যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশি মার্কিনদের একেবারে নির্বিকার বলা যাবে না। তাদের আড্ডায় আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনীতির নির্বাচন ভাবনা। বহু অভিবাসীর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিদের আগমনের শত বছর পেরিয়ে গেছে। তবে রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের আলাদা অবস্থান করে নিতে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে।

গত চার দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের ব্যাপক অভিবাসন ঘটেছে। এ দেশে এখনো ভালো অবস্থান করতে না পারলেও সাধারণভাবে রাজনীতি সচেতন বাংলাদেশিরা জাতীয় নির্বাচন নিয়ে পক্ষ–বিপক্ষে মেতে থাকতে দেখা যায়। অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীর মতো বাংলাদেশিরাও ডেমোক্র্যাট সমর্থক হলেও রিপাবলিকান দলের সমর্থকও রয়েছে। নিউইয়র্কে এবার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশিদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক কত বাংলাদেশি আছেন, তার কোন সঠিক হিসাব নেই। এবারের আদমশুমারির পর এ নিয়ে একটা ভালো ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার কতজন বাংলাদেশি নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করছেন, তা নিয়েও সংশয় আছে।

২০১৫ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মোট বাংলাদেশির সংখ্যা এক লাখ ৮৮ হাজার দেখানো হয়েছে। এই সংখ্যাকে সঠিক মনে করেন না অনেকে। বলা হয়, এখন বৈধ ও নথিপত্রহীন মিলে মোট বাংলাদেশির সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি হবে। রক্ষণশীলদেরও অনুমান, যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি প্রধান নগরে বসবাসরত মোট বাংলাদেশির সংখ্যা তিন লাখ পেরিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি নগরের মধ্যে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, ডেট্রয়েট, ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলস, ফিলাডেলফিয়া, মিয়ামি, বোস্টন, আটলান্টা ও আটলান্টিক সিটিতেই বাংলাদেশিদের বসবাস বেশি। এসব নগরে ডেমোক্র্যাট ভাবাদর্শের মানুষ বেশি। অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে মানিয়ে চলা বাংলাদেশিদের অধিকাংশই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে তাদের সহজ মিত্রতা গড়ে তুলেছেন।

বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রে পরিশ্রমী অভিবাসী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হলেও গড় আয়ের দিক থেকে এখন মধ্য বা নিম্ন আয়ের অভিবাসী তারা। বৈশ্বিক পরিচয়ে বাংলাদেশিরা দক্ষিণ এশীয় হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে পারিবারিক গড় আয় বছরে ৭০ হাজার ডলারের কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে গড় আয় আরও কম। কারণ, বাংলাদেশি বহু পরিবারে প্রথম প্রজন্মের নারীদের চাকরিতে তেমন দেখা যায় না।

পারিবারিক আয় ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার দলীয় রাজনীতির একটা সম্পর্ক রয়েছে। ডেমোক্রেটিক দলের স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক নিরাপত্তার নানা উদারনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশিরা এদের ভাবাদর্শের কাছাকাছি। আমেরিকার জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এর প্রতিফলন দেখা যায়।

আমেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি মার্কিনদের ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাট প্রধান নিউইয়র্কে গত দলীয় প্রাইমারিতে এক ডজনের বেশি বাংলাদেশি প্রার্থী হয়েছেন। এবারের জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী পেনসিলভানিয়া রাজ্যে বাংলাদেশি মার্কিন নিনা আহমেদ। ডেমোক্রেটিক দলের হয়ে তিনি রাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ কম্পট্রোলার পথে জয়ী হওয়ার পথে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় নির্বাচনে টেক্সাসকে রিপাবলিকান স্টেট মনে করা হলেও এবার অবস্থা ভিন্ন। জনমত জরিপে টেক্সাস এবার সুইং স্টেটে পরিণত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের হয়ে বাংলাদেশি মার্কিন ডোনা ইমাম প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। তাঁর পক্ষে বাংলাদেশিরা মাঠে নেমেছেন।

বাংলাদেশি আমেরিকান ফর বাইডেন-হ্যারিস নামে প্রচারণায়ও বাংলাদেশিরা সক্রিয়। মিশিগান, ফিলাডেলফিয়া নগরে বাংলাদেশিদের অবস্থান অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীর তুলনায় কম হলেও এবারের নির্বাচনে ব্যাটল গ্রাউন্ড রাজ্যে বাংলাদেশিরা ভোট দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে পারে। এসব রাজ্যে কোন প্রার্থীর জয়–পরাজয়ে সামান্য ভোটও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে নিউইয়র্কে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশি-আমেরিকান রিপাবলিকান অ্যালায়েন্স–এর কমিটি। বাংলাদেশি মার্কিন রিপাবলিকান সমর্থক নাসির আলী খানের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের বাংলাদেশি সমর্থকদের নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির সদস্যসচিব প্রিয় তোষ দে আর প্রধান সমন্বয়কারী মুস্তাক চৌধুরী।

বাংলাদেশি মার্কিন নতুন প্রজন্ম উদারনৈতিক ভাবধারার। সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনে দেখা গেছে, কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে পায়ে-পায়ে মিছিল সমাবেশে তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি। আমেরিকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিভাজনে অতি উদারনৈতিকদের সঙ্গে প্রথাগত উদারনৈতিক পক্ষের দ্বন্দ্ব রয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে নিয়ে তাদের অবস্থান ঐক্যবদ্ধ নয়। বাংলাদেশি মার্কিন তরুণদের মধ্যে বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিওর প্রতি শক্তিশালী সমর্থন লক্ষ্য করা যায়।

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসে বাংলাদেশি অভিবাসীরাও ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। অনেকের স্বজন বা চেনা মানুষের মৃত্যু হয়েছে। করোনাভীতি এখনো আছে যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্প বাইডেন বিভাজনে বাংলাদেশিদের ব্যাপক অবস্থান বাইডেনের পক্ষে। এর মধ্যে উপমহাদেশীয় রাজনীতির চেতনাও কাজ করে কারও কারও মধ্যে। ভারতীয় কমলা হ্যারিসকে রানিং মেট করায় কোন কোন বাংলাদেশিকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। আবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মোদী সরকারের সুসম্পর্কের কারণে কোন কোন বাংলাদেশিকে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য না হলেও ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক চেতনা এ ক্ষেত্রে কাজ করছে বলে মনে করার সংগত কারণ রয়েছে।

তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা এখনো দেশের রাজনীতি নিয়ে পড়ে আছেন। আমেরিকার রাজনীতি এই গোষ্ঠীর কাছে আলাপ–আলোচনায় সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশি মার্কিনদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি নিঃসন্দেহে সমর্থন বেশি। এবারের নির্বাচনেও বাংলাদেশি যারা ভোট দেবেন, তাদের বেশির ভাগই বাইডেনকে দেবেন।

মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশি মার্কিন তরুণ প্রজন্ম বেশ উদারনৈতিক ভাবধারার। এ ভোটারদের কাছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা স্পষ্ট।

মন্তব্য পড়ুন 0