default-image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক হবে আগামী ২০ জানুয়ারি। কিন্তু সেই অপেক্ষায় বসে নেই তিনি। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলছেন, ঠিক করছেন করণীয়। সেই কাজের দায়িত্ব কাদের হাতে তুলে দেবেন, ভাবছেন তা নিয়ে, ঠিক করছেন মন্ত্রিসভার মুখ।

তবে ভোটে পরাজিত হয়েও পরাজয় স্বীকার করতে চাইছেন না রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি উল্টো আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনেই বাইডেন বেশ কিছু পদক্ষেপ নেবেন। নির্বাচনে বিজয় ও ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে বাইডেন ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস যা করবেন, তা সবাইকে অবহিত করতে গত রোববার তাঁদের শিবির একটি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছে। বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনেই কয়েকটি নির্বাহী আদেশ জারি করে তিনি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতির পরিবর্তন ঘটাবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথমেই বাইডেন চেষ্টা করবেন চার বছর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার রেখে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে।

ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি

বাইডেন-হ্যারিস জুটির ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর স্যাম কফম্যান। আইন অনুযায়ী, তাঁরা ইতিমধ্যে সরকারি ভবনে কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন। তবে করোনাভাইরাসের কারণে অধিকাংশ কাজ যার যার ঘরে বসেই চলছে।

গত শনিবার বাইডেন ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর প্রথম কাজ হবে করোনা মোকাবিলায় একটি টাস্কফোর্স গঠন। ওবামা প্রশাসনের সার্জন জেনারেল বিবেক মূর্তি এবং খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের সাবেক প্রধান ডেভিড কেসলার এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেবেন। গতকাল এই টাস্কফোর্সের সব সদস্যের নাম ঘোষণার কথা ছিল। জানা গেছে, বাইডেনের গঠন করা টাস্কফোর্স করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফ করবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসিরও পরামর্শ নেবেন।

বাইডেন জানিয়েছেন, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনই তিনি নির্বাহী ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত রদ করবেন। এর অন্যতম হলো প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন। ২০১৭ সালের ১ জুলাই ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। নিয়ম অনুযায়ী, তাঁর ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় ৪ নভেম্বর, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণের পরদিন। গত জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অবহিত করে। ২০২১ সালের ৬ জুলাই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা। তবে তার আগেই বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত রদ করবেন বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।

এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার ‘ডাকা’ কর্মসূচিও নবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন বাইডেন। এই কর্মসূচির আওতায় শিশু বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো অভিবাসীরা দেশটিতে বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ পাবে। বাইডেন আরেকটি বড় পদক্ষেপ নেবেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে। এ ছাড়া মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘দেয়াল’ নির্মাণ বন্ধ এবং তাঁর কঠোর অভিবাসন নীতি রদ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন বাইডেন।

বাইডেনের মন্ত্রিসভা

এদিকে বাইডেনের প্রশাসনে কারা স্থান পাচ্ছেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। পর্দার অন্তরালে চলছে লবিং। তবে এসব নিয়ে বাইডেন বা তাঁর প্রস্তুতি কমিটি মুখ খোলেনি। ইতিপূর্বে এক নিবন্ধে বাইডেন নিজে জানিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি এমন একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠন করবেন, যার চেহারা আমেরিকার মতো বহুবর্ণিল হবে। এ কথার অর্থ তাঁর মন্ত্রিসভায় নারী ও অশ্বেতকায় সদস্যের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকবে।

বিজ্ঞাপন

এখন সবার আগ্রহ, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে। ডেলাওয়ারের সিনেটর ক্রিস কুন এই পদে আগ্রহী বলে জানা গেছে। নিউ জার্সির সিনেটর ক্রিস মার্ফি এবং ওবামা প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইসও এই পদের দাবিদার। বেশির ভাগ সূত্রই বলেছে, বাইডেন ও সুসান রাইস ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ওবামা আমলে তাঁরা দুজনে একসঙ্গে কাজ করেছেন। তবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে রাইস অনুমোদন পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ২০১২ সালে লিবিয়ার বেনগাজিতে বিদ্রোহীদের হামলায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মৃত্যুর জন্য রিপাবলিকানরা তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইসকে দায়ী করে থাকেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশ ইতিমধ্যেই দাবি জানিয়ে রেখেছে, আসন্ন প্রশাসনে তারা বাইডেনের প্রস্তাবিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রগতিশীল নেতৃত্ব দেখতে চায়। এই দাবির অংশ হিসেবে সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনকে রাজস্ব এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে। জানা গেছে, তাঁরা দুজনই এই পদের ব্যাপারে আগ্রহী।

তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে রয়ে যাওয়ায় স্যান্ডার্স বা ওয়ারেনের মতো অভিজ্ঞ সিনেটরদের মন্ত্রিসভায় যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এবং প্রতিনিধি পরিষদে বেশ কিছু প্রগতিশীল সদস্য হারানোয় দলের বামপন্থী অংশের প্রভাব কমেছে। কোনো কোনো ডেমোক্র্যাট নেতা, যেমন প্রতিনিধি পরিষদের হুইপ জিম ক্লাইবার্ন, খোলামেলাভাবেই এই বিপর্যয়ের জন্য দলের প্রগতিশীল অংশের ‘সমাজতান্ত্রিক অ্যাজেন্ডা’কে দায়ী করেছেন। কংগ্রেসের সবচেয়ে খ্যাতনামা প্রগতিশীল সদস্য আলেকজান্ডার ওকাসিও-কর্তেজ অভিযোগ করেছেন, দলের নেতারা তাঁকে ‘শত্রু’ বিবেচনা করছেন।

বাইডেন প্রশাসনে কোনো রিপাবলিকান থাকবেন কি না, তা নিয়েও বিস্তর কথা-চালাচালি হচ্ছে। বাইডেন নিজেকে লাল ও নীলের বিভাজনের ঊর্ধ্বে রাখতে আগ্রহী। সে কারণে এক বা একাধিক রিপাবলিকান নেতা এই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতেই পারেন বলে জল্পনা শুরু হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মন্ত্রিসভায় একাধিক রিপাবলিকান নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। মন্ত্রিসভায় একাধিক রিপাবলিকান স্থান পেলে সিনেটে রিপাবলিকান বিরোধিতা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এই বিবেচনা থেকে বাইডেনও হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী দলের দিকে হাত বাড়াবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত যেসব রিপাবলিকান নেতার নাম শোনা গেছে, তাঁদের মধ্যে ওহাইওর সাবেক গভর্নর জন কেইসিচ, সাবেক সিনেটর জেফ ফ্লেক এবং হিউলিট প্যাকার্ড কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহী মেগ হুইটম্যান অন্যতম।

মন্তব্য পড়ুন 0