default-image

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অ্যালেন শহরে ৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে বাংলাদেশি একটি পরিবারের ছয় সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মা, বাবা, বোন ও নানিকে হত্যার পর ওই পরিবারের দুই সন্তান আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে ঘটনাটি ভাবিয়ে তুলছে বাংলাদেশি মার্কিনদের। কোন পর্যায়ের মনোবিকার হলে স্বপ্নের দেশে জীবন শুরুর আগেই এমন আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে নতুন বাংলাদেশি প্রজন্ম।

বাংলাদেশি মার্কিন পরিবারের নিহত ছয় সদস্য হলেন—যমজ ভাই-বোন ফারহান তৌহিদ ও ফারবিন তৌহিদ (১৯), বড় ভাই তানভীর তৌহিদ (২২), মা আইরিন ইসলাম (৫৬), বাবা তৌহিদুল ইসলাম (৫৪), তানভীর তৌহিদের নানি আলতাফুন্নেসা (৭৭)।

এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার পর আত্মহত্যার আগে ফারহান তৌহিদ ইনস্টাগ্রামে তাঁর সুইসাইডাল নোটে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক আইন ব্যবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করে গেছেন। নোটের চতুর্থ পয়েন্টে তিনি লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক নিয়ন্ত্রণ একটি রসিকতা।’

অ্যালেন পুলিশ বলছে, দুই ভাই চারজনকে হত্যার পর নিজেরা আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে। মানসিক বিষণ্নতা থেকে মুক্তি পেতে তাঁরা এই কাজ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা পাওয়া গেছে।

পুলিশ বলছে, ঘটনার আগে ফারহান তৌহিদ ইনস্টাগ্রামে একটি দীর্ঘ ‘সুইসাইড নোট’ পোস্ট করেছেন। এতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজেকে ও আমার পরিবারকে হত্যা করেছি।’ কীভাবে তিনি নবম শ্রেণি থেকে মানসিক হতাশার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন—তাও লিখেছেন ফারহান। তাঁর বড় ভাইও হতাশায় ভুগছিলেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ফারহান লিখেছিলেন, ‘তাঁর ভাই বলেছেন, আমরা যদি এক বছরে সবকিছু ঠিক করতে না পারি, তবে আমরা নিজেদের ও পরিবারকে হত্যা করব।’

বিজ্ঞাপন

ফারহানের নোটে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক আইন ও অস্ত্রের অবাধপ্রাপ্তিতে সমাজের ক্ষতিকর দিকগুলো স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তিনি লিখেছেন, ‘অস্ত্র কেনা আমার ভাইয়ের জন্য খুব সহজ ছিল। এগুলো কিনতে তাকে শুধু অস্ত্রের দোকানে যেতে হয়েছিল এবং বলতে হয়েছিল, তার নিরাপত্তার জন্য ‌অস্ত্রগুলো প্রয়োজন। তারপর শুধু একটি ফরমে সাক্ষর করতে হয়েছিল।’

ফারহান আরও লিখেছে, তারা কেবল জানতে চেয়েছিল, আমার ভাইয়ের কোনো মানসিক সমস্যা আছে কিনা। কিন্তু সে না বলেছিল (যা মিথ্যা) এবং দোকানের মালিক কোনো প্রমাণও দেখতে চাননি।’

যুক্তরাষ্ট্রের গান কন্ট্রোল অ্যাক্ট (জিসিএ) অনুযায়ী ১৮ বছর বা তার ‌বেশি বয়সী ব্যক্তিরা শটগান-রাইফেল এবং শটগান বা রাইফেলের জন্য গোলাবারুদ কিনতে পারবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা অস্ত্র কেনা ও নিজের কাছে রাখার শাসনতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করেন। কিন্তু এ অধিকার জনগণের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ত্রের সহজলভ্যতার কারণে এ দেশে দিন দিন সহিংসতা বাড়ছে। আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে কানাডার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ছয়গুণ এবং জার্মানির চেয়ে ১৬ গুণ বেশি হত্যার ঘটনা ঘটে।

পুরো দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার ৪.৪ শতাংশ মার্কিন। কিন্তু বেসামরিক জনগণের কাছে প্রাপ্ত অস্ত্রের প্রায় অর্ধেকের বেশি মার্কিনদের কাছে রয়েছে। গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ ডেটাবেইসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন একটির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

দুই ভাইয়ের হত্যা-আত্মহত্যার পরিকল্পনাকে সফল করতে অস্ত্র কেনার সহজলভ্য সাংবিধানিক আইনি ব্যবস্থাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফারহান লিখেছেন, ‘প্রক্রিয়াটি এত সহজ করার জন্য ধন্যবাদ।’

তবে অ্যালেন পুলিশ বলছে, ২২ বছর বয়সী তানভীর তৌহিদ আইনসম্মতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র কিনেছিলেন।

দুই ভাইয়ের সুইসাইড নোট থেকে মনে করা হচ্ছে, তাঁরা হতাশায় ভুগছিলেন। পরিবারকে লজ্জা ও কষ্ট থকে ‘মুক্তি’ দিতে দুই ভাই সবাইকে হত্যা করে নিজেরা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমে পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়, নিজেরা আত্মহত্যা করলে পরিবার লজ্জায় পড়বে। তাই লজ্জা ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য অন্যদের হত্যা করে নিজেদের আত্মহত্যার কথা সুইসাইড নোটে উল্লেখ রয়েছে। সুইসাইড নোটে হত্যার পরিকল্পনার কথাও লেখা আছে।

স্থানীয় সময় ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত একটার দিকে নগরীর পাইন ব্লাফ ড্রাইভ এলাকার বাড়িটির দরজায় কড়া নাড়ে পুলিশ। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পুলিশ কোনো ফোন কল পায়নি বলে জানানো হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়, ওই পরিবারের এক বন্ধু তাঁদের ফোন করে পাচ্ছিলেন না। এরপর তাঁরা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ওই ঘরে ছয়জনের লাশ দেখতে পায়। বন্দুকের গুলিতে ছয়জন মারা গেছেন। বাড়ি থেকে বন্দুকও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

শাওন আহসান নামের এক প্রবাসী বলেন, তিনি পরিবারটিকে এক দশকের বেশি সময় ধরে জানেন। ৪ এপ্রিল তিনি তৌহিদুল ইসলামকে ফোন করে কোনো সাড়া পাননি। ফিরতি কোনো ফোন কল না পেয়ে তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। পরদিন ৫ এপ্রিল আরেকজন প্রবাসী সংবাদটি দেওয়ার পর ঘটনাস্থলে ছুটে যান তিনি। তিনি বলেন, তৌহিদুল তাঁর সন্তানদের নিয়ে সব সময় গর্ব করতেন। তাঁরা লেখাপড়ায়ও ভালো করছিল।

নগরীর পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, ৩ এপ্রিল কোনো এক সময় মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি। মেডিকেল পরীক্ষার পর এ বিষয়ে জানা যাবে।

ওই পরিবারের পরিচিত দিলারা হাসান ও মিজান রহমান বলেন, এমন কোনো ঘটনা এই পরিবারে ঘটতে পারে বলে তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। বাইরে থেকে পরিবারটিকে সুখী বলেই তাঁদের মনে হতো।

তৌহিদুলের পরিবারে হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালি কমিউনিটিতেই নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফারহান তৌহিদের লিখে যাওয়া সুইসাইডাল নোটে তথ্য ‌অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে, পরিকল্পিত এই হত্যা ও আত্মহত্যার পেছনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক বিষণ্নতা প্রধান কারণ ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক বিষণ্নতার বহু কারণ থাকতে পারে। প্রবাসে আরও দু–দশটা বাংলাদেশি পরিবারের মতো তৌহিদুল ইসলামও তাঁর সংসার সাজিয়েছিলেন। পেশাজীবী প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের ভালো চাকরি নিয়ে সুখী পরিবার হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত ছিলেন তারা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় মসজিদ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশি মুসলমান অভিবাসীদের অনেকের মতোই ধর্মকর্মে দেখা যেত পরিবারটিকে। আইরিন ইসলাম করোনাভাইরাস শুরুর আগে থেকে স্থানীয় স্বদেশিদের একটি মাসিক ধর্মীয় সভায় নিয়মিত যোগ দিতেন। সব সময়ই সন্তানদের নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন এবং সন্তানদের স্কুল–কলেজে ভালো ফলাফল নিয়ে গর্ব করতেন।

বিষণ্নতার মতো নীরব ঘাতক কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, পরিবারটির নির্মম পরিণতির মধ্য দিয়ে তা নগ্ন হয়ে উঠেছে। আর এই পরিস্থিতি ভাবিয়ে তুলেছে প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের।

বাংলাদেশি পরিবারের ছয় সদস্যের এমন মৃত্যুর ঘটনা দুদিন ধরে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। তরুণদের মধ্যে হতাশার কারণ হিসেবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কম যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সংঘাতসহ যুক্তরাষ্ট্রের আগ্নেয়াস্ত্র আইনের মতো বিষয়গুলো এসব সংবাদে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাসের প্রেসিডেন্ট হাশমত মোবীন বলেছেন, প্রবাসীরা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানদের বড় করছেন। সন্তানদের গড়ে তুলছেন। অধিকাংশ পরিবারের সন্তানেরা ভালো করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সন্তানদের উল্লেখযোগ্য অংশকে হতাশা নীরবে গ্রাস করছে। এ অবস্থায় আশুকরণীয় নির্ধারণে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।

পেনসিলভানিয়ার ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চিকিৎসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা কিছু বাংলাদেশি তরুণদের অকালে হারিয়েছি। সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য তরুণদের কথা আমাদের মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে আমাদের কাজে নেমে পড়তে হবে।’

দাফন

বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাস ছয়জনের মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করেছে। অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হাশমত মোবীন বলেন, তৌহিদুলের ভাই মায়ামি থেকে একজন ও আইরিন ইসলামের ভাই নিউইয়র্ক থেকে টেক্সাসে এসেছেন। অ্যালেন শহরের যে মসজিদে পরিবারটির সদস্যরা যেতেন, সেখানেই তাঁদের জানাজা হওয়ার কথা। পার্শ্ববর্তী ডেন্টন শহরের মুসলিম কবরস্থানে তাদের মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন