ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন

মাত্র দুই মাস পর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন বিভিন্নভাবে প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন। দুই দলের জাতীয় সম্মেলনের পরে দুই প্রার্থীর কারোরই জনসমর্থনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেনি। জাতীয় পর্যায়ের সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোর গড় হিসাবে বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন ৭ পয়েন্টে। নির্বাচনের প্রায় ৮ সপ্তাহ আগে এবং জাতীয় জরিপের এই সব ফল ডেমোক্র্যাটদের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও প্রার্থী বাইডেনের সামনে এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এটিকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করার ওপর নির্ভর করছে বাইডেন এই অনুকূল পরিস্থিতিকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারবেন কি না।

বাইডেনের জন্য এখন বড় বিষয় হয়ে উঠেছে নির্বাচনের মুখ্য বিষয়ে তাঁর অবস্থানে স্থির থাকা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাতা ফাঁদে না দেওয়া। এবারের নির্বাচনের মুখ্য বিষয় বা ইস্যু নিয়ে দুই দলের অবস্থানে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর দল এই নির্বাচনকে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচন বলে দাঁড় করাতে চান। কয়েক মাস ধরে পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং নাগরিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের সময় যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং এখনো কোথাও কোথাও যা অব্যাহত আছে, তাকেই পুঁজি করে তিনি বলছেন যে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে দেশে নৈরাজ্য হবে। ফলে তাঁকে ভোট দেওয়া দরকার দেশকে উগ্র বামপন্থীদের© হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, বাইডেন এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত সাড়ে তিন বছরের শাসনের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার সুযোগ বলেই দেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ট্রাম্পের ব্যর্থতা, যার পরিণতিতে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি নাগরিক মারা গেছেন, ৬ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং দেশের অর্থনীতি ধসে গেছে—তা ট্রাম্পের নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং দায়িত্বহীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ; ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হলে অবস্থা আরও খারাপ হবে।

যদিও ট্রাম্প যেভাবে সহিংসতাকে চিত্রিত করছেন তাতে অতিশয়োক্তি আছে, তাঁর পক্ষে যেসব উগ্র দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়া সহিংসতা চালাচ্ছে, তাদের প্রতি খোলামেলাভাবেই তিনি সমর্থন জানাচ্ছেন, শৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিভিন্ন শহরে ফেডারেল বাহিনী পাঠিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপরে হামলা করাচ্ছেন এবং তাঁর উসকানিমূলক বক্তব্যে অবস্থার অবনতি ঘটাচ্ছে। কিন্তু তিনি এগুলোর বদলে সহিংসতার প্রতি বাইডেন এবং ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন আছে এমন বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছেন, ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।

ট্রাম্পের ধারণা, ভয় ছড়ালে তাঁর কট্টর সমর্থকেরা ছাড়াও শহরতলির মধ্যবিত্তদের মধ্যে, বিশেষত মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে তাঁর ভোট বাড়বে। ২০১৬ সালে এ ধরনের বক্তব্য কাজে দিয়েছে। তিনি পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে গোটা আন্দোলনকেই চিত্রিত করতে চাইছেন সহিংসতা বলে। তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তাঁর সরকারের ব্যর্থতা এবং অর্থনীতির দুর্দশার বিষয় চাপা দেওয়া। ফলে বাইডেনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে এটা স্পষ্ট করা যে তিনি সহিংসতার বিরুদ্ধে, কিন্তু নাগরিকদের আন্দোলনের পক্ষে। নাগরিকদের এই আন্দোলনের প্রতি বাইডেন এবং ডেমোক্র্যাটরা সমর্থন জানিয়ে এসেছে এবং পুলিশি ও বিচারব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

কিন্তু বাইডেন যদি কেবল এই সহিংসতা এবং ‘আইনশৃঙ্খলা’ নিয়ে কথা বলেন, তবে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যুতে পরিণত হবে, যা ট্রাম্পের জন্য সুবিধাজনক। আবার এই বিষয়ে কিছু না বললে ট্রাম্প যে প্রচার চালাচ্ছেন যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অপরাধ ও অপরাধীদের ব্যাপারে শক্ত নয়—সেই বক্তব্যকে জোরদার করা সম্ভব হবে। রিপাবলিকানরা সব সময় ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করে যে তারা আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে দুর্বল।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে বাইডেনকে একই সঙ্গে সহিংসতা এবং মহামারি—দুটো বিষয়েই বলতে হচ্ছে। ট্রাম্পের সুবিধা হচ্ছে, তিনি মহামারি বিষয়ে কিছুই বলছেন না। তাঁর প্রচারণা দেখলে মনেই হয় না দেশে এ ধরনের একটি বিপদ চলছে এবং প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। ফলে তাঁর প্রচারণার ফোকাস একদিকে। বাইডেন গত সোমবার তাঁর বক্তৃতায় সব ধরনের সহিংসতার নিন্দা করেন এবং ট্রাম্পকে সব ধরনের সহিংসতার, বিশেষ করে ট্রাম্পের সমর্থক উগ্র দক্ষিণপন্থীদের করা সহিংসতার নিন্দা জানাতে চ্যালেঞ্জ করেন। ট্রাম্প তারপরও সহিংসতার জন্য কেবল ‘বামপন্থী উগ্রবাদীদের’ দায়ী করে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার উইসকনসিনের কেনোশায় সফরের সময়ও তিনি একই কথা বলেছেন এবং পুলিশের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন।

কেনোশায় গত ২৩ আগস্ট কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ জেকব ব্লেইক পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার পর সেখানে বিক্ষোভ চলছে; অধিকাংশ প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ১৭ বছর বয়সী একজন শ্বেতাঙ্গ তরুণ কাইল রিটেনহাউস বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে দুজন মারা যান, একজন আহত হন। ট্রাম্প রিটেনহাউসকে নিন্দা না করে তাঁর প্রতি কার্যত সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেনের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনি কী করে এই দুই বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেন এবং তিনি যে বিষয়কে নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে বলে মনে করেন, তাকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখেন। এখন পর্যন্ত মহামারি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যর্থতাই নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্প এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচার দলের প্রাণপণ চেষ্টা হচ্ছে আন্দোলনের সময় সহিংসতাকেই আলোচনায় রাখতে, প্রধান বিষয়ে পরিণত করতে। আগামী দুই মাসে বাইডেন সেই চেষ্টা ঠেকিয়ে দিতে পারেন কি না এবং ট্রাম্পের ব্যর্থতাকে মুখ্য বিষয় হিসেবে রাখতে পারেন কি না, তার ওপর নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন