default-image

করোনাভাইরাসের কারণে অনেক বাংলাদেশি মার্কিন কর্মহীন হয়েছেন। আর্থিক সংকটে কষ্টে দিন যাপন করতে হয়েছে। আবার এরই মধ্যে অনেকে মাথা খাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি মার্কিনদের অনেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে বিপুল অর্থ আয় করেছেন। ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে বছর খানিক আগেও যাদের সংসার চলত ট্যাক্সিক্যাব চালিয়ে, তারাই এখন মার্কিন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে লাভবান হয়ে অন্য প্রবাসীদেরও এখানে বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছেন। ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি মার্কিন মো. আবুল কাসেম এমনই একজন বিনিয়োগকারী। তিনি গত বছর শেয়ারবাজারে ৩ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করেন। গত মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের প্রকোপে যুক্তরাষ্ট্র যখন নাকাল, ঠিক তখন মার্কিন শেয়ারবাজারেও ইতিহাসের বড় ধস নামে। কিন্তু সেই মুহূর্তে কাসেম কিছু কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে রেখেছিলেন।

কাসেম বলেন, ‘ক্যাব ব্যবসার পাশাপাশি অল্প কিছু ডলার আগে থেকে বিনিয়োগ করতাম। কিন্তু করোনার মধ্যে কয়েক হাজার পেনি ও টেসলার কিছু শেয়ার কিনে রেখেছিলাম। তারপর ২০২০ সালের শেষের দিকে পেনি ও টেসলার শেয়ার বিপুল পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পর বিক্রি করা শুরু করি। এরপর চলতি বছর পর্যন্ত আমার বিনিয়োগের পর ১.৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। এখন আমার ফুলটাইম ব্যস্ততা এই শেয়ারবাজার নিয়ে।

কাসেমের মতো আরও দুই বাংলাদেশি উবার চালক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেন করোনাকালে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই দুজনই আবার বন্ধু। তাঁরাও বসবাস করেন ভার্জিনিয়ায়।

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকাকে তাঁরা বলেন, ‘আমরা দুই বন্ধু শেয়ারবাজারে গত বছর ৭–৮ হাজার ডলার নিয়ে বিনিয়োগ শুরু করি। আমাদের বিনিয়োগের পর বর্তমানে আয় হয়েছে তিন থেকে চার লাখ ডলার।

বিজ্ঞাপন

ভার্জিনিয়ার আরেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ১০টি সাবওয়ের মালিক। শেয়ারবাজার সম্পর্কে তাঁর তেমন কোনো ধারণা ছিল না। বন্ধুর পরামর্শে অনেক ভেবে–চিন্তে গত বছর করোনার সময় ১০ ডলার করে একটি কোম্পানির ২৭ হাজার শেয়ার কেনেন। হঠাৎ করে কয়েক মাস পর ওই কোম্পানির একেকটি শেয়ারের দাম যখন ৬৩ ডলার উঠে, ঠিক তখনই তিনি সব শেয়ার বিক্রি করে দেন। ওই কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে ওই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর আয় হয় ১.৭ মিলিয়ন ডলার। এই বাংলাদেশি প্রথম আলো উত্তর আমেরিকাকে বলেন, তিনি আয়ের এই অর্থ হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছেন।

নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি মার্কিন এক ব্যবসায়ী বলেন, গত বছর করোনাকালে যখন টেসলা কোম্পানির শেয়ারের দাম কম ছিল, তখন আমার ব্যাংকে তেমন অর্থ ছিল না। একদিকে করোনা, অন্যদিকে ব্যবসায় ধস। আর্থিকভাবে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। টুকটাক শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ ছিল। কিন্তু করোনার সময় সেই বিনিয়োগের অর্থ খরচ করে ফেলি। তারপর অনেক ভেবেচিন্তে আমার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ১১ হাজার ডলার তুলে শেয়ার বাজারে টেসলার শেয়ার কিনি। এক মাস পর টেসলা শেয়ার বিক্রি করে আয় হয় ১০ হাজার ডলার।

নিউইয়র্কে আইটি খাতের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন বাংলাদেশি মার্কিন আনিসুজ্জামান। করোনায় চাকরি চলে যাওয়ার পর শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করেন। শুরুর দিকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাইয়ের পরামর্শে ৩ হাজার ডলারের বিটকয়েন শেয়ার কেনেন। গত মাসে সেই বিটকয়েন তিনি ১৯ হাজার ডলারে বিক্রি করেন। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তাঁর বিনিয়োগ ৩০ হাজার ডলারের বেশি।

আনিসুজ্জামান বলেন, শেয়ারবাজারে করোনাকালে যদিও ধস নেমেছিল, কিন্তু এখানে বিনিয়োগের আগে ভেবেচিন্তে করা উচিত। অন্যরা কত আয় করল, কত বিনিয়োগ করল সেটা না দেখে ভালো করে চিন্তা করে পরামর্শ নিয়ে ছোট শেয়ারে বা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ নিয়ে যদি কেউ পরিকল্পনা করে, তাহলে সেটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

মার্কিনদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি যেমন লাখ লাখ ডলার আয় করছেন, তেমনি হতাশাও আছে শেয়ারবাজারে।

গত বছরের ২০ জুন ইলিনয় রাজ্যের নেপারভিলে ২০ বছর বয়সী অ্যালেক্স কেয়ার্নস নামের এক কলেজছাত্র ৭ লাখ ডলার নেগেটিভ ব্যালেন্স দেখার পর হতাশায় আত্মহত্যা করেন। শেয়ারবাজারে অ্যাপ রবিনহুডে বিনিয়োগ করেন তিনি। গত সপ্তাহে অ্যালেক্সের পরিবার রবিনহুডের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ ছাড়া অনেকে শেয়ারবাজারে না বুঝে বিনিয়োগ করে সর্বস্ব হারিয়েছেন—এমন ঘটনাও ঘটেছে।

এ সম্পর্কে সিস্টেম আর্কিটেক্ট (ইউএস ফেডারেল) শাহাদাত হোসাইন বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। শুরুর দিকে কম বিনিয়োগ করাই ভালো। তবে মার্কিন শেয়ারবাজার বাংলাদেশের মতো না। এখানে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। তাই সহজে বিনিয়োগের অর্থ খোয়া যাবে, এমন কিন্তু নয়।

শাহাদাত হোসাইন আরও বলেন, আমি নিজেও কিছু বিনিয়োগ করেছি শেয়ারবাজারে। আমার ভাইও করছেন। শেয়ারবাজার আর রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসা কিন্তু একে অপরের কাঁধে চলে। যখন রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মার্কেট ভালো থাকে, তখন স্টক মার্কেটে আয় করার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

শাহাদাত বলেন, বর্তমানে অনেক প্রবাসী শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে মিলিয়ন ডলার আয় করছেন, তার প্রধান কারণ বেশির ভাগ ঘরে বসে কাজ করছেন। শেয়ারবাজারে সময় দিতে পারছেন, বুঝেশুনে শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন। এই দেখুন স্পেস এক্সের প্রতিষ্ঠাতা, টেসলারের প্রধান নির্বাহী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক গত সপ্তাহে ১.২ মিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন। এরপর বিটকয়েনের শেয়ারের দাম আরও বেড়ে গেল।

এর আগে মাস্ক টুইট করেছিলেন, তখনো বিটকয়েন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এখন ভ্যানগার্ডের মতো আরেকটি নামী কোম্পানি ৫৭ মিলিয়ন ডলার টেসলা শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে। তাহলে বলাই যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার কতটা শক্তিশালী!

শাহাদাত আরও বলেন, আমি কোনো শেয়ারবাজার বিশষজ্ঞ নই। এই কথাগুলো আমার নিজের বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। তবে এটা সত্য, প্রযুক্তির কারণেই কিন্তু শেয়ারবাজার আজ এই জায়গায়। প্রযুক্তি মানে শুধু ৩জি থেকে ৪জি স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের গতিকে বোঝায় না। প্রযুক্তির সঙ্গে কিন্তু আরও অনেক অনেক কিছু যুক্ত আছে বলেই মানুষ আজ সহজে ঘরে বসে শেয়ারবাজার ব্যবসায় সহজে বিনিয়োগ করছে। এটি যখন ৫জি থেকে ৬জি হবে, তখন শেয়ারবাজারে আরও বিনিয়োগ বাড়বে।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন