default-image

ইউক্রেন নিয়ে বাগ্‌যুদ্ধে জড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পদপ্রার্থী জো বাইডেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ নিয়েই এই বাগ্‌যুদ্ধ।

ট্রাম্পের দাবি, ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইউক্রেনের একটি গ্যাস কোম্পানির ব্যাপারে সে দেশের সরকার যে তদন্ত শুরু করে, তা বন্ধে বাইডেন চাপ প্রয়োগ করেন।

ফোনালাপে সেই প্রসঙ্গ টানেন ট্রাম্প। এ ঘটনায় বাইডেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প আগেও তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। কিন্তু এবার তিনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন।

ট্রাম্প-ভলোদিমির ফোনালাপ নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কিছু জানা যায়নি। গোয়েন্দা বিভাগগুলোর সমন্বয়কারী পরিচালকও হোয়াইট হাউসের নির্দেশে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তথ্যমাধ্যমে প্রতিদিন একটু একটু করে খবর ফাঁস হওয়ায় বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে এসেছে।

জানা গেছে, ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় তাঁকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও তাঁর ছেলের সম্ভাব্য দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তে চাপ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, একই আলাপচারিতায় ট্রাম্প আটবার বাইডেনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইউক্রেনের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্য ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আপত্তির কারণে তা স্থগিত রাখা হয়।

সন্দেহ করা হচ্ছে, এই টেলিফোন আলাপচারিতার সময় ট্রাম্প ঘোষিত সাহায্য প্রেরণে তাঁর সম্মতির কথা বলেন। তবে বিনিময়ে বাইডেন ও তাঁর ছেলের বিষয়টি তদন্তের ওপর চাপ দেন।

ট্রাম্প নিজে স্বীকার করেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। যদিও ঠিক কী বলেছেন, তা খোলাসা করেননি। তাঁর কথা, ‘যা-ই বলে থাকি, অসংগত কিছু বলিনি। তেমন কিছু বলার প্রশ্নই ওঠে না।’

ট্রাম্প টেলিফোন কথোপকথন নিয়ে মাথা না ঘামানোর বদলে বাইডেন ও তাঁর ছেলের দুর্নীতি নিয়ে খোঁজখবর নিতে তিনি সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়েছেন।

ট্রাম্প ও তাঁর ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানি অনেক দিন ধরেই দাবি করে আসছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইউক্রেনের একটি গ্যাস কোম্পানির ব্যাপারে সে দেশের সরকার যে তদন্ত শুরু করে, তা বন্ধে বাইডেন চাপ প্রয়োগ করেন। ওই কোম্পানির নির্বাহী বোর্ডের একজন সদস্য ছিলেন বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন।

বাইডেন ও তাঁর ছেলে দুজনই ট্রাম্প ও জুলিয়ানির এই অভিযোগ ক্রুদ্ধভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, আদৌ কোনো দুর্নীতি হয়েছে, এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তা সত্ত্বেও এই বিষয়ে বারবার কথা বলে জলঘোলা করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প-সমর্থকদের দাবি, বিদেশি নেতাদের সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে কথা বলার পূর্ণ অধিকার ট্রাম্পের রয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পবিরোধীরা বলছেন, কথা বলার সময় ট্রাম্প যদি নিজের রাজনৈতিক ফায়দা লাভের লক্ষ্যে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্যকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন, সেটি কেবল অনৈতিকই নয়, বেআইনিও।

সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠে এই অভিযোগ তুলেছেন বাইডেন নিজে। গতকাল শনিবার আইওয়াতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ক্রুদ্ধভাবে অভিযোগ করেন, ট্রাম্প আগেও তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। কিন্তু এবার তিনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন।

বাইডেনের ক্যাম্পেইন থেকেও এক লিখিত বিবৃতিতে সাংবাদিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এই প্রসঙ্গে যেকোনো আলোচনার শুরুতেই বলে রাখা প্রয়োজন যে, বাইডেন ও তাঁর ছেলের ব্যাপারে উত্থাপিত অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের কথোপকথনের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশের দাবি তুলেছেন।

সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, উত্থাপিত অভিযোগ সত্য হলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবশ্যই অভিশংসন প্রস্তাব তুলবে হবে। তা করতে ব্যর্থ হলে কংগ্রেস নিজেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ওয়ারেন বলেন, ট্রাম্প ধরে নিয়েছেন, তিনি সব আইনের ঊর্ধ্বে। তিনি বারবার আইনভঙ্গ করে চলেছেন। এ নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র বিকার নেই।

একই দাবি তুলেছেন আরেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হুলিয়ান কাস্ত্রো।

ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হলেও এ নিয়ে তিনি খুব একটা উদ্বিগ্ন, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এর আগে বহুবার তিনি সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে কাবু করতে পারেনি।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো উইলিয়াম গালস্টন মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের ব্যবহার থেকে স্পষ্ট, তিনি নিজেকে সব আক্রমণের ঊর্ধ্বে ভাবছেন। তিনি যেন বলছেন, ‘পারো তো আমাকে ঠেকাও।’

ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কেলিঅ্যান কনওয়ের স্বামী, ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক জর্জ কনওয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয়তে লিখেছেন, অভিশংসিত হওয়ার মতো অনেক কিছুই করেছেন ট্রাম্প। তবে সেসব ছাপিয়ে গেছে জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর বাইডেন নিয়ে লেনদেন। এই প্রেসিডেন্ট আমেরিকার জন্য ক্যানসার। তাঁকে সরানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

সন্দেহ নেই, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথাবার্তা ট্রাম্পকে বেকায়দায় ফেলেছে। কিন্তু ব্যাপারটা বাইডেনের জন্যও কম অস্বস্তিকর নয়। তিনি চান বা না চান, এই কথাবার্তার সূত্রে হান্টার বাইডেন ও তাঁর নিজের ভূমিকা আলোচনার কেন্দ্রে এসে গেছে। এই আলোচনা অব্যাহত থাকলে ও ট্রাম্পের উত্থাপিত অভিযোগের কোনো সত্যতা মিললে, তা বাইডেনের জন্য ক্ষতিকর হবে।

অন্যান্য ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এখন পর্যন্ত বাইডেনের পাশে রয়েছেন। কিন্তু কোনো দুর্বলতার আভাস পেলে তাঁরাও যে বাইডেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন