মধু মাসের সব কয়টি মধু ফলের বিস্তর স্বাদ নিউইয়র্কবাসী প্রতিবছর ঘটা করে নিতেন প্রতি গ্রীষ্মে। জুনের শেষে রোদের তাপ বাড়লেই শুরু সবুজ অরণ্যের খোঁজে কংক্রিট জঞ্জাল ছেড়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ আবার বাসার পেছনে চিলতে বাগানে কিংবা পাশের খোলা পার্কে বারবিকিউ উৎসবে মেতে উঠতেন। হোয়াইট বা রেড মিটের নানা আইটেমে মিশে যেত বাঙালি মেনু। বিফ অথবা মাটন বিরিয়ানি। সঙ্গে দেশি ফলের হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি। দেশি ফল কাঁঠাল, তরমুজসহ হরেক জাতের কাঁচা–পাকা আমের আকর্ষণীয় অবস্থান। এবারের গ্রীষ্মে করোনার কারণে এখনো চলছে সীমিত পরিসর আর ছন্দে আনন্দ আর ভালোবাসার বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। নানা ফলের স্বাদ নেওয়ার সামাজিক চর্চা আজকাল করোনার কারণে সাময়িকভাবে নির্বাসিত। বাঙালি অভিবাসীদের মধু মাস নিয়ে আনন্দ আর উৎসবের গল্প আজকাল শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে।

ভাবলাম মধু মাসের উৎসবে একটি মধু ফলের গল্প বলি সবাইকে। তাই বেছে নিলাম বাঙালির প্রিয় মধু ফল আমকে। শুনি তা হলে সেই আমের গল্প। মধু ফল আম, কি শুধু বঙ্গসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত? আমের ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। ৪০০০ হাজার বছর আগে আমের আদি নিবাস ছিল উপমহাদেশের উত্তর পূর্বকোণে বর্তমান মিয়ানমার সংলগ্ন অরণ্যে। কেমব্রিজ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অফ ফুড’ এ তথ্যে সায় দিয়েছে। প্রখ্যাত ভারতীয় উদ্ভিদ বিজ্ঞানী কে টি আচাইয়ার গবেষণায় সমান তথ্য পাওয়া যায়। খ্যাতনামা রাশিয়ান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ভাবিলভ যিনি সারা দুনিয়া চষে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর তাবৎ ফসলের মূল উৎপত্তি স্থল আবিষ্কার করতে, সেই বিজ্ঞানীর সুস্পষ্ট অভিমত হলো সুমিষ্ট ফল আমের উৎপত্তি ভারত মহাদেশের আশপাশের কোন অরণ্যে।

আমাদের প্রপিতামহদের কেউ না কেউ আমকে সযত্নে এনে ভারত উপমহাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমের রাজত্ব শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে থাকল না। ক্রমে তা ছড়িয়ে গেল পৃথিবীজুড়ে। সুমিষ্ট ফল আমকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি নিপুণতার সঙ্গে করেছেন ইউরোপীয়রা। সঙ্গে ছিলেন আরব বণিকেরা। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৩১ সাল নাগাদ মোগাদিসুতে আম গাছ দেখেছিলেন। ১৭০০ সাল নাগাদ পর্তুগিজরা আম নিয়ে যায় ব্রাজিলে, যা আজ ব্রাজিলের প্রধান রপ্তানি পণ্য। জ্যামাইকা আমের ছোঁয়া পেয়ে যায় হাইতিগামী এক ফরাসি জাহাজ আটকের ফলে। জাহাজে ছিল আম, সঙ্গে আমের আঁটি ও চারাগাছ। পাশাপাশি ১৭৭৪ সালে মেক্সিকোতে আমের ফলন শুরু হলেও আজ আমেরিকার আমের বাজার মেক্সিকোর দখলে।

সুমিষ্ট এ ফল নিয়ে গল্পের কি শেষ আছে? গ্রিক পুরানে আছে, হেসপেরাইডেস নামের তিন পরির নজরবন্দী থাকার সময় স্বর্গীয় মাধুর্যযুক্ত আপেল ভক্ষণের কথা। ১৬৭৩ সালে ইংরেজ পর্যটক বলেন, সেই স্বর্গীয় স্বাদের আপেল, ভারতীয় আমের স্বাদের কাছে নস্যি। সম্রাট আকবর শুধু আমের স্বাদ গ্রহণে সমঝদার ছিলেন না। সেই স্বাদ সব প্রজার কাছে পৌঁছাতে এক লাখ আমগাছ লাগিয়ে তৈরি করলেন লাখবাগ নামের বিশাল আম্রকুঞ্জ।। উনিশ শতক পর্যন্ত ভারতীয়দের তীর্থস্থল ছিল এই লাখবাগ। পুরো ভারতে আমের ফলনে স্বাদে মাপে রকমে কিংবা ফলনে ছিল অনেক ভিন্নতা। তথ্য মতে, ভারতে আনুমানিক ২০০ প্রজাতির আমের ফলন হতে লাগল। মোট পরিমাণের বৃহদাংশ হতো অন্ধ্র প্রদেশে। এখনো পুরো বঙ্গদেশ নানা জাতের আমের ফলনে পিছিয়ে নেই। নানা বাহারি নামও ছিল মধুফল আমের। আশ্বিনা, বউভুলানি, বড়োবাবু, পদ্মমধু, মিসরিদানা, ইলশেপেঠি, রাখালভোগ, চুছোমুখী হ আরও অনেক নাম। কুহেতুর নামের আমের ফলন সংগ্রহের আয়োজন ছিল রীতিমতো নবজাতক দেখা শোনার মতো। সেই বিশেষ আম গাছের নিচে রাখা হতো নরম তূলার আস্তরণের বিছানা। যাতে সেই আম কোনো অবস্থায় শক্ত কিছুর সঙ্গে আঘাত খেয়ে দাগি না হয়ে যায়।

বাংলাদেশের উচাবলুয়া গ্রামের এক হাঁড়ি–পাতিল বিক্রেতা সোহরাব আলী আম খেয়ে আঁটি ছুড়ে, ফেলে দিল একটি মাটির ভাঙা হাঁড়িতে। আঁটি থেকে গাছ হলো। রোপণের পর যে ফল পাওয়া গেল, দেখা গেল তা দারুণ মিষ্টি আর সুঘ্রাণসমৃদ্ধ। তাই বুঝি আমের নামকরণ হলো হাঁড়িভাঙা আম। উনিশ শতকে কলকাতার ধনী বাবুদের একটি শখের খেলা ছিল আম পরীক্ষা। শত জাতের আম সংগ্রহ করে রাখা হতো বাড়ির আঙিনায়। পরিচিত আম পরীক্ষককে চোখে বেঁধে নানা জাতের আম খাওয়ানোর প্রচলন ছিল। যিনি সবচেয়ে বেশি নাম বলতে পারতেন উনি পেতেন শত টাকা বকশিশ।

প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শংকরের স্ত্রী অমলা শংকরের রয়েছে আমের এক অনন্য স্মৃতি। অমলা শংকর ছিলেন বাংলার এক ধনী ব্যবসায়ী অক্ষয় কুমার নন্দীর আদরের সন্তান। ধনবান পিতার নিবাস প্যারিসে থাকাকালীন একজন বয়স্কা ফরাসি মহিলা তাঁকে একটি আমের শুকনো আঁটি দেখিয়ে বলেন, ওনার জীবদ্দশায়ে এরচেয়ে সুমিষ্ট এবং সুস্বাদু ফল তিনি আর পান নাই। আমের রকমভেদের স্বাদ নিতে গিয়ে বিড়ম্বনার গল্পটি নিজের। শহরের এক বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলাতে। আশির দশকের শুরুর দিকে বেড়াতে গেলাম মালদহে। বনেদি ও পুরোনো মুসলিম পরিবার হিসেবে মানসম্মানের কমতি নেই। শুনেছি তাদের কয়েক শ আমবাগান আছে। পৌঁছানোর পরদিন আম খাওয়ার পালা। মালদহ যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নানা জাতের আমের স্বাদ পরখ করা। পরদিন পরিবেশিত হলো আম। লম্বা টেবিলে কমপক্ষে শ জাতের নানা আকারের, ভিন্ন বর্ণের, হরেক সুবাসের আম। এত জাতের আম এক টেবিলে দেখে চোখ ছানাবড়া। লাল টকটকে পেয়ারা সাইজের আম থেকে মধ্যম সাইজের বিভিন্ন নামের আমে টেবিলে সাজানো। বঙ্গ সন্তান হিসেবে আমের নামজ্ঞান শুধু ফজলি আর ল্যাংড়াতে সীমাবদ্ধ থাকা খুব স্বাভাবিক। সাময়িক উচ্ছ্বাসে জানতে চাইলাম, ফজলি আম দেখছি না। বড় এক ভাই চাপা স্বরে জানিয়ে দিলেন, ওই জাতের আম বাড়িতে আসে না। গরুর বাথানে যায়। ফজলি আম গাভিদের খাওয়ানো হয় দুধ বর্ধক হিসেবে। শুনে কান মুখ লাল করে চুপ করে বসে রইলাম।

আমের নামকরণের পেছনে রয়েছে সুন্দর ও চমকপ্রদ ইতিহাস। ল্যাংড়া আমের আদিনিবাস নাকি ভারতের তীর্থ নগরী বারনসির এক খজ্ঞ ফকিরের বাগানে। মালদহে কম আদর পাওয়া ফজলি আমের নামকরণ হয় শহরের নামকরা ফজলি বাইজির নামে। এই তুলনাহীন নানা স্বাদের আমের শেষ কেমেস্ট্রি হলো আমের সংস্কৃত শব্দ আম্র যার মূলে নাকি অম্ল। তাইতো এই ফলের শুরু তিন জাতের টক স্বাদের সেরা টক স্বাদের আমের জাতি নাম ‘তুতুক তোবা’। সেটাতে এত টক থাকে যে, কেউ জিভে লাগিয়ে নাকি বলে উঠবে তোবা তোবা! এই হলো মধু মাসের সবচেয়ে আঙ্খাকিত ফল আমের ইতিহাস নিয়ে আম বয়ান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন