default-image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, ২ ট্রিলিয়ন ডলারের এই ফেডারেল কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জনগণকে সরাসরি সহযোগিতা দেওয়ার আরেকটি পরিকল্পনা তিনি শিগগিরই ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ পুরো নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে নিয়মিত নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ২১ সিনেট সদস্য। প্রভাবশালী এসব আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আগামী প্রণোদনা প্রস্তাবে যেন জনগণের জন্য এই সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে।

৩১ মার্চ পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ থেকে দেওয়া বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, পুনর্গঠনের এমন উদ্যোগ এক জন্মে একবারই নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ হাজার কিলোমিটার সড়ক, মহাসড়কের উন্নয়নকাজে হাত দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
  • বাইডেনের ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা

  • জনগণকে সরাসরি সহযোগিতার পরিকল্পনা

  • করোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থ সহায়তা দেওয়ার আহ্বান সিনেটরদের

প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন, সারা দেশে কয়েক হাজার ব্রিজ নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ হবে এবং গণপরিবহনে বিপুল অঙ্কের ফেডারেল বরাদ্দ দেওয়া হবে। এক জীবনে এমন বড় অঙ্কের ফেডারেল অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে করে ভালো মজুরির চাকরি সৃষ্টি হবে। একবিংশ শতাব্দীতে মহাকাশ অভিযানে বিনিয়োগের মতো বড় বিনিয়োগ করা হবে। এ বিনিয়োগের জন্য করপোরেট ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হবে। তবে যেসব পরিবারের আয় বছরে চার লাখের কম, তাদের ওপর কোনো কর বৃদ্ধি করা হবে না।

মহামারিতে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, ধনী এক শতাংশ মানুষ আরও সম্পদশালী হয়েছে। পরিবর্তনের এখনই সময় উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তলানি থেকে গড়ে তোলার সময় এসেছে। ওপর থেকে নয়, এই পুনর্নির্মাণ নিচে থেকে শুরু করতে হবে।

ঐতিহাসিক এই উন্নয়ন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড, নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ, সংস্কার, পাওয়ার লাইনের উন্নয়নের মতো বিষয়। প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে চান। অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থ থেকে এসব খাতেও বরাদ্দ থাকবে। তিনি বলেন, অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রে এবারের প্রবৃদ্ধি হবে ছয় শতাংশ এবং দারিদ্র্যের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে। এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বিরল।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, সম্পদ নয়, কাজকে পুরস্কৃত করা হবে। ওয়াল স্ট্রিট (স্টক মার্কেট অর্থে) নয়, মধ্যবিত্তরাই যুক্তরাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আবার এ মধ্যবিত্তদের শক্তিশালী করব।’

ক্ষমতা গ্রহণের পরই প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মহামারিতে অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থায় পড়া মার্কিন জনগনকে উদার প্রণোদনা সাহায্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই জনপ্রতি ১ হাজার ৪০০ ডলার করে নগদ অর্থ পাঠানো হয়েছে। বেকার ভাতার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেকার ভাতার সঙ্গে সপ্তাহে অতিরিক্ত ৩০০ ডলার করে দেওয়া হচ্ছে। ডেমোক্রেটিক দলের বেশ কিছু আইন প্রণেতা সরাসরি নাগরিক প্রণোদনা নিয়মিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বেকার ভাতা প্রাপ্তির মেয়াদ বৃদ্ধিরও আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শিক্ষা, শিশু পরিষেবা ও সামাজিক নানা কাজের জন্য নাগরিক সহযোগিতা নিয়ে তিনি তাঁর আরেকটি প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন।

প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এসব প্রস্তাবকে উচ্চাভিলাষী ও ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করেছেন রিপাবলিকান নেতারা। সিনেটে রিপাবলিকান দলের নেতা মিচ ম্যাককনেল বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর এ নিয়ে আলাপ হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বাইডেনের প্রস্তাবে আয়কর বৃদ্ধির অনেক ফাঁক–ফোকর আছে।

বিজ্ঞাপন

এ পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটিক দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কংগ্রেস ও সিনেটে সমঝোতা না হলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বাইডেনের পরিকল্পনার পক্ষে আইন পাশ করা হবে।

এদিকে প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট সিনেটর, ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান রন ওয়াইডেন করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত নগদ নাগরিক প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলেছেন। অন্যান্য আইনপ্রণেতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে এ নিয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। গত ৩০ মার্চ দেওয়া এক আবেদনে তাঁরা বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণ এখনো ব্যাপকভাবে বিরাজমান। কবে এ সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আইনপ্রণেতারা বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে এই সংক্রমণের জের ধরে মার্কিন জনগণের অর্থনৈতিক নাজুক অবস্থা প্রলম্বিত হচ্ছে। লোকজন যেন অর্থনৈতিকভাবে অসহায় না হয়ে পড়ে, এ জন্যই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত মাসিক নগদ অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কিছুদিন পর পর মার্কিন জনগণ যাতে কংগ্রেসের আইন প্রণয়নের বিলম্বিত প্রক্রিয়ায় নাজেহাল না হয়, সে জন্য নাগরিক প্রণোদনা নিয়মিত করে আইন প্রণয়নের জন্য এসব আইন প্রণেতা আহ্বান জানান।

২০২০ সালের মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়তে থাকলে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির অর্থনীতি থমকে দাঁড়ায়। অর্ধেকের বেশি কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই তিন দফা কোভিড সংক্রমণের ঢেউ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন চতুর্থ দফা সংক্রমণের মুখোমুখি। এক কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ এখনো বেকারভাতা নিচ্ছে।

আইন প্রণেতারা মনে করছেন, বারবার জনগণকে সাহায্যের নামে কংগ্রেসে উত্তেজনা সৃষ্টি না করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় না আসা পর্যন্ত টানাপোড়েনে থাকা জনগণের নাগরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সিনেটর রন ওয়াইডেন, সিনেটর ডিক ডুরবিন, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, সিনেটর শেরোড ব্রাউন, সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন একমত হয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি এই নাগরিক প্রণোদনার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে উদারনৈতিক কংগ্রেসউওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ঘোষিত কর্মসূচি অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেছেন। আরও বড় ধরনের নাগরিক প্রণোদনা নিয়ে ইতিহাসের নজিরবিহীন এ সংকটে জনগণের পাশে দাঁড়াতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

২০১৯ সালে পিটসবার্গে দাঁড়িয়ে জো বাইডেন মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। অবকাঠামো উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা দিয়ে এই পিটসবার্গে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, এখনই কাজ শুরু করার উপযুক্ত সময়। আজ থেকে ৫০ বছর পর মানুষ পেছনে তাকিয়ে দেখবে এবং স্মরণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটিকে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন