যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমশ করোনাভাইরাসের চতুর্থ ঢেউ ঢুকতে শুরু করেছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কসহ পাঁচ রাজ্যে এই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। আবার যুক্তরাজ্যে প্রথম শনাক্ত করোনার নতুন ধরন চিন্তায় ফেলে দিয়েছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। কারণে এখন করোনা শনাক্ত বেশির ভাগ মানুষের দেহে এই ধরনটি দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে করোনার টিকা কর্মসূচি বেশ ভালোভাবে হচ্ছে। তবে যথেষ্ট পরিমাণ মানুষ এখনো সুরক্ষিত নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে করোনার আরেকটি ঢেউ শুরু হতে পারে।

আবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যত করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে তার অর্ধেকের বেশি ধরা পড়ছে পাঁচটি রাজ্যে। এই পরিস্থিতি চাপে ফেলে দিয়েছে ফেডারেল সরকারকে। করোনার টিকা বিতরণের বর্তমান ধারা পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হচ্ছে তাদের।

ডেনভার পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মোট সংক্রমণের ৪৪ শতাংশই হচ্ছে নিউইয়র্ক, মিশিগান, ফ্লোরিডা, পেনসিলভানিয়া ও নিউজার্সিতে। গত সপ্তাহে এই পাঁচ রাজ্যে ১ লাখ ৯৭ হাজার করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে এই সাত দিনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মোট ৪ লাখ ৫২ হাজার করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

এই পাঁচ রাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সংখ্যার ২২ শতাংশের বসবাস। স্বাস্থ্য বিশেজ্ঞরা এখন বাইডেন প্রশাসনকে এই পাঁচ রাজ্যে অতিরিক্ত টিকা পাঠানোর সুপারিশ করছেন। তবে প্রশাসন এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

মার্কিন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে করোনার নতুন ধরন। যুক্তরাজ্যে প্রথম শনাক্ত করোনার নতুন ধরন এখন যুক্তরাষ্ট্রে হরহামেশা শনাক্ত হচ্ছে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) পরিচালক ড. রোচেল ওয়ালেনসকি বলেন, বি.১. ১.৭ নামে পরিচিত করোনার নতুন ধরন যুক্তরাষ্ট্রে এখন সংক্রমিত মানুষের দেহে শনাক্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা বলছে, করোনার এই নতুন ধরন মানুষের দেহে খুব দ্রুত সঞ্চারিত হচ্ছে। আর এতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে তরুণেরা। ফলে গত কয়েক সপ্তাহে করোনা সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।

* নিউইয়র্কসহ পাঁচ রাজ্যে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি * যুক্তরাষ্ট্রে করোনার চতুর্থ ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির (সিআইডিআরএপি) পরিচালক মাইকেল ওস্টারহল্ম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বলে মার্কিন সাময়িকী স্লেট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে মাইকেল ওস্টারহল্ম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘করোনা নিয়ে সারা বিশ্ব তটস্থ হয়ে আছে। আমরা এখন করোনার চতুর্থ ঢেউ শুরুর দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। আগামী কয়েক সপ্তাহে সারা বিশ্বেই করোনার সংক্রমণ ভয়াবহভাবে বেড়ে যাবে। এই বাস্তবতা দ্রুত মার্কিনদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। আমরা অতটা ভয়াবহ রূপ এখনো দেখিনি।’

মাইকেল ওস্টারহল্ম বলেন, এর আগের ঢেউয়ে সারা দেশে যা হয়েছিল, এবারও তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এরই মাঝে ৩ এপ্রিল মিশিগান অঙ্গরাজ্যে একদিনে ৮ হাজার ৪০০ জন করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছে। এটা মূলত সবার জন্য সতর্ক হওয়ার একটি সংকেত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ করোনায় ঝুঁকির বিষয়টি একদম এড়িয়ে যাচ্ছে। এর সমালোচনা করেছেন ওস্টারহল্ম। কারণ, দেশে এখন করোনার নানা ধরন রয়েছে। যা আগের চেয়ে আরও বেশি সংক্রামক। তাই এই মুহূর্তে স্বাস্থ্যবিধি সবাইকে মেনে চলাতে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

ওস্টারহল্ম আরও বলেন, বিশ্বে আমরাই একমাত্র দেশ, এই দেশে করোনার সংক্রমণ যখন বাড়ছে ঠিক সেই সময়ে কোনো কিছু বন্ধ না করে উল্টো সব খুলে দিচ্ছি। সামনে সংক্রমণ আরও অনেক বাড়বে। তিনি বলেন, করোনার নতুন ধরনটি অনেক বেশি সংক্রামক। এই ধরনটি শিশুদের শারীরিক পরিস্থিতি অনেক নাজুক করে দিতে পারে। সবাইকে বুঝতে হবে করোনার এই বি.১. ১.৭ নামক ধরনটি একেবারেই নতুন। এই ধরনে মিনেসোটায় শিশুরা খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছে।

সংক্রামণব্যাধি ও মহামারি বিশেষজ্ঞ সিএনএনকে বলেন, ‘আমি মনে করি, সামনে আমাদের আরও কয়েকটি খারাপ সপ্তাহ আসছে। গত বছরের মহামারির প্রবণতা থেকে বলা যায়, ইউরোপে মহামারি শুরুর তিন থেকে চার সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রে এর ঢেউ লাগে।’

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপে করোনার নতুন বি.১. ১.৭ ধরনে সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তি আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষকে টিকা কর্মসূচির আওতায় আনার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যদি স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানা না হয়, তাহলে এখানে ইউরোপের অবস্থা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, নতুন ধরণ মহামারি পরিস্থিতিকে বদলে দিচ্ছে। নতুন ধরণে তরুণেরা বেশি সংক্রমিত হতে পারে, যারা এখনো টিকা পায়নি।

বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের ন্যাশনাল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের ডিন পিটার হোটেজ বলেন, ‘বি.১. ১.৭ একেবারেই নতুন ধরনের ভাইরাস হিসেবে আমাদের ভাবতে হচ্ছে। সংক্রমণ ও তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের ক্ষেত্রে আমরা আগে যা দেখেছি, এটি পুরোপুরি তার থেকে ভিন্নভাবে কাজ করছে। সুতরাং করোনার এই ধরনকে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।’

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন