default-image

করোনা মহামারি মোকাবিলার জন্য বিশ্বের সব অঞ্চলেই প্রথম যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়, তার একটি হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা। যুক্তরাষ্ট্রের লাস-ভেগাস শহরও এর ব্যতিক্রম নয়। এই নতুন বাস্তবতায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনলাইন ক্লাসসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট থেকে পরিত্রাণ দিতে পারেনি। ফলে করোনাকালের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে শিশু থেকে তরুণ বয়সীদের মধ্যে বিষণ্নতার সংকট। এটি মোকাবিলা করা ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছে। লাস ভেগাসেই যেমন কিশোর-তরুণদের মধ্য আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা রোধ করতে শহরটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে এখন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের মার্চে করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে নেভাদার ক্লার্ক কাউন্টির ১৮ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ তালিকায় এমনকি ৯ বছরের শিশুও রয়েছে। আগের বছরের ১২ মাসে নয়জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল। আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে বা ভীষণ বিষণ্নতায় ভুগছে—এমন শিক্ষার্থীদের শনাক্তের জন্য ব্যবহৃত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সময়ে মোট ৩ হাজার ১০০টিরও বেশি সতর্কতা পেয়েছেন কর্মকর্তারা। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে ৩ হাজার ১০০ বারের বেশি বিভিন্ন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতি করার কথা ভেবেছে, যা তাদের আচরণে প্রকাশ পেয়েছে। লাস ভেগাস শহর ও এর আশপাশের অঞ্চলে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও এমন প্রবণতার ক্রমবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম বৃহত্তম কাউন্টি ক্লার্ক কাউন্টির কর্তৃপক্ষের ওপর শিক্ষার্থীদের দ্রুততম সময়ে স্কুলে ফিরিয়ে আনতে চাপ তৈরি করছে। এটা এতটাই যে, চলতি মাসে লাস ভেগাসের শিক্ষা বোর্ড কিছু এলিমেন্টারি স্কুল খুলে দেওয়ার কথা ভাবছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যদিও লাস ভেগাসে করোনা সংক্রমণ ও এ থেকে মৃত্যুহার দুইই এখনো উঁচুতে।

বিজ্ঞাপন
শুধু লাস ভেগাস নয়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই এখন এ ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের এমনকি আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে

শুধু লাস ভেগাস নয়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই এখন এ ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের এমনকি আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন এই দুই ঝুঁকির মধ্যে কোন ঝুঁকিটি বেশি মারাত্মক, তা নিয়ে পর্যালোচনা করছেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি অ্যারিজোনার শিক্ষা তত্ত্বাবধায়কদের মতো অনেককেই অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ রাখতে বাধ্য করেছে, যেখানে তাঁরা করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট মানসিক সমস্যা মোকাবিলায় এবং করোনার বিস্তার রোধে সব শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

ক্লার্ক কাউন্টির শিক্ষা তত্ত্বাবধায়ক জেসুস জারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘যখন শিশুদের মধ্য আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের বুঝতে হবে, শুধু কোভিডের বিস্তার ও এর কারণে মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে থাকলে আর চলবে না। আমাদের সন্তানদের দিকে নজর রাখার, তাদের পাশে দাঁড়ানোর একটা উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

২০২০ সালে কতজন আত্মহত্যা করেছে এবং এর কারণ কী ছিল, সেসব তথ্য এখনো এক জায়গায় করা হয়নি। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, গত বছরে মহামারিকালে হওয়া আত্মহত্যার সব ঘটনাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। তবে মার্কিন সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) দেওয়া তথ্যমতে, এই সময়ে মানসিক সংকট নিয়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে হাসপাতালে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা কমেছে। কারণ, করোনার কারণে সতর্কতা হিসেবে এমন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসা লোকের সংখ্যা কমেছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও আত্মহত্যা এমন এক বিষয়, যা যুক্তি মানে না। কোনো বিশেষ আত্মহত্যার ঘটনা সম্পর্কে আগে থেকে সতর্ক হওয়ার উপায় পর্যন্ত থাকে না। মহামারি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সব বিষয় এখন সামনে আসছে, যার মুখোমুখি তাঁরা এর আগে কখনো হননি। ফলে এই সময়ে আত্মহত্যার কারণ শনাক্ত করাটা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিডিসিতে শিশুদের ওপর সহিংসতা ও উদ্বেগের প্রভাব নিয়ে কাজ করেন গ্রেটা মাসেত্তি। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এখনকার পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। কারণ, শিশুদের একটি বড় অংশই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রদত্ত সেবার ওপর নির্ভরশীল। করোনার কারণে এই দরজাটি এখন বন্ধ। ফলে তাদের যাওয়ার জায়গা নেই।’

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাইরেনটি বাজিয়েছেন ব্র্যাড হানস্ট্যাবল। গত বছরের এপ্রিলে ১২ বছর বয়সী ছেলে হেডেনের আত্মহত্যার পর তাকে সমাহিত করে এই বাবা এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমার ছেলে করোনায় মারা গেছে। কিন্তু আপনারা যেভাবে ভাবছেন, সেভাবে নয়।’ সম্প্রতি ছেলের মৃত্যু নিয়ে স্থানীয় এক সংবাদপত্রের সঙ্গে আলাপচারিতায় হানস্ট্যাবল জানান, লকডাউনের সময় তাঁর ছেলে স্কুল ও স্কুলের বন্ধুদের ভীষণ রকম মিস করেছে। ফুটবল খেলা খুব পছন্দ করত। লকডাউনের কারণে, তাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সে ভিডিও গেমে বুঁদ হয়ে যায়। কিন্তু তাও তাকে বাঁচাতে পারেনি। ১৩তম জন্মদিনের চার দিন আগে সে ফাঁস নেয়।

বিজ্ঞাপন

ঠিক এই পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই করোনার প্রথম ঢেউ থামতে না থামতেই নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরের স্কুলগুলো সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মিশ্র পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে চাওয়া হয় বাড়তি তহবিল। কিন্তু সে সময়ের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এর বিরোধিতা করে। নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিওর সমালোচনাও করেন তিনি। যদিও সিডিসির তৎকালীন পরিচালক ড. রবার্ট আর রেডফিল্ড তখনই সতর্ক করে বলেছিলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে, বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়তে পারে। বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সেবাদাতা সংস্থা সেই সময় শিক্ষার্থীদের ভার্চ্যুয়াল পরিসরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে এগিয়ে আসে। কিন্তু মার্কিন রাজনীতির উত্তাপ ও নির্বাচনের তোড়জোড়ে সবই ভেসে যায়। আলোচনার বাইরে চলে যায় বিষয়টি।

কিন্তু এখন যখন শীতেও স্কুলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হলো এবং আবার কবে খুলবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও জানা নেই, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন অভিভাবকেরা। গত অক্টোবরে যখন শীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়, তখন কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। এগারো বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী তো জুম ক্লাস চলার সময়েই আত্মহত্যা করে। এই বিষয়গুলো এখন সময়ের সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি মোকাবিলায় শুধু লাস ভেগাসই নয়, গোটা যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা কর্মকর্তাদের ওপরই চাপ বাড়ছে। এই চাপ শেষ পর্যন্ত কীভাবে মোকাবিলা করা হয়—তা-ই এখন দেখার বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন