default-image

যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অভিবাসন ব্যবস্থা পাল্টে দিতে চাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত এ দেশে একটি মানবিক অভিবাসননীতি প্রণয়নের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। রক্ষণশীলদের সঙ্গে সমঝোতা না হলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিবাসন সংস্কার আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাইডেন প্রশাসন। এমন উদ্যোগ সফল হলে এ দেশে কয়েক লাখ মানুষের উৎকণ্ঠার অবসান হবে এবং দীর্ঘদিনের ভেঙে পড়া বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে একটি শৃঙ্খলার অভিবাসন নিয়ম চালু হবে বলে আশাবাদ দেখা দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন শপথ গ্রহণের পরই বলেছিলেন, একটি মানবিক ও কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থা তিনি গড়ে তুলবেন। দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসীদের ব্যাপক আগমনে সৃষ্ট সংকট সামাল দিতে সমন্বিত অভিবাসন আইন দ্রুত প্রণয়নে ডেমোক্রেটিক দলের মধ্যে এক ধরনের তাড়না দেখা যাচ্ছে।

গত কয়েক দশক ধরেই মার্কিন অভিবাসনে বিরাজ করছে চরম অরাজকতা। বিরাজমান অভিবাসন আইনের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটিতে চরম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সংকট নিয়ে যেমন রাজনীতি হচ্ছে, তেমনি পুরো দেশের অর্থনীতিতেও চাপ পড়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা। দক্ষিণের স্থল সীমান্ত আদম পাচারের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। অপরাধীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে, অভিবাসন আইনের অস্থিতিশীলতার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রকৃত অভিবাসীদের।

অভিবাসনের স্বাভাবিক নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদনের ১৩ লাখ মামলা বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে অভিবাসন আদালতে। কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার এনফোর্সমেন্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ীম শুধু গত মার্চ মাসেই ১ লাখ ৭০ হাজার অভিবাসীর প্রবেশ ঘটেছে দক্ষিণের সীমান্ত দিয়ে। ২০০৬ সালের পর কোনো এক মাসে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা সর্বোচ্চ সংখ্যক নথিপত্রহীন অভিবাসীর আগমন ঘটেছে গত মাসে।

বিজ্ঞাপন

গত চার বছরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন কড়াকড়ির কারণে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। জমে থাকা সব অভিবাসন সমস্যা এখন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অবস্থানগত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসনের প্রবাহ বন্ধ করতে পারবে না । মার্কিন অর্থনীতিতে অভিবাসীদের সরব উপস্থিতি ছাড়া কোনো চাঞ্চল্য নেই। এ দেশের কৃষিশিল্প ব্যাপকভাবে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল।

দেয়াল নির্মাণ করে অভিবাসন বন্ধের চিন্তা ডোনাল্ড ট্রাম্প করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে আসা বন্ধ করার কোনো উপায়ই নেই। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আদম পাচারের মতো একটি লাভজনক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক এশিয়া ও আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই অভিবাসীদের স্রোত সামাল দেওয়ার পর্যাপ্ত কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রে নেই। মানুষের আশ্রয় আবেদন সমাধান করা, এমনকি নিয়মিত অভিবাসনের আবেদন দেখভাল করার পর্যাপ্ত লোকবল নেই।

মার্কিন অভিবাসন আদালতগুলো অন্যান্য আদালতের চেয়ে ভিন্ন। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত অভিবাসন আদালতের মনোভাব প্রশাসন পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায়। বাইডেন প্রস্তাবিত সমন্বিত অভিবাসন সংস্কার আইনে অভিবাসন আদালতগুলোকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনার বিধান থাকতে পারে।

এই দশকের শুরুতেই সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ চেষ্টা করেছিলেন অভিবাসন সংস্কারের। সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সময়োপযোগী অভিবাসন আইন প্রণয়নের আন্তরিক চেষ্টা করেছেন। বারাক ওবামার সময়ে ৮ বছরই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এর আগে দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ সিনেটর হিসেবে অভিবাসন সংস্কার আইন পাশ নিয়ে সব বাধাবিপত্তির কথাও প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ভালো করেই জানা। অভিজ্ঞতার আলোকেই নিজের দলকে অভিবাসন আইনের সংস্কার নিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস নিচ্ছেন শুরু থেকেই।

হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমন্বয় করে নিউজার্সি থেকে নির্বাচিত সিনেটর বব ম্যানেনডেজ সমন্বিত অভিবাসন আইনের খসড়া তৈরি করছেন। এর মধ্যেই খসড়া প্রস্তুত করা হয়ে গেছে। দলের নানা পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন মহলের চাহিদাকে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সিনেটের বব ম্যানেনডেজের মুখপাত্র রবার্ট জুলিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সর্বোচ্চ সংখ্যকের জন্য নাগরিকত্বের পথ উন্মুক্ত করার সব সুযোগই আমরা উন্মুক্ত রাখব।

নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট বাইডেন অপ্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা লোকজনের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সব ধরনের নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিতাড়ন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রস্তাবিত অভিবাসন সংস্কার আইন নিয়ে এরই মধ্যে বিরোধিতা শুরু হয়েছে। রক্ষণশীলরা তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসন বিরোধী প্রচারণা শুরু করেছে।

ডেমোক্রেটিক দলের পক্ষ থেকে অভিবাসন সংস্কার নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। সিনেটর বব ম্যানেনডেজ যে অভিবাসন আইনের খসড়া করেছেন, এ নিয়ে ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতারা নিজেদের মতামত দিয়ে সংযোজন–বিয়োজন করছেন। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হলেও ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন সংস্কার আইন পাশের বিষয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

অর্থবিলের ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসে রিকনসিলিয়েশন পদ্ধতি নামে একটি বিধান রয়েছে। অর্থ আইন পাশের ক্ষেত্রে কংগ্রেসে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের নাগরিক প্রণোদনা আইনটি এমন রিকনসিলিয়েশন পদ্ধতিতে পাশ হয়েছে।

অভিবাসন সংস্কার আইনকে অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তা কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হতে পারে। এ নিয়ে উভয় দলের মধ্যে সাধারণ সমঝোতার চেষ্টা করা হবে এবং মার্কিন অর্থনীতির জন্য নাজুক এ সময়ে অভিবাসন সংস্কারকে এক করে ডেমোক্র্যাটরা আইনটি পাশ করার পরিকল্পনা করছে।

সিনেটে জুডিশিয়ারি কমিটির প্রেসিডেন্ট অ্যালেক্স পেডিলা বলেন, ‘আমরা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছি। আগামী রিকনসিলিয়েশন বিলে অভিবাসনকে সম্পৃক্ত করার কথাও ভাবা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন