default-image

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে যেভাবে মিথ্যাচার করে আসছেন, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাঁর আইনজীবী দলের ওপর। প্রাথমিকভাবে ঘোষিত আইনজীবীদের অনেকেই তাঁর হয়ে সিনেটে অভিশংসন মামলা লড়তে রাজি নন। ক্ষমতা ছাড়ার এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই এই বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছেন ট্রাম্প। তবে এখনো তিনি তাঁর পাশে পাচ্ছেন রিপাবলিকান দলকে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপাবলিকান দল এখনো সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেই আছে। ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিল হামলার পর দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের একটা দূরত্ব তৈরি হলেও, তা এখনো বিদ্যমান বলা যাবে না। বলা যায়, বিরহকাল শেষ হয়েছে। দলটির নেতৃত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার বদলে তাঁকে দলীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবেই বিবেচনা করছে বেশি। এ ক্ষেত্রে ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ অবস্থায় গতকাল শনিবার সিএনএনের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের আইনজীবীদের পিছু হটার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার থেকে তাঁর দলের মনোভাব একেবারেই আলাদা। ৬ জানুয়ারির পর আইনপ্রণেতাদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ক্ষোভ অনেকটাই মিইয়ে এসেছে। এ জায়গাটি এখন দখল করছে আশা ও শঙ্কার যুগপৎ ভাবনা। আর এই দুই ভাবনাই মূলত আগামী বছর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গেলে তাঁর সমর্থক গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হতে পারে, যা তাঁদের নির্বাচিত হওয়া-না হওয়ায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তাঁরা। এটা যদি শঙ্কার কারণ হয়, তবে আশার কারণটি ঠিক তার বিপরীত। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা নির্বাচিত হতে চাইছেন।

বিজ্ঞাপন

রিপাবলিকান পার্টি যখন শুধু তাদের রাজনৈতিক জয়-পরাজয় দিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত কাজগুলোকে ক্ষমা করে দিচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও এর সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীরা বিষয়টিকে নৈতিক মানদণ্ড থেকে বিচার করছেন। তাঁরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিতে করা ট্রাম্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং এ ধরনের কাজকে প্রশ্রয় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের এই অবস্থান রিপাবলিকান দলের অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নচিহ্নকে আরও বড় করে তুলছে।

সিনেটে অভিশংসন শুনানিতে ট্রাম্পের পক্ষে লড়াই করতে না চাওয়া পাঁচ আইনজীবী হলেন—বাচ বাওয়ারস, ডেবোরাহ বারবিয়ার, জশ হাওয়ার্ড, জনি গ্যাসার ও গ্রেগ হ্যারিস। এই পাঁচ আইনজীবীর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, শুরুতে বলা হয়েছিল, অভিশংসন শুনানিতে সাবেক প্রেসিডেন্টের অভিশংসনযোগ্য কিনা এই আইনি প্রশ্নটিই মুখ্য হয়ে উঠবে। এই ভিতে দাঁড়িয়েই তাঁরা ট্রাম্পের পক্ষে লড়াই করবেন। কিন্তু পরে ট্রাম্প জোর করতে থাকেন, আইনজীবীরা যেন নির্বাচনে কারচুপির বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁরা যেন বলেন, গত নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ষড়যন্ত্র করে এবং ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে পরাজিত করা হয়েছে। এই জায়গাতেই গোল বাঁধে। শুনানি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া আইনজীবীরা এই বিতর্ককে আর সামনে আনতে রাজি নন।

কিন্তু রিপাবলিকান দল এই নৈতিকতার প্রসঙ্গটি আমলে নিচ্ছে না। বরং তারা ট্রাম্পের পাশেই আছে। সিনেটে অভিশংসন বিলটি ওঠার পরই এটি পরিষ্কার হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, তরুণ অনেক রিপাবলিকান নেতা এখন ট্রাম্পের ভাষাতেই কথা বলছেন। জর্জিয়ার রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জোরি টেইলর গ্রিন গতকাল শনিবার টুইটে ট্রাম্পের মতোই ঝড় তুলেছেন। ট্রাম্পের ‘মহান আহ্বানের’ কথা উল্লেখ করে তিনি নিজেকে ‘রক্তপিপাসু সংবাদমাধ্যমের’ ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পের দাবি করা ‘নির্বাচনে জালিয়াতির’ ভুয়া অভিযোগের পুনরুল্লেখও করেছেন তাঁর বক্তব্যে। তাঁর এই পোস্টে ন্যান্সি পেলোসিকে হত্যার হুমকি দেওয়া এক মন্তব্যেও তিনি লাইক দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এমন বক্তব্য ও অবস্থানের কোনো নিন্দা রিপাবলিকান দল থেকে আসেনি। প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান দলীয় নেতা কেভিন ম্যাককার্থি এ বিষয়ে টেইলর গ্রিনের সঙ্গে আলাপের কথা বললেও আর কোনো পদক্ষেপ নেননি। এদিকে গ্রিনও জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি তাঁর বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইবেন না। বরং এই বিষয়টিকে এড়িয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে যেসব রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ভোট দিয়েছেন, তাদের নানাভাবে তিরস্কার ও নিন্দা জানাচ্ছে দলটির আঞ্চলিক ইউনিটগুলো।

রিপাবলিকান দলের বর্তমান অবস্থান ট্রাম্পমুখী হলেও তা কত দিন থাকবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ, ৬ জানুয়ারির ঘটনার পর ট্রাম্পের অভিশংসন প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে উঠলে, তার পক্ষে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ভোট দেন। পরে দেখা গেল, পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে

সিএনএন জানায়, মার্জোরি টেইলর গ্রিনের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেটিক দলের অন্তত ৫০ জন সদস্য দাবি তুলেছেন, গ্রিনকে যেন প্রতিনিধি পরিষদ থেকে অপসারণ করা হয়। সঙ্গে আরও অনেকে তাঁকে বিভিন্ন কমিটির দায়িত্ব থেকে অন্তত অপসারণের কথা বলেছেন। কিন্তু রিপাবলিকান দল এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলেই মনে হচ্ছে। যদিও জর্জিয়ার এই রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে ইসলাম ও সেমেটিক ধর্মবিদ্বেষ এবং বিতর্কিত গোষ্ঠী কিউঅ্যাননের সমর্থক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিউঅ্যানন গোষ্ঠীটি মনে করে, শিশু নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত তারকা ও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেই ট্রাম্পের আবির্ভাব। নতুন এক গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিনির্মাণের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করা এই গোষ্ঠীকে এই মুহূর্তে দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের মতো ভাষাতেই এখন কথা বলছেন টেইলর গ্রিন।

এ বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যালয়ের মন্তব্য চেয়েও পায়নি সিএনএন।

মুশকিল হচ্ছে, রিপাবলিকান দলের বর্তমান অবস্থান ট্রাম্পমুখী হলেও তা কত দিন থাকবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ, ৬ জানুয়ারির ঘটনার পর ট্রাম্পের অভিশংসন প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে উঠলে, তার পক্ষে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ভোট দেন। পরে দেখা গেল, পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধে না যাওয়ার নীতিতে তারা আবার ফিরে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থানই শেষ কথা—এমন ভাবার সুযোগ তেমন নেই। আপাতত অভিশংসন শুনানিতে ট্রাম্প তাঁর পাশে দলকে পেলেও, পরে তা বদলেও যেতে পারে। যা-ই ঘটুক রিপাবলিকান দলকে এক কঠিন সময় পাড়ি দিতে হবে। ট্রাম্পের পাশে তারা শেষ পর্যন্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অস্থিরতা বাড়বে এবং দলে এক ব্যক্তির নেতৃত্ব অনেকটাই স্থায়ী হবে। অন্যদিকে বিরোধী অবস্থান নিলে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত রিপাবলিকান দলকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন