default-image

জিহাদিদের দমনের চেয়ে স্থানীয় উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গ জঙ্গিদের দমন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। গত দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়া করেছে ‘জিহাদি’ আতঙ্ক। দেশের অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা চরমপন্থীদের দমনে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে। ট্রাম্প–পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ চরমপন্থীরাই এখন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর অভ্যন্তরীণ চরমপন্থীদের দমনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকা শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থীদের শেকড় অনেক গভীরে। গত দুই দশক দেশে জঙ্গি দমন কর্মসূচিতে জিহাদি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ লোকজনকে চিহ্নিত করা ও বিচার করার জোর প্রয়াস ছিল। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন অভ্যন্তরীণ জঙ্গি দমনে মরিয়া হয়ে উঠতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ‘নাগরিক আন্দোলন’, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনসহ ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার পর সবাইকে নড়েচড়ে বসতে দেখা যাচ্ছে। চরম ডান শ্বেতাঙ্গ রক্ষণশীল জঙ্গিদের সঙ্গে বাম ধারার মধ্যেও উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তার জন্য এসব অভ্যন্তরীণ উগ্রপন্থীদের দমনে এখনই নজর দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে বাইডেন প্রশাসন থেকে।

বিজ্ঞাপন
default-image
জিহাদিদের প্রতি স্থানীয় জনগণের কোনো সমর্থন ছিল না। জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন অনেকেই তখন একাই জিহাদি কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। অপরদিকে বর্তমান সময়ে অভ্যন্তরীণ চরমপন্থীদের প্রতি সমাজের একাংশের হলেও সমর্থন আছে

জিহাদি জঙ্গিদের ক্ষেত্রে মনে করা হতো, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর বাইরের উগ্রবাদীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ধরনের লড়াই শুরু হয়। বাইরের জিহাদি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক তরুণ নিজেদের উগ্রবাদের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদিদের কোনো সংগঠন ছিল না বা এখানে তাদের কোনো সাংগঠনিক তৎপরতাও ছিল না। অনেক সময় বাইরের নির্দেশনায় এমন জিহাদি লোকজন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মঘাতী ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এসব চরমপন্থীকে দমন করতেও হিমশিম খেতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের।

জিহাদি অধ্যায়ের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা নতুন উগ্রবাদ দমন কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিল ডটকম এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিহাদি ভাবাদর্শ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রে জেগে ওঠা বর্তমান উগ্রবাদের শিকড় দেশটির রাজনীতি ও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। এসব উগ্রবাদ দমনের জন্য আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণ না করলে গত শতকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সামাজিক অস্থিরতার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জিহাদিদের প্রতি স্থানীয় জনগণের কোনো সমর্থন ছিল না। জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন অনেকেই তখন একাই জিহাদি কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। অপরদিকে বর্তমান সময়ে অভ্যন্তরীণ চরমপন্থীদের প্রতি সমাজের একাংশের হলেও সমর্থন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভক্ত সমাজের একটা অংশের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান চরমপন্থীদের উত্থান ঘটছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থীরা সংগঠিত।

default-image

১৯৯৫ সালে ওকলাহোমার বোমা হামলার ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শীর্ষ হামলা হিসেবে দেখা হয়। এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়া ততটা তীব্র দেখা যায়নি। গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার পর নতুন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে সমাজে। হালাকারীদের জঙ্গি হিসেবে, তাদের সংগঠনকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা নিয়ে সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এদের পক্ষে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিশালী পক্ষের নীরব বা প্রকাশ্য সমর্থন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকে দেখা জিহাদি লোকজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রের অপ্রতুলতা ছিল। অন্যদিকে বর্তমান অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো অভাব নেই। আগ্নেয়াস্ত্র আইনের সুযোগে অনেকেরই বৈধ অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের মহড়া প্রকাশ্যে দেখা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে। এসব উগ্রবাদীকে দমনের বিষয়টিও এখন বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

বহু শ্বেতাঙ্গ ডান উগ্রবাদীদের রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী, পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর প্রশিক্ষণ। ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের ঘটনায় এমন বহু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশিক্ষিত এসব উগ্রবাদী সন্ত্রাস, সহিংসতা ও জঙ্গি কার্যক্রমে মারাত্মক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে।

জিহাদি দমনে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় বেশ কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বর্তমান উগ্রবাদীদের অবস্থান কোনো বিশেষ এলাকায় নয়। তাই এদের লক্ষ্য করে প্রতিরোধ কার্যক্রম গ্রহণ করাও কঠিন বলে মনে হচ্ছে। বর্তমান উগ্রবাদী সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করাও দুরূহ হবে। এ ছাড়া উগ্রবাদীদের শনাক্ত করার পর বিচার নিশ্চিত করাও সহজ হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ সমাজের, প্রশাসনের নানা স্তরে এসব উগ্রবাদীর প্রতি সহমর্মী লোকজনের অবস্থান রয়েছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় জিহাদিদের সহজেই বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। দায় স্বীকার করে অনেকের দণ্ড হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের বিচারের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা দুরূহ হয়ে উঠতে পারে। আদালতে বিচারের মুখোমুখি এমন কোনো উগ্রবাদীর প্রতি সহানুভূতিশীল মাত্র একজন জুরি সদস্যের কারণে পুরো দণ্ড থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পার পেয়ে যেতে পারে।

দ্য হিল–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরও অনেক বাস্তবতার মতো যুক্তরাষ্ট্রকে এখন অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদ মোকাবিলা করতে হবে তীব্রভাবে।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন