default-image

কবি আলেয়া চৌধুরীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ৫ আগস্ট নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বেলা দেড়টায় মাউন্টেইন ভিউ অ্যাভিনিউর ইসলামিক সেন্টার অব রকল্যান্ড মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে স্পার্কিলের কিংস হাইওয়ের রকল্যান্ড সিমেট্রিতে বেলা তিনটায় দাফন সম্পন্ন হয়।

ইমাম মোহাম্মদ সেলিম জানাজা ও দাফন শেষে দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন। এ সময় তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কবি শামসুল আলম, মোহাম্মদ আজাদ, ফরিদা ফারুকী, মনোয়ারা বেগম, নূর হোসেন তালুকদার, অ্যাটর্নি লা তানিয়া ওয়াট কিং, কবি নাসরীন চৌধুরী, সাংবাদিক ওবায়দুল্লাহ মামুন, সংস্কৃতিকর্মী হাসান আল অবদুল্লাহসহ বাঙালি কমিউনিটির প্রতিনিধি, পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উপস্থিত ছিলেন।

মরহুমার বাংলাদেশে অবস্থানকারী আত্মীয়স্বজন ভিডিও কলের মাধ্যমে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে তাঁর ছয় ভাইবোনসহ অসংখ্য আত্মীয় ও শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন। নিউইয়র্কে কবির কোনো নিকটাত্মীয় না থাকায় শামসুল আলম ও মোহাম্মদ আজাদ সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন বলে পারিবারিক স্বজন শাহরিয়ার সালাম জানিয়েছেন।

কবি আলেয়া চৌধুরী নিউইয়র্কে একাকী জীবন যাপন করতেন। তিনি নানা রোগে ভুগলেও অনেকটাই সুস্থ ছিলেন। সাহিত্য সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। ৩ আগস্ট রাতে তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট বন্ধ থাকায় তাঁকে ডাকাডাকি করেও তাঁর সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে পুলিশে খবর দিলে তারা এসে দরজা খুলে বাথরুমে তাঁর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন । সেখান খেকে তাঁকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।

শাহরিয়ার সালাম সেদিন জানিয়েছিলেন, দেশ থেকে আলেয়া চৌধুরীর ভাই তাঁকে ফোন করে পাচ্ছিলেন না। প্রান্তিক শহর রকল্যান্ডে তাঁর কাছাকাছি থাকেন একটি প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান শামসুল আলম। শামসুল আলমের পরিবারের সঙ্গে কবি আলেয়া চৌধুরীর যোগাযোগ ছিল। দেশ থেকে উদ্বিগ্ন ভাইয়ের ফোন পেয়ে ৩ আগস্ট সন্ধ্যার পর শামসুল আলম কবি আলেয়া চৌধুরীর অ্যাপার্টমেন্টে কমপ্লেক্সে যান। কোন অ্যাপার্টমেন্টে আলেয়া চৌধুরী থাকতেন, তা জানতেন না শামসুল আলম। এ কারণে কমপ্লেক্সের তত্ত্বাবধায়কের সাহায্য নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের তালা ভেঙে দেখা যায়, বাথরুমে আলেয়া চৌধুরীর মৃতদেহ পড়ে আছে। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

default-image

জানা গেছে, আলেয়া চৌধুরী মৃত্যুর আগেই নানা বিষয়ে একটি উইল করে গেছেন। আইন অনুযায়ী উইলে স্থাবর অস্থাবর নানা বিষয়ের উল্লেখ করা থাকে। পারিবারিক স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, উইলে শরিফ আলম নামের একজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ম্যারিল্যান্ডে অবস্থানরত শরিফ আলম ইতিমধ্যে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। নিউইয়র্কের আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির উইলই তাঁর বিষয় সম্পত্তি সম্পর্কে শেষ কথা।

নিউইয়র্কে আলেয়া চৌধুরী সংগ্রামী নারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে গ্রাম্য পঞ্চায়েতের অমানবিক বিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসেন। ঢাকায় এসে আলেয়া চৌধুরী হকারের কাজ নেন। খবরের কাগজ বিলি করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করে চাঞ্চল্যকর খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন তিনি। ‘মাত্র ১৩ বছর বয়সে পেশাগত গাড়িচালক হওয়ার প্রচেষ্টা’ দৈনিক বাংলার লোক-লোকালয় পাতায় সাংবাদিক হেদায়েত হোসাইনের কলাম তাঁর পরিচিতি বাড়িয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে সেলাই মেশিন দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা না নিয়ে নারীদের গাড়িচালক পেশায় স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করার প্রস্তাব রেখেছিলেন।

আলেয়া চৌধুরীর জন্ম ১৯৬১ সালে কুমিল্লার উত্তর চর্থা গ্রামে। মা আম্বিয়া খাতুন, বাবা সুলতান আলম চৌধুরী। অভাবের কারণে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। একজন স্বশিক্ষিত নারী তাঁর মেধা, মনোবল ও প্রতিভাকে সঙ্গী করে জীবনের কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়েছেন। ঢাকার আজিমপুর এতিমখানার পাশে অবস্থিত দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকা অফিসের খেলাঘরে তিনি প্রথম স্বরচিত কবিতা পড়েন। এরপর ১৯৭০ সালে ‘বেগম’ পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘জীবনের স্টেশনে’ পদ্মা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইরান ও জার্মানি ভ্রমণ করেন। অবশেষে ২০ বছর বয়সে মাছ ধরার নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মার্কিন মুলুকে থিতু হন। সাম্রাজ্যবাদ, জঙ্গিবাদ এবং শান্তির সপক্ষে ঘৃণা প্রকাশ করে তাঁর কবিতাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে সমস্যাজর্জরিত শিশুদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে ‘প্রবলেম চাইল্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে আলেয়া চৌধুরী উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অস্তিত্বের সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ নিউইয়র্কের স্টার ম্যাগাজিন ‘উইমেন অব দ্য ইয়ার’ শীর্ষক প্রচ্ছদ কাহিনি প্রকাশ করে। ১৯৯৪ সালে দিনা হোসেন ‘আলেয়া: আ বাংলাদেশি পোয়েট ইন আমেরিকা’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। দিনা হোসেন এই তথ্যচিত্রের কারণে কলকাতা থেকে ‘কলাকৃতি’ পুরস্কার পান। তথ্যচিত্রটি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, জাভেথ সেন্টার, ম্যানহাটন, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়াসহ চীন ও বাংলাদেশে এটি প্রদর্শিত হয়। ২০১৬ সালে একটি নারীবিষয়ক পত্রিকা আলেয়া চৌধুরীর কর্মজীবনের সাফল্যকে স্বীকৃতি দান করে।

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা পরিবারের স্বজন ছিলেন আলেয়া চৌধুরী। করোনা প্রতিরোধে লকডাউন শুরু হওয়ার আগে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নারী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি আলেয়া চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুতে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার লেখক-সাংবাদিকেরা বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। শোক জানিয়েছেন সবাই।

কবি আলেয়া চৌধুরী স্মরণে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা ২৩ আগস্ট একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। করোনাকালের চিত্র প্রদর্শনী এবং কবিতার মাধ্যমে স্মরণ করা হবে এই কবিকে। কবি, সাহিত্যিকসহ সবাইকে ২৩ আগস্ট বেলা দুইটায় জ্যাকসন হাইটসের ব্রডওয়ে ও জ্যাকসন বুলেভার্ড ৭২ স্ট্রিটের ৪৮ নম্বর বড়ি সংলগ্ন বহিরাঙ্গনে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন