default-image

যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের ফল উল্টে দিয়ে নিজের পরাজয়কে জয়ে রূপান্তরের যে চেষ্টা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করে যাচ্ছেন, তা বিফল হতে বাধ্য। গত শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) এক দিনেই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোয় নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা নয়টি মামলা হয় খারিজ হয়েছে, নয়তো গৃহীতই হয়নি। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এক বড় পরাজয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, খারিজ বা বাতিল হওয়া এসব মামলার অধিকাংশেরই বিষয়বস্তু ছিল ডাকযোগে পাওয়া ভোট। এ ছাড়া নির্বাচনে অব্যবস্থাপনার কারণে ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলে দাবি করে এসব মামলা করা হয়। কিন্তু এর কোনোটির পক্ষেই কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্য পর্যায় থেকে নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বরাবরই বলেছেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে এমন কিছু ঘটেনি একেবারেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচার শিবির থেকে পেনসিলভানিয়ার মন্টগোমারি ও ফিলাডেলফিয়া কাউন্টিতে করা ছয়টি মামলাই আদালতে খারিজ হয়ে গেছে। এ মামলাগুলোয় ডাকযোগে পাওয়া ৯ হাজার ভোট নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি অ্যারিজোনায় সব ব্যালট পর্যালোচনার জন্য করা আরেকটি মামলা গ্রহণ করেননি আদালত। কারণ, এতে বাইডেনের জয়ী হওয়াটা বদলে যাবে না বলে মনে করেন আদালত। পেনসিলভানিয়ায় নির্বাচনের দিনের (৩ নভেম্বরের) পর আসা ডাকযোগে ভোট বাতিল করার দাবি জানিয়ে করা আরেকটি মামলা খারিজ হয়েছে। এমনই আরেকটি মামলা সুপ্রিম কোর্টে এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। নির্বাচনের আগের দিন থেকে এ বিষয়ে কোনো কথাই বলেনি সুপ্রিম কোর্ট।

বিজ্ঞাপন
ট্রাম্পের প্রচার শিবির এমন একজন বিচারক পাওয়ার আশায় আছে, যিনি মামলাকে টুইটের মতো মনে করবেন
জাস্টিন লেভিট, লয়োলা ল স্কুলের অধ্যাপক ও নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ

একইভাবে মিশিগানে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের করা আরেকটি মামলা খারিজ হয়েছে। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ওই মামলায় ডেট্রয়েটে নির্বাচনের ফল সরকারিভাবে যেন প্রকাশ না করা হয়, সে দাবি জানানো হয়। কিন্তু আদালতে ভোট জালিয়াতির এ অভিযোগ খারিজ হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে লয়োলা ল স্কুলের অধ্যাপক ও নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ জাস্টিন লেভিট সিএনএনকে বলেন, ‘ট্রাম্পের প্রচার শিবির এমন একজন বিচারক পাওয়ার আশায় আছে, যিনি মামলাকে টুইটের মতো মনে করবেন। আইনের পোশাক পরা যার কাছেই তারা গেছে, উত্তর এসেছে—দুঃখিত আমাদের এ বিষয়ে আইন আছে।’

তারপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রচার শিবির এবং রিপাবলিকানদের প্রতিনিধিত্ব করা আইনজীবীরা ইলেকটোরাল কলেজের হিসাব বদলে দিয়ে তা ট্রাম্পের পক্ষে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে মোট ভোট বা ইলেকটোরাল ভোটে বাইডেন কতটা এগিয়ে আছেন, তা তাঁরা বিবেচনাতেই নিচ্ছেন না। অথচ নির্বাচন নিয়ে করা ট্রাম্প শিবিরের করা মামলাগুলোর অধিকাংশেরই বিফল হওয়া এক রকম নিশ্চিত। এর কোনোটির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, আবার কোনোটির রায় লেখা হয়ে গেছে; শুধু প্রকাশ করাই বাকি।

আদেশে বলা হয়, ‘অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করে নির্বাচন কর্মকর্তারা ব্যালট গণনা করেছেন বলে যে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে, তা ধারণাপ্রসূত

সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় সার্কিট কোর্ট অব আপিলস ১৩ নভেম্বর জানিয়ে দিয়েছেন, পেনসিলভানিয়ার কংগ্রেস প্রার্থী ও ভোটারদের নির্বাচনর পরপর এত তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে মামলা করার কোনো এখতিয়ার নেই। এই একই ধরনের আদেশ এসেছে ডেলাওয়্যার ও নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যেও। আদেশে বলা হয়, ‘অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করে নির্বাচন কর্মকর্তারা ব্যালট গণনা করেছেন বলে যে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে, তা ধারণাপ্রসূত। সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীতে বর্ণিত সমসুরক্ষার নীতি এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। নির্বাচনের দিনের আগে একই সময়ে দুটি ভোট ডাকযোগে পাঠানো হলে, তার একটি নির্বাচনের দিন নির্ধারিত সময়ের আগে এসে পৌঁছাতে পারে, অন্যটি ডাক বিভাগের প্রক্রিয়ার কারণে আটকা পড়ে দেরিতে আসতে পারে। কিন্তু শুধু এ জন্যই একটি ভোটকে গণনা করে, অন্যটি বাতিল করাটা খুবই অদ্ভুত একটি ব্যাপার। কারণ সংবিধানে থাকা সমসুরক্ষা নীতি দুটি ভোটই গণনার কথা বলে।’

নির্বাচনে জো বাইডেনের জয় অস্বীকার করে ট্রাম্প শিবির থেকে করা একের পর এক মামলা মুখ থুবড়ে পড়ছে। এসব মামলায় যেসব সাংবিধানিক ধারা তুলে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে, তা সাংবিধানিক পন্থাতেই খারিজ করে দিচ্ছেন আদালত। কিন্তু এতে দমছেন না ট্রাম্প শিবিরের কর্মকর্তারা। পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী ফলের সরকারি সনদ আটকে দিতে করা তাঁদের আরেকটি মামলার শুনানি অঙ্গরাজ্যটির উইলিয়ামস্পোর্টের আদালতে আগামী মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতের বিচারক ম্যাথিউ ব্র্যান রিপাবলিকান হিসেবে পরিচিত। এই মামলায় রিপাবলিকানরা প্রাথমিক বিজয় পেতে পারেন। কিন্তু ব্র্যান এ বিষয়ে সাক্ষীদের বক্তব্য শুনতে চাইলেই গোল বাঁধবে। ফলে এই মামলারও তেমন কোনো আশা নেই।

সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রচার শিবিরের করা এসব পদক্ষেপ নির্বাচনের ফলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সে অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে মাত্র। এ ছাড়া আদতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাঁর প্রশাসনের সামনে আর কোনো আশা নেই। এ কথা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও জানেন। এখন তিনি কতটা অপেক্ষা করেন, এই অপেক্ষার মাঝে আর কী কী করেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0