভাবেই এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিচারপতি গিন্সবার্গের মৃত্যুর পর গত মাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে নয়জন বিচারপতির আসন গ্রহণ খুব জরুরি, কারণ আগামী নির্বাচন বিষয়ে রায় দেওয়ার ভার তাঁদের হাতেই থাকবে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেন, ডেমোক্র্যাটরা বিপুল কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনবার চেষ্টা করবেন। তাঁর পছন্দমাফিক একজন বিচারপতি নিয়োগ সম্ভব হলে তেমন ভয় আর থাকবে না।

বিজ্ঞাপন

অন্য আরেক কারণে ট্রাম্প একজন রক্ষণশীল বিচারপতির নিয়োগে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল, বিশেষত ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের মধ্যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় না হলেও বিচারব্যবস্থায় একের পর এক যেভাবে তিনি দেশের ফেডারেল আদালতগুলোয় রক্ষণশীল বিচারকদের নিয়োগ দিয়েছেন, তা বিপুলভাবে আদৃত হয়েছে। এসব ভোটারের দাবি, গর্ভপাতের যে অধিকার বর্তমানে প্রচলিত আছে, অবিলম্বে সে আইনের সম্পূর্ণ রদ। অ্যামি ব্যারেট ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক, গর্ভপাত প্রশ্নে তাঁর বিরোধিতা সুপরিচিত। তিনি সে আইন রদে অধিক ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন। ট্রাম্প আশা করছেন, তাঁর এই ‘উপহারের’ জবাবে উজ্জীবিত রক্ষণশীল ভোটদাতারা তাঁর পুনর্নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রিত সুপ্রিম কোর্ট যে ট্রাম্পের প্রতি পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, এটা মোটেই কোনো কষ্টকল্পনা নয়। এ কথা ঠিক, আদালতের দায়িত্ব নতুন আইন তৈরি নয়, চলতি আইনের ব্যাখ্যা ও সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে রায় প্রদান। আমরা দেখেছি, রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক বিচারকদের হাতে যখন এই ব্যাখ্যা রচিত হয়, তা প্রায় অনিবার্যভাবে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক রাজনৈতিক অবস্থানকে অনুসরণ করে। অন্য কথায়, কাগজে-কলমে বিচারপতিরা নিজেদের যতই নিরপেক্ষ দাবি করুন না কেন, তাঁরা আসলে এই দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে নন। ভয়ের কথা হলো, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পর্যায়ে মার্কিন রাজনীতি ক্রমেই রিপাবলিকান স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তন চাইলেও ঠেকানো সম্ভব নয়। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিদের নিয়োগ আমৃত্যু, ফলে নির্বাচকের সমষ্টিগত চরিত্র যেমনই হোক, এই রক্ষণশীল আদালতের চরিত্র অক্ষত থাকবে। বস্তুত, আগামী দুই বা তিন দশক এই আদালতের চরিত্র বদলানোর সম্ভাবনা কার্যত শূন্য।

আসল ভয়টা এখানেই। ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে সেই অশনিসংকেত দেখতে পেয়েছেন। এই সর্বোচ্চ আদালত সোমবার উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে দায়ের করা এক মামলার রায়ে জানিয়েছেন, ডাকযোগে দেওয়া যেসব ভোট নির্বাচনের দিন, অর্থাৎ ৩ তারিখের মধ্যে কর্তৃপক্ষের হাতে এসে পৌঁছাবে, কেবল সেসব ভোটই বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। ডেমোক্র্যাটদের অনুরোধ ছিল, ৩ নভেম্বরের পর আরও ছয় দিন ডাক-ভোট গণনার সুযোগ রাখা হোক। কোভিড-১৯ ও ডাক বিভাগের অব্যাহত শ্লথগতির কারণে এবার ডাক-ভোট বিলম্বে হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সে জন্য ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে এমন আবেদন করা হয়েছিল। আদালত সেই যুক্তি অগ্রাহ্য করে ডাক-ভোট গণনার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রদানে অস্বীকার করেছেন।

এটা কোনো গোপন কথা নয় যে এবারের নির্বাচনে উইসকনসিন মিশিগান ও পেনসিলভানিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে মোট ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প এই তিন রাজ্যের ইলেকটোরাল ভোটের জোরেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ডাক-ভোটের এক বড় অংশ ডেমোক্রেটিকদের, গণনার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে সব বৈধ ভোটের গণনা সম্ভব হবে, এর ফলে ভোটের ফলাফল তাদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাতে বাদ সাধলেন সুপ্রিম কোর্ট।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসসহ পাঁচ রক্ষণশীল বিচারপতি ডাক-ভোট গণনার সময় দীর্ঘায়িত করার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করেন। অবশিষ্ট তিনজন উদারনৈতিক বিচারক সে রায়ের বিরোধিতা করেন। এঁদের একজন বিচারপতি ইলেনা কেগান এই রায়ের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, সব ভোট গণনা ভিন্ন নির্বাচন সুসম্পন্ন হয়েছে—এ কথা বলা যাবে না। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, অ্যামি ব্যারেট উপস্থিত থাকলে রক্ষণশীলদের পাল্লা আরও ভারী হতো, ৬-৩ ভোটে এই রায় ডেমোক্র্যাটদের বিপক্ষে যেত।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের সামনে এটিই শেষ মামলা নয়। ভোট গণনার তারিখ ও প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যে অঙ্গরাজ্যগুলোয় নিম্ন আদালত পর্যায়ে একাধিক মামলা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে, যার কোনো কোনোটি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে। ৩ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মামলাও যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে, তাতে সন্দেহ নেই। ডেমোক্র্যাটরা ভয় পাচ্ছেন, রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এসব মামলার রায় তাঁদের বিপক্ষে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রক্ষণশীল বিচারপতিদের সিদ্ধান্তে ‘ভোটাধিকার আইন’ নানাভাবে দুর্বল হয়ে এসেছে। এই বিচারপতিদের হস্তক্ষেপেই ২০০০ সালে সব ভোট গণনার আগেই জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি অমূলক ভাবনা নয়।

নির্বাচন প্রশ্নে তাঁদের স্বার্থ রক্ষা ছাড়াও গর্ভপাতের অধিকার রদ ও ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি বাতিলের ব্যাপারেও রিপাবলিকান নেতৃত্ব বিচারপতি ব্যারেটের ভোট পাওয়ার আশা করছে। ওবামাকেয়ার প্রশ্নে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের রায় দেওয়ার কথা। টেক্সাসের রিপাবলিকান আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উত্থাপিত এই মামলার রায়ে পুরো ওবামাকেয়ার আইনটিই বাতিল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক আমেরিকান তাদের স্বাস্থ্যবিমা হারাতে পারেন।

ডেমোক্র্যাটদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে তড়িঘড়ি করে ব্যারেটের নিয়োগ চূড়ান্ত করায় শুধু ট্রাম্প নন, পুনর্নির্বাচনে বিপদের মুখে রয়েছেন এমন রিপাবলিকান সিনেটররাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। রক্ষণশীলদের কাছে হোয়াইট হাউসের চেয়েও সিনেটে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অধিক জরুরি। সিনেট নেতা মিচ ম্যাককনেল ও সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম, যাঁরা ভোটের লড়াইতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়েছেন তাঁরা আশা করছেন, ব্যারেটের নিয়োগের পুরস্কার হিসেবে তাঁরা সহজেই ভোটের বৈতরণি পার হতে পারবেন।

ডেমোক্র্যাটরাও যে এই মুহূর্তটিকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন, তাতে সন্দেহ নেই। ব্যারেটের নিয়োগকে তাঁরা নারীর অধিকার ও ওবামাকেয়ারের ওপর হামলা হিসেবে দেখাতে চেষ্টা করছেন। আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন নারী ভোটাররা। এই দুই প্রশ্নই তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বীতশ্রদ্ধ নারী ভোটদাতারা যদি সত্যি সত্যি প্রত্যাশিত সংখ্যায় ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেন, তাহলে শুধু হোয়াইট হাউস নয়, সিনেটেও হয়তো হাত বদল হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0