default-image

মার্চের শেষ, জাঁকালো শীত কমতে শুরু করেছে। নিউইয়র্কের সদা ব্যস্ত টাইম স্কয়ারে গ্রীষ্মকাল যেন একটু আগেই আসে। স্বল্প বসনা পশ্চিমা নারীদের সঙ্গে আজকাল হিজাব পরা নারীদেরও দেখা মেলে। বহু জাতিগোষ্ঠীর নগর এমনি করেই সবার হয়ে উঠেছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ আপন মনে গান গাইছে। নাগরিক জঞ্জালের মধ্যেও কোন কবি নিঃসঙ্গতার কবিতা রচনা করে ফেলছে।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকসহ টাইম স্কয়ারে দাঁড়িয়ে আছি। জনপ্রিয় লোকজনকে নিয়ে কোথাও দাঁড়ানো যে সব সময় আনন্দের, তা বলা যাবে না।

দীর্ঘদিন আমেরিকায় আছি। টাইম স্কয়ারের কোলাহলে নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ আনন্দ পাই। তা আর হয়ে ওঠে না। বেশ কয়েকজন স্বদেশি লোক এসে হাজির। আনিসুল হককে ঘিরে তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একের পর এক করমর্দন করে যান, হাসিমুখ ধরে রেখে কথা চালিয়ে যেতে পারেন। এ কারণেই তাঁরা সেলিব্রিটি হতে পারেন। খ্যাতির বিড়ম্বনার কথাটা কানে কানে বলে আমি ঘড়ি দেখি।
ঠিক বেলা দুইটায় টাইম স্কয়ারের পাশের হোটেলটিতে আমাদের যাওয়ার কথা। কিছুক্ষণ পরপর ফোন আসছে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের। প্রথম আলো যখন যাত্রা করে, তখন থেকেই আমি প্রবাসে। প্রবাসে থাকলেও প্রথম আলো পরিবারের একজন আমি। উত্তর আমেরিকা সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আমাকে যুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ এর উদ্বোধন হবে। উদ্বোধনী সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল মতিউর রহমানের। সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি ছিল।

শারীরিক কারণেই শেষ মুহূর্তে সম্পাদক জানালেন, স্বয়ং চেয়ারম্যান সাহেব আসছেন। ট্রান্সকম গ্রুপ ও মিডিয়াস্টারের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান। প্রথম আলোর মালিকানা এই প্রতিষ্ঠানের। আমি কোনো দিন তাঁকে কাছে থেকে দেখিনি। সিলেট অঞ্চলে বাড়ি আমার। আসামের লোকজনের সঙ্গে আত্মীয়তা আমাদের নানা পদের। এর মধ্যেই লতিফুর রহমানের পরিবারের গল্প অল্পস্বল্প আমার জানা। বড় মাপের মানুষ—এ কথাটিই শুধু জানি।

default-image

সম্পাদক মতিউর রহমানের একের পর এক ফোন কলে আমি অবাকই হই। চেয়ারম্যান সাহেব আসছেন। অগ্রবর্তী দলে আনিসুল হক এসেছেন। আমাদের প্রতি সম্পাদকের আস্থা কোনো দিন কম, এমন টের পাইনি। সম্পাদককে আমরা মতি ভাই ডাকি। মতি ভাই, একটার পর একটা ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন, আমাদের অবস্থান কোথায়? আমরা কি ঠিক সময়ে দেখা করছি বা করতে পারছি। লাঞ্চের সময়। আমরা কি চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে লাঞ্চ করব? হোটেল থেকে আমরা কত দূরে অবস্থান করছি? আবহাওয়া কেমন?

বারবার ফোন পেয়ে আমি আনিসুল হকের দিকে তাকাই। তিনি হাসেন। জানান, এ মানুষগুলোকে শুধু বড় দেখায় বলেই বড় হননি। তাঁদের কর্মের, আচরণের কারণেই বড় তাঁরা।
হোটেলের লবিতে ঠিক সময়মতো আমরা উপস্থিত। আনিসুল হক এগিয়ে গেলেন। আমি পেছনে। সালাম দিতেই নিজে থেকেই বললেন, আপনি ইব্রাহীম!

বোঝা গেল, মতি ভাই আমার কথা বলে দিয়েছেন। যে সম্পাদক খোঁজ রাখেন, হালকা খাবারে কে কী খাবে? শিঙাড়া না সমুচা? শিঙাড়া হলে ভেতরে সবজি থাকবে, না কলিজা থাকবে?—এ নিয়েও সিদ্ধান্ত দেন, তাঁর পক্ষেই স্বয়ং চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে বিশাল প্রতিষ্ঠানের নগণ্য একজন কর্মী সম্পর্কেও বলে রেখেছেন। কত কিছুই তাঁদের কাছ থেকে আমাদের শেখার থেকে যায়। ছোট এসব কাজ যে অসাধারণ হয়ে ওঠে, তা–ও আমাদের মতো লোকজনের বোধে আসতে সময় লাগে।

টাইম স্কয়ার–সংলগ্ন আমেরিকান রেস্টুরেন্টে বসতেই মেনু এল। আমেরিকান রেস্টুরেন্টে অনেক মেনুই পরিচিত থাকে না। নানা নামে খাবারের মেনু। সবাই যাঁর যাঁরটা পছন্দ করছেন। লতিফুর রহমান হালকা খাবারের অর্ডার দিলেন, লক্ষ করলাম। পরদিন আমাদের উত্তর আমেরিকা সংস্করণের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। পত্রিকা আমরা ছাপিয়ে রেখেছি। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরই তা বিতরণ করা হবে। প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টে দেখলেন। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী সাইফুল সিদ্দিক নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির ব্যবসা-বাণিজ্যের খবর বলছিলেন। আমেরিকার করপোরেট বসদের সঙ্গে কাজ করছি দীর্ঘদিন ধরে। টের পেলাম, মাত্র কয়েক কথায় জেনে নিচ্ছেন সব।

default-image

কত দিন থেকে আমেরিকায় আছি? পরিবার কেমন আছে? এসব নিয়ে ব্যক্তিগত কিছু প্রশ্নও করলেন। প্রতিবার আপনি আপনি সম্বোধন করছিলেন। সাইফুল সিদ্দিক উদ্যোগ নিলেন খাবারের বিল পরিশোধ করার। না, নিজেই বিল দিলেন লতিফুর রহমান। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কাল সময়মতো ভেন্যুতে তিনি পৌঁছে যাবেন।

টাইম স্কয়ার থেকে জ্যামাইকার ইয়র্ক কলেজ। আমাদের জনা দশেক লোকজন দিনরাত কাজ করছেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে। জানালাম, আমরা এসে নিয়ে যাব। সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন, তিনি নিজেই উবার ডেকে চলে যাবেন। বেশ অস্বস্তিতে পড়লাম। আনিসুল হকের দিকে তাকাই। আনিসুল হক মাথা নাড়লেন। কিছু বলেন না।

অনুষ্ঠানের দিন সকালে হোটেলে ফোন করি। ফোন ধরেই বলছিলেন, আমরা সময়মতো পৌঁছে যাব।
বিনয় বিষয়টি আমার কণ্ঠে নাকি ঠিক আসে না। কথাটা যে ঠিক নয়, তার প্রমাণ পেয়ে গেলাম। বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বললাম, আমি গাড়ি নিয়ে হোটেলের নিচে সময়মতো উপস্থিত থাকব।
কিন্তু আপনাকে তখন ভেন্যুতে থাকতে হবে।
তাহলে আমার ভাই আসবে।
কেন যেন মেনে নিলেন। বন্ধু ফকু চৌধুরীকে বলে দেওয়া হলো, ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ছাড়া কোনো কথা বলা বারণ। বিষয়টা ফকুর জন্য কঠিন ছিল। মুখ বন্ধ করে ঘণ্টাখানেক কারও সহযাত্রী হওয়া এনআরবি ব্যবসায়ী ফকু চৌধুরীর জন্য বেশ কঠিন। পরে জানিয়েছেন, মাত্র পাঁচ মিনিটের মতো কথাটি রাখতে পেরেছিলেন। এরপর সিলেট, আসাম, চা–বাগান, শিলং, আত্মীয়ের আত্মীয়—এসব কোনো আলাপই আর বাকি থাকেনি!
ইয়র্ক কলেজের বিশাল অডিটরিয়াম। ১৫ হাজার লোকের ধারণক্ষমতা। প্রথম আলো যে শুধু একটা সংবাদপত্র নয়, দেশের একটা গর্বের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে, কথাটা টের পাই। নিউইয়র্কে ২৬ মার্চ অন্তত ডজন–খানেক বড় অনুষ্ঠান। এর মধ্যে ইয়র্ক কলেজে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে লতিফুর রহমান মঞ্চে ওঠার আগে ডাকলেন। বললেন, আপনার বন্ধু ফকু চৌধুরী খুব ভালো মানুষ! সামান্য সময়ের পরিচয়ের মধ্যেও কাছে ডেকে বসিয়েছেন, দেখলাম।

default-image

জনাকীর্ণ অডিটরিয়ামে লতিফুর রহমান বললেন, প্রথম আলো এখন থেকে শুধু বাংলাদেশের কথাই বলবে না; আপনারা যাঁরা দূর পরবাসে আছেন, তাঁদের কথাও বলবে। আরও জোরালোভাবে বলবে। 

২০১৭ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে প্রথম আলোর পরিচালন সংস্থা মিডিয়াস্টার লিমিটেডের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের জিডিপি ৭ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় মার্কিন কংগ্রেসওমেন গ্রেস মেং, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি, বৈদেশিক মিশনে কর্মরত বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাসহ সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

লক্ষ করছিলাম, ইয়র্ক কলেজের অডিটরিয়ামের ঢালু পথে নামতে গিয়ে তাঁর কিছু সমস্যা হচ্ছে। জানালেন, শরীর ভালো যাচ্ছে না। পায়ের সমস্যা। দেড় ঘণ্টা পর চলে যেতে হবে। তখনো অনুষ্ঠান চলবে। আমি যেন মঞ্চেই থাকি, তাঁকে বিদায় জানাতে হবে না। সঙ্গে থাকা তাঁর নাতি উবার ডাকবেন। তাঁরা নিজেদের মতো চলে যাবেন। শুধু বললেন, যখন যা দরকার আপনার সম্পাদক মতি ভাইকে জানাবেন!
গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় নিহত ফারাজ হোসেনকে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয় অনুষ্ঠানে। হলজুড়ে ছিল পিনপতন নীরবতা। ফারাজের মা সিমিন হোসেন ও নানা লতিফুর রহমান মঞ্চে। এ সময় সবাই দাঁড়িয়ে ফারাজের গর্বিত মাকে সম্মান জানান।

default-image

মঞ্চে তখন মেয়ের পাশে দাঁড়ানো লতিফুর রহমান। বাবা ও মেয়ের অশ্রুসজল চোখ। আনিসুল হক সংবেদনশীল মানুষ। তাঁর চোখেও অশ্রুপাত হচ্ছে। হলভর্তি লোকজনও অশ্রুসজল। পিনপতন নিস্তব্ধতার সময়ে একটি পরিবারের বয়ে যাওয়া শোকে আবারও একাত্ম হয়ে ওঠে হলভর্তি হাজারো মানুষ।

বাংলাদেশে সৎ-নিষ্ঠাবান হিসেবে পরিচিত লতিফুর রহমান বলেছিলেন, নিউইয়র্কে আবার আসবেন। সম্পাদক মতিউর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে এসে আমাদের সাফল্য দেখতে আসবেন। ১ জুলাই প্রথম আলো অনলাইনে হোলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডের ফিরে দেখা সংবাদ, ফারাজের ওপর একটি লেখা পড়তে পড়তেই সংবাদটি পড়তে হলো, ‘ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান আর নেই।’

আশীর্বাদের হাত বাড়িয়ে বলেছিলেন, আবার আসবেন। আমাদের সাফল্য দেখতে আসবেন।
তা আর আসবেন না। তাঁর আশীর্বাদটাই আমরা বয়ে বেড়াব। নীতিনৈতিকতার বিরল উদাহরণ রেখে গেছেন। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার উচ্চারণে স্মরণে রাখব ক্ষণিকের দেখায় বিশাল প্রভাব রেখে যাওয়া শ্রদ্ধেয় লতিফুর রহমানকে। কর্মগুণেই তিনি স্মৃতির শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকবেন বহু মানুষের মনে।

*লেখক: আবাসিক সম্পাদক
প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সংস্করণ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0