বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে, ভয় ও উদ্বেগের অনুভূতিগুলি যখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এবং আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে বাধাগ্রস্ত করে, তখন সেটি অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ ব্যাধিতে পরিণত হয়। উদ্বেগজনিত ব্যাধি কোনো আপাত কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ভয় বা প্রদত্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অক্ষমতার কারণ হতে পারে।

উদ্বেগ আমাদের চাপের একটি স্বাভাবিক আবেগগত প্রতিক্রিয়া। উদ্বেগের সঙ্গে ভয় সম্পৃক্ত। তবে, উদ্বেগ আমাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে এবং অনেক ক্ষেত্রে আমাদের পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত করে। উদ্বেগজনিত ব্যাধিগুলো স্নায়বিক বা উদ্বেগের স্বাভাবিক অনুভূতির থেকে আলাদা এবং এতে অতিরিক্ত ভয় বা উদ্বেগ জড়িত থাকে। উদ্বেগজনিত ব্যাধি মানসিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ একটি। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রায় ৩০ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্কদের জীবনের কোনো না কোনো সময় প্রভাবিত করে।

উদ্বেগজনিত ব্যাধিগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে সাধারণ মানসিক সংকটের একটি। অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেশন অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার (এডিএএ) তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪০ মিলিয়ন প্রাপ্ত বয়স্কদের এই উদ্বেগ প্রভাবিত করে।

উদ্বেগজনিত ব্যাধি চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। তবে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে মাত্র ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ লোক চিকিৎসা পায়। এই অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে তিন থেকে পাঁচগুণ বেশি এবং মানসিক রোগের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা ছয়গুণ বেশি বেড়েছে।

উদ্বেগজনিত ব্যাধি ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ২৫ দশমিক ১ শতাংশ শিশু-কিশোরদের প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসা-যত্ন না পেলে স্কুলে খারাপ ফল করে। তারা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা থেকে দূরে থাকে এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের জন্য বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

উদ্বেগজনিত ব্যাধির সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত উপসর্গ হলো ভয় ও আতঙ্ক। ধরুন, আপনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ দিন ছুটিতে। এখন আপনাকে কাজে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আপনি ভয় পাচ্ছেন। ভাবছেন, শারীরিক কিছু সমস্যা নিয়ে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন কিনা। ভয় নিয়েই আপনি কাজে যোগ দিলেন। যোগ দিয়েও আপনি একই ভয়ে আছেন। ভাবছেন, আপনি পড়ে গেলেন কিনা, কেউ আপনার ধীর গতিতে কাজ করা লক্ষ্য করছে কিনা, আপনার দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে কিনা ইত্যাদি। একটা সময় এমন ভাবতে ভাবতে আপনার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল, আপনার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলো, আপনি ঘামতে শুরু করলেন অবশেষে আপনি জ্ঞান হারালেন বা মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। এতে আপনি হয়তো চাকরিটাও হারাতে পারেন এবং মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক সংকটে পড়ে যেতে পারেন।

উদ্বেগজনিত ব্যাধির মূল কারণ অজানা। তবে বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকদের মতে, জেনেটিক, পরিবেশগত, মনস্তাত্ত্বিক, ব্যক্তিত্ব, জীবনের ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণের সংমিশ্রণ জড়িত। বলা হয়, উদ্বেগজনিত রোগ পরিবারে পূর্ব থেকেই থাকতে পারে। পরিবেশগত কারণের ক্ষেত্রে চাপ বা আঘাতমূলক ঘটনা যেমন-অপব্যবহার, প্রিয়জনের মৃত্যু, সহিংসতা বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা প্রায়শই উদ্বেগ ব্যাধি বিকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, উদ্বেগজনিত ব্যাধির একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যার প্রত্যেকটির চরিত্র আলাদা। উদ্বেগজনিত ব্যাধির বিভিন্ন ধরনের উপসর্গের মধ্যে শ্রেণিগত উপসর্গের মধ্যে আছে—ঘুমের সমস্যা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা, হাত-পা ঝিম ধরা বা কাঁপা, ঘাম হওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, বমিভাব, মাথা ঘোরা এবং পেশি টান টান হয়ে যাওয়া।

উদ্বেগ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে দেয়। উদ্বেগের কারণে আমরা অনিয়ন্ত্রিত অতিরিক্ত চিন্তার সম্মুখীন হই এবং ভয়, আতঙ্ক বা আসন্ন বিপদের অনুভূতি ধারণ করি। আমাদের খিটখিটে অনুভূতি, সবকিছুতে উচ্চতর সতর্কতা লক্ষণীয় হয়। অনেক সময় ওই পরিবেশ বা পরিস্থিতি থেকে আমরা পালাতে চাই আমরা। পরিবেশটাকে অনিরাপদ মনে হয়। নিজের বাছাই করা একটা নির্দিষ্ট অবস্থান বা পরিবেশকে নিরাপদ মনে হয় কেবল।

ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসের ‘মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ’ নামক আর্টিকেলের তথ্য অনুযায়ী, অনেকগুলোর মধ্যে পাঁচটি প্রধান ধরনের উদ্বেগজনিত ব্যাধি হলো—জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, প্যানিক ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এবং সোশ্যাল ফোবিয়া কিংবা সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার।

জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার দীর্ঘস্থায়ী ও অতিরঞ্জিত উদ্বেগ এবং উত্তেজনা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এমনকি উত্তেজিত করার জন্য সামান্য কিছু না ঘটলেও এটি ঘটতে পারে।

অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার পুনরাবৃত্তিমূলক। অবাঞ্ছিত চিন্তা অথবা পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ দ্বারা এটিকে চিহ্নিত করা হয়। পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ যেমন-বারবার হাত ধোয়া, গণনা করা, পরীক্ষা করা বা পরিষ্কার করা প্রায়শই আবেগের চিন্তা ভাবনা রোধ দ্বারা সঞ্চালিত হয়। এসব অভ্যাস শুধু সাময়িক স্বস্তি প্রদান করে। তবে সেগুলো পালন না করায় উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়।

প্যানিক ডিসঅর্ডারে শারীরিক লক্ষণে সঙ্গে তীব্র ভয়ের অপ্রত্যাশিত এবং পুনরাবৃত্তি পর্ব দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। যেমন-বুকে ব্যথা, হৃৎস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা পেটের ব্যথা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার কোনো ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা থেকে ঘটতে পারে। যেখানে ব্যক্তি মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি বা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। এটিকে উত্তেজিত করতে পারা আঘাতমূলক ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—সহিংস ব্যক্তিগত আক্রমণ, প্রাকৃতিক বা মানব-সৃষ্ট দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা সামরিক লড়াই।

সোশ্যাল ফোবিয়া বা সামাজিক উদ্বেগ ব্যাধি দৈনন্দিন সামাজিক পরিস্থিতিতে অত্যধিক উদ্বেগ এবং অত্যধিক আত্ম-সচেতনতা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। সোশ্যাল ফোবিয়া এক ধরনের পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। যেমন-কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে কথা বলার ভয় বা অন্যের সামনে খাওয়া বা পান করার ভয়। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ তাদের ভীত ও অস্বস্তিকর পরিবেশ দেয়।

উদ্বেগজনিত রোগের লক্ষণ অনেকটাই স্পষ্ট। যদি আপনার মধ্যে এমন কোনো লক্ষণ থাকে, তবে আপনাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যদি চিকিৎসক আপনার আপনার অনুভূতির কোনো শারীরিক কারণ খুঁজে না পান, তাহলে তাঁরা আপনাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন।

উদ্বেগজনিত রোগের চিকিৎসা করা যায় এবং এর জন্য বেশ কয়েকটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। যা অধিকাংশ মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সাহায্য করে। যেমন-কাউন্সেলিং, সাইকো থেরাপি, ওষুধ। উদ্বেগজনিত রোগের চিকিৎসা বা ওষুধের বিষয়ে আপনার চিকিৎসকই উপযুক্ত পরামর্শদাতা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন