default-image

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি এখন। এই তীব্র ঠান্ডার মধ্যেও ৩ নভেম্বর নির্বাচনে জয়ী হতে দুই পক্ষ মরিয়া প্রচার চলছে। পেনসিলভানিয়া রাজ্যের আবহাওয়া হিমাঙ্কের কাছাকাছি থাকলেও উত্তেজনা আর উত্তাপ সর্বত্র।

ফ্লোরিডাকে উষ্ণ আবহাওয়ার কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শনিবার পেনসিলভানিয়া রাজ্যে প্রচার চালান ট্রাম্প। বলেছেন, বাইডেনের হাতে যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁর কাছে থাকলে করোনাভাইরাস ধ্বংস হবে, দেশ আবার মহান হয়ে উঠবে।

মিশিগানের উত্তেজনাকর মাঠে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সঙ্গে জো বাইডেন। তাঁরা বলেছেন, এগিয়ে যাওয়া শুরু হবে মঙ্গলবার রাত থেকেই। জনগণ ভোট দিলেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার এই পরিবর্তন শুরু হবে।

মার্কিন আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে, মঙ্গলবার রাত থেকে তাপমাত্রা উষ্ণ হতে শুরু করবে। নির্বাচনের রাতে উষ্ণতা বেড়ে কতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠবে ওয়াশিংটনসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্র, এ নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। নির্বাচনের জের ধরে নগর জনপদ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে কি না, এ নিয়ে চলছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা।

২০১৬ সালের পরাজয় এখনো তাড়া করছে ডেমোক্র্যাটদের। আগাম অনুমানকে অসার করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে কারও কোনো প্রস্তুতি ছিল না।

এবারের নির্বাচনে প্রায় সব জরিপে এখনো এগিয়ে আছেন ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জো বাইডেন। শেষ মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, সুইং স্টেট নামে পরিচিত নর্থ ক্যারোলাইনা ও অ্যারিজোনা রাজ্যে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে ডেমোক্র্যাট সমর্থকেরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। তবে কোনো বিস্ময়কে আবার উড়িয়েও দিচ্ছেন না।

বিজ্ঞাপন
জনমত জরিপ ও সব বাস্তবতা পক্ষে থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের অতি আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। ২০১৬ সালের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে দলের নেতারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো উচ্ছ্বাস দেখাতে রাজি নয়।
মাইক মোরেই, ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ

নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ছুটে যাননি রাজ্য থেকে রাজ্যে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও নিজের বয়স বিবেচনা করে তাঁকে সতর্ক থাকতে হয়েছে। ডেমোক্র্যাট শিবিরের প্রথমদিকের প্রচারণায় ভার্চ্যুয়াল জনসংযোগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রচারে ব্যবহার করেছেন হোয়াইট হাউসকে। রিপাবলিকান দলের প্রচারণা ছিল দরজায় দরজায় কড়া নাড়া। করোনাভাইরাসকে তোয়াক্কা না করেই মাঠ পর্যায়ে তাদের বেপরোয়া প্রচার, সভা-সমাবেশ শুরু থেকেই ছিল।

নির্বাচনী প্রচারে দরজায় দরজায় কড়া নাড়ার বিকল্প নেই। ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদরা এমন বিষয় আঁচ করে দ্রুত মাঠে নেমেছেন। শেষ দিকে ছুটে গেছেন মাঠের জনসংযোগে। জো বাইডেন শেষ মুহূর্তে যাচ্ছেন মিশিগান, উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায়।

এসব রাজ্যে সরাসরি জনসংযোগের ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাচ্ছে জনমত জরিপের সর্বশেষ অবস্থানে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কমলা হ্যারিস ঝাঁপিয়ে পড়েছেন কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের উদ্দীপ্ত করতে। বাইডেন শিবির থেকে হিস্পানিক ভোটারদের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছাতে বেশ বিলম্ব করা হয়েছে। তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে একেবারে শেষ মুহূর্তের প্রচারে।

ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ মাইক মোরেই বলেন, জনমত জরিপ ও সব বাস্তবতা পক্ষে থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের অতি আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। ২০১৬ সালের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে দলের নেতারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো উচ্ছ্বাস দেখাতে রাজি নয়।

জনমত জরিপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের নানা জটিল হিসাব ছাড়াও আলোচনায় জো বাইডেন এগিয়ে আছেন। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটন ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক শক্তি মানুষের কাছে জানা ছিল। তাঁর প্রতি এ দেশের মানুষের সন্দেহ, অবিশ্বাসও প্রকাশ্য ছিল।

দেশের অধিকাংশ এলাকা এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে গুরুত্ব দেননি, এখনো দিচ্ছেন না। লাখো মানুষের মৃত্যুর নিশ্বাস তাঁকে তাড়া করবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত, এমন মনে করা হচ্ছে। এ বাস্তবতা তাঁকে মোকাবিলা করতেই হবে। হয়তো মূল্যটা দিতে হবে ৩ নভেম্বর

রাজনীতির মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে লড়েছিলেন অনেকটা আগন্তুক হিসেবেই। এবারের অবস্থা ভিন্ন। ট্রাম্পের চেয়ে জো বাইডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ অনেক বেশি পছন্দ করে। একজন বিনয়ী রাজনীতিবিদ এবং প্রেসিডেন্টদের মতো আচরণ তাঁর কাছ থেকে লোকজন সহজেই প্রত্যাশা করে। বাইডেনেকে নিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের সহনশীল মনোভাবও দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অর্থের অঢেল প্রবাহকে বড় করে দেখা হয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছেন জো বাইডেন। এক বিলিয়ন ডলারের এই অর্থ প্রবাহের কারণেই টিভি প্রচারণায় বাইডেন শিবির রিপাবলিকানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কোনো কোনো রাজ্যে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের দ্বিগুণ বিজ্ঞাপন চলতে দেখা গেছে।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এক বৈরী বাস্তবতা। মার্চ মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে আগে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ করোনায় সংক্রমিত হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ এলাকা এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাভাইরাসকে গুরুত্ব দেননি, এখনো দিচ্ছেন না। লাখো মানুষের মৃত্যুর নিশ্বাস তাঁকে তাড়া করবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত, এমন মনে করা হচ্ছে। এ বাস্তবতা তাঁকে মোকাবিলা করতেই হবে। হয়তো মূল্যটা দিতে হবে ৩ নভেম্বর।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে দেখা গেছে, গত দুই দশকে প্রবীণদের কাছে ডেমোক্র্যাটদের জনপ্রিয়তা কমেছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রবীণ মার্কিনরা ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে। এবারে তাঁর ব্যতিক্রম স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রবীণদের এই মুখ ফেরানোর ফল দেখা যেতে পারে আগামী মঙ্গলবার।

বিজ্ঞাপন

ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রবীণদের ভোট পাওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটরা জো বাইডেনকে বাহবা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। নারীদের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অজনপ্রিয় নাম। এবারের নির্বাচনে শ্বেতাঙ্গ নারীদের আনুকূল্য পাচ্ছেন জো বাইডেন।

যুব তরুণদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট দল এমনিতেই জনপ্রিয়। যদিও এই জনগোষ্ঠী ভোট দেওয়ার ব্যাপারে তেমনটা উৎসাহী নয়। এবারের নির্বাচনে যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, তাঁর কারণেও যদি তরুণদের ভোটের হার কিছুটা বেশি হয়, তার ফলও পাবেন জো বাইডেন।

নির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই মার্কিন জনগণের প্রতি। সমাবেশে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমকে তুলোধুনো করছেন। জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের দুর্নীতির কথা বলছেন। জো বাইডেনকে নাম ধরে অবমাননাকর উক্তি করছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভয়ংকর প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করছেন। দেশ নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রীদের হাতে চলে যাবে বলে ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু আগামী চার বছর নিয়ে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই তাঁর। লোকজন ধরেই নিতে পারে, ট্রাম্পের অধীনে আরও চার বছরের যুক্তরাষ্ট্র মানে বিশৃঙ্খলার যুক্তরাষ্ট্র!

পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের বক্তব্য স্পষ্ট। তিনি তাঁর শেষ মুহূর্তের বক্তৃতাগুলোতে বলেছেন, চরিত্রই আমার ব্যালটের প্রধান শক্তি। এ চরিত্র আমাদের দেশের চরিত্র। অন্ধকার থেকে আলোর পথে বেরিয়ে আসার চরিত্র। ক্রোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের এলোপাতাড়ি বক্তব্যের পক্ষে, না জো বাইডেনের স্পষ্ট বক্তব্যের পক্ষে। তা জানার জন্য এখন অপেক্ষার পালাও একদম কমে এসেছে। ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে মানুষের অপেক্ষার প্রহর শুরু হয়ে গেছে।

মন্তব্য পড়ুন 0